বেশ কয়েকমাস ধরে বন থেকে বনে আর গ্রাম থেকে গ্রামে ঘুরতে ঘুরতে সাশা এসে উপস্থিত হল তার পুরাতন আস্তানা সিনর শিকো পিন্টো নামে চিনির কারবারির গৃহে। সিনর শিকো সাদর অভ্যর্থনা জানাল সাশাকে। অ্যাপারিসিও তখন সিনর শিকোর বাসস্থান থেকে কয়েক মাইল দূরে সিনর পেসো নামে এক ভূস্বামীর কাছে কিছু কাজের দায়িত্ব নিয়েছিল। সাশা তাকে বলেছিল চিনির কলে তার কিছু কাজ বাকি আছে, সেই কাজগুলো সারা হয়ে গেলে সে এসে দেখা করবে অ্যাপারিসিওর সঙ্গে পরবর্তী কর্তব্য তারা স্থির করবে দুজনে মিলে। কিন্তু কোনো কাজেই মন দিতে পারছিল না সাশা, সে ছটফট করছিল তাইগরেরো জোকুইম গুয়াতের সঙ্গে দেখা করার জন্য। জোকুইমের সঙ্গে আরও একবার শিকারে যাওয়ার ইচ্ছাটা তাকে অস্থির করে তুলেছিল।
ইতিপূর্বে যে-কুটিরে সাশা আশ্রয় নিয়েছিল, এইবারও সে কুঁড়েঘরটিকেই সে সাময়িক অবস্থান বলে গ্রহণ করল। সিনর শিকোর কাছে সাশা জানতে চাইল জোকুইম এখন এই অঞ্চলে আছে কি না। সিনোর শিকো বলল সে বর্তমানে এখানে না-থাকলেও আশা করা যায় দিন দুই পরেই সে উপস্থিত হবে তার নিজস্ব আস্তানায়।
নির্ভুল অনুমান ঠিক দু-দিন পরেই দুটি কুকুর নিয়ে সাশার ঘরের সামনে এসে দাঁড়াল জোকুইম। তখনও দেখা গেল কুকুরের আশ্চর্য স্মরণশক্তি ভ্যালেন্টো নামে যে-কুকুরটাকে জোকুইম উপহার দিয়েছিল, সেই কুকুরটা মহা উৎসাহে অভ্যর্থনা জানাল তার পুরানো মনিবকে।
চিনির কারখানাকে ঘিরে চারপাশে যে ঘন জঙ্গল অবস্থান করছিল, সেইদিকে তাকিয়ে জোকুইম বলল, তাইগররা নীচু জমি ছেড়ে এখন উঁচু জমিতে উঠে আসছে। বর্ষা নামলে তারা নীচু জমিতে থাকে না। আগামী দিনটা বাদ দিয়ে পরশুদিন খুব ভোরে আমি আসব। তুমি প্রস্তুত থেকো সিনর সাশা–আমরা দুজনে আবার একসঙ্গে শিকার করতে যাব।
নির্দিষ্ট দিনে নির্দিষ্ট সময়ে চারটি প্রকাণ্ড কুকুর নিয়ে জোকুইম হাজির হল সাশার দরজায়। কিন্তু কুকুরদের দলপতি হিসাবে ছোটোখাটো ভ্যালেন্টকেই সে নির্বাচন করল।
দ্রাগাওর পরে ভ্যালেন্টই হচ্ছে সবচেয়ে সেরা কুকুর, জোকুইম বলল, সে কখনো ভুল করে না। অন্য কুকুরগুলো ভুল করে তোমাকে অন্যপথে চালনা করতে পারে।
এখানে বলে রাখা ভালো কুকুরদের দলপতি বলতে কী বোঝায়। সারমেয়-বাহিনীর মধ্যে দলপতি ছাড়া অন্যান্য কুকুরগুলো শিকল-বাঁধা অবস্থায় শিকারিদের সঙ্গে থাকে। দলপতি শিকারের গন্ধ বা পদচিহ্ন অনুসরণ করে অগ্রসর হয়। তার গলার শিকল সেইসময় খুলে দেয় শিকারি। দলপতির পিছনে অন্যান্য কুকুরদের শিকল ধরে শিকারি চলতে থাকে। একেবারে শেষ মুহূর্তে শিকারের কাছাকাছি এসে সব কয়টি কুকুরের গলার শিকল খুলে শিকারি তাদের ছেড়ে দেয় এবং সারমেয়-বাহিনীর পশ্চাদ্ধাবন করে শিকারের সম্মুখীন হয়ে যথাকৰ্তব্য স্থির করে। সুতরাং শিকার-অভিযানে কুকুরদের দলপতির ভূমিকা অতিশয় গুরুত্বপূর্ণ। শিকারের সঠিক অবস্থান নির্ণয় করতে পারে একমাত্র দলপতি।
তিনঘণ্টা ধরে বনের পথে ছুটে চলার পর একটা জাগুয়ারের (তাইগর) পায়ের ছাপ দেখতে পেল শিকারিরা। ভ্যালেন্টোর সঙ্গে অন্যান্য কুকুরগুলোকেও শিকারিরা মুক্তি দিল–তৎক্ষণাৎ দলপতি ভ্যালেন্টোকে অনুসরণ করে তিরবেগে বনের মধ্যে অদৃশ্য হয়ে গেল কুকুরদের দল…
হঠাৎ তীব্র হয়ে বেজে উঠল কুকুরের উল্লসিত চিৎকার। সাশা বুঝল কুকুরগুলো তাইগরকে দেখতে পেয়েছে। জোকুইমের সঙ্গে সে ঊধ্বশ্বাসে ছুটল শব্দ লক্ষ করে…
একটু পরেই তারা কুকুরগুলোকে দেখতে পেল। একটা ঘন ঝোপের বাইরে দাঁড়িয়ে তারা তারস্বরে চিৎকার করছে। সাশা বুঝতে পারল ওই ঝোপের ভিতরেই লুকিয়ে আছে তাইগর।
আচম্বিতে হলুদ আর কালো ফোঁটাফোঁটা একটা দেহ বিদ্যুতের মতো ছিটকে এল ঝোপের বাইরে–ক্রুদ্ধ জাগুয়ার এতক্ষণে শত্রুর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, এতক্ষণে অতিক্রম করেছে তার ধৈর্যের সীমা শত্রুর আস্ফালন শুনে আর নিশ্চেষ্ট থাকতে রাজি নয় অরণ্য-সম্রাট!
কুকুরগুলো তাইগরকে অর্ধবৃত্তাকারে ঘিরে ধরে কামড় বসানোর উপক্রম করেছিল, কিন্তু তীক্ষ্ণ নখরযুক্ত থাবার নাগালের মধ্যে এগিয়ে গিয়ে কামড়াতে সাহস পাচ্ছিল না। তারা জানে খুব বলিষ্ঠ কুকুরও তাইগরের নখের থাবার প্রচণ্ড চপেটাঘাত সহ্য করে বেঁচে থাকতে পারে না–তাই তাইগর থাবা চালালেই তারা ছিটকে সরে যাচ্ছিল তার নাগালের বাইরে