হঠাৎ জোকুইমের একটা পা মাটির উপর ধাক্কা মেরে এগিয়ে এল। একটা শুকনো মাটির ঢেলা ছিটকে এসে আঘাত করল তাইগরের মুখে। সঙ্গেসঙ্গে তাইগর ঝাঁপ দিল জোকুইমকে লক্ষ করে। শানিত বর্শাফলক চমকে উঠল, পশুর দেহ বিদ্ধ করল, পিছিয়ে গিয়ে আবার আঘাত হানল। দ্বিতীয়বারের আঘাত তাইগরকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিল। উদ্যত রাইফেল তুলে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করল সাশা, কিন্তু ধরাশায়ী দেহটার মধ্যে প্রাণের স্পন্দন দেখতে না-পেয়ে অস্ত্রটা নামিয়ে নিল। এই লড়াইতে অংশগ্রহণ করেনি সাশা, অরণ্যসম্রাটের সঙ্গে জোকুইমের দ্বন্দ্বযুদ্ধে সে ছিল নীরব দর্শক।
মুগ্ধ দৃষ্টিতে জোকুইমের দিকে তাকিয়ে সাশা বলল, রিও গ্র্যান্ড সাল থেকে আমার বন্ধুরা যে-দৃশ্য দেখার সম্ভাবনা আছে বলে আমায় উৎসাহিত করেছিল, সেই দৃশ্যই আজ দেখার সৌভাগ্য হল আমার। তুমি তাহলে একজন তাইগরেরো!
জোকুইম বলল, আজকের দিনের স্মৃতি হিসাবে মরা জন্তুটার চামড়া তুমি ছাড়িয়ে নিয়ে যাও। এর পরে তুমি নিজের হাতেই তাইগর শিকার করে তার চামড়া ছাড়িয়ে নিতে পারবে।
পনেরো দিন পরে আবার জোকুইমের সঙ্গে কুকুরের দল নিয়ে শিকার করতে গেল সাশা। সেদিন আর রাইফেল ছিল না সাশার হাতে, ছিল একটা মজবুত জায়াগা (বর্শা) আর কোমরের খাপে ছিল পিস্তল। সেদিন শিকারিদের বেশিক্ষণ ছুটোছুটি করতে হল না। অল্প সময়ের মধ্যেই তারা শিকারের সন্ধান পেল। কুকুরগুলো একটা অল্পবয়সি পুরুষ তাইগরকে ঘিরে ফেলেছিল। জন্তুটা বৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে কুকুরগুলোকে আক্রমণ করতে চেষ্টা করছিল। কিন্তু মানুষ দুটিকে দেখেই কুকুরদের ছেড়ে সে দ্বিপদ শত্রুদের দিকে আকৃষ্ট হল। প্রায় তিরিশ গজ দূর থেকে সে ঝড়ের মতো ছুটে এল সাশার দিকে। জোকুইম যেভাবে শিখিয়েছিল, ঠিক সেইভাবেই বর্শাটাকে দুই হাতে শক্ত করে ধরেছিল সাশা, বর্শাফলক ছিল জমির দিকে নীচু হয়ে। জন্তুটা লাফ দিলেই তলা থেকে বর্শা চটপট উপরে তুলে জন্তুটার গলা বা বুকে বিঁধিয়ে দিতে হবে।
বুনো জানোয়ার কখন কী করবে তা আগে থেকে বলা যায় না। এই জন্তুটা ছুটে এসে সাঁৎ করে একপাশে সরে এল। মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে গিয়েছিল সাশা, পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিয়ে জন্তুটার দিকে ঘুরে দাঁড়াল সে–বর্শাফলকও ঘুরল তাইগরের দিকে, জমির সঙ্গে প্রায় সমান্তরাল রেখায় নত হয়ে তাইগর লাফ দিলেই ফলাটা সবেগে উপরের দিকে উঠে যাবে, বিদ্ধ করবে জানোয়ারের গলা বা বুক।
কিন্তু তাইগর লাফাল না। সোজা ছুটে এল সাশাকে আক্রমণ করতে তার ক্রোধবিকৃত ভয়ংকর মুখটা প্রায় জমির সঙ্গে মিশে গেছে! দারুণ আতঙ্কে বর্শা নিয়ে আঘাত হানল সাশা তাইগরের গলা লক্ষ করে। কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে বর্শাফলক বিধল তাইগরের কাঁধে।
আঘাতের ধাক্কা জন্তুটাকে সাশার সামান্য বাঁ-দিকে সরিয়ে দিল, ফলে নখরযুক্ত ভয়ংকর থাবার নিশানা একটুর জন্য ফসকে গেল। কিন্তু ভারসাম্য সামলাতে না-পেরে সামনের দিকে ছিটকে পড়ল সাশা, সেই অবস্থাতেই সে শুনতে পেল তাইগরের অবরুদ্ধ গর্জন প্রচণ্ড হুংকারে ফেটে পড়ছে। কোনোরকমে হাঁটুতে ভর করে নিজেকে তাইগরের নাগালের বাইরে সরিয়ে নিল সাশা।
ওই অবস্থায় তাইগর তাকে আক্রমণ করলে তার মৃত্যু ছিল নিশ্চিত। কিন্তু সেই সুযোগ পেল না শ্বাপদ বিদ্যুৎচমকের মতো জন্তুটার বক্ষ বিদীর্ণ করে দিল জোকুইমের বর্শা। কয়েক মুহূর্ত ছটফট করে স্থির হয়ে গেল তাইগর। তার মৃত্যু হল।
রক্তাক্ত বর্শার ফলাটাকে তাইগরের দেহ থেকে টেনে নিয়ে সাশার দিকে তাকিয়ে হাসল জোকুইম, তুমি বড়ো তাড়াতাড়ি চার্জ করেছিলে সিনর।
সাশা বুঝল কেন তাকে জোকুইম একা একা শিকার করতে দেয়নি। ক্ষিপ্রহস্তে বর্শা চালিয়ে যেভাবে সে পুমাকে হত্যা করেছিল, সেইসঙ্গে দুর্ভাগ্যবশত মারা পড়েছিল তার প্রিয় কুকুর দ্রাগাও–এবং এইমাত্র যেভাবে সে সাশার প্রাণ বাঁচাল তাইগরকে মেরে সেই বিদ্যুৎ ক্ষিপ্ত সঞ্চালনে বর্শাকে চালিত করার ক্ষমতা কয়েকদিনের মধ্যে কোনো শিকারি আয়ত্ত করতে পারে না। নিখুঁতভাবে আঘাতের সময় নির্ধারণ এবং নির্ভুল নিশানায় আঘাত করার ক্ষমতা আয়ত্ত করা সম্ভব হয় অনেকগুলো বর্শার লড়াইতে জয়ী হওয়ার পরে শ্বাপদের নখদন্ত বনাম বর্শার লড়াইতে শিকারির মৃত্যু হতে পারে যেকোনো মুহূর্তে।
ওই ঘটনার পর জোকুইমের পাশে দাঁড়িয়ে আরও কয়েকটা তাইগর শিকার করল সাশা। ধীরে ধীরে তার নিজের ক্ষমতার উপর বিশ্বাস গড়ে উঠল। কিন্তু তখনও তাকে এককভাবে শিকারে যেতে দিতে সম্মত হল না জোকুইম।
সিনর, তুমি অনেক বছর ধরে সাফল্যের সঙ্গে শিকার করতে পার, কিন্তু একমুহূর্তের জন্য তোমার ভুল হতে পারে, জোকুইম বলেছিল, আর তোমার মৃত্যু ঘটতে পারে ওই একটি মুহূর্তেই।
বর্ষা শুরু হল। প্রবল বৃষ্টিতে ডুবে গেল নীচু জমি। বৃষ্টির জল জমে গিয়ে জলাশয় আর জঙ্গল অনেক জায়গাতেই একাকার হয়ে গেল। জলস্রোতে প্লাবিত নিম্নভূমি থেকে উঠে এল সব জন্তু উচ্চভূমির শুষ্ক আশ্রয়ে। তৃণভোজীদের সঙ্গে মাংসাশী তাইগরের দলও উঠে এল নীচু জমি থেকে উঁচু জমির উপর।
আমাকে একবার উত্তর-পশ্চিম দিকে যেতে হবে, জোকুইম বলল, খবর পেয়েছি একটা তাইগর ওখানে ভীষণ উপদ্রব করছে। শুধু গোরুবাছুর নয়, তার কবলে প্রাণ হারাচ্ছে বহু মানুষ। ওই জন্তুটাকে না-মারা পর্যন্ত আমার স্বস্তি নেই।
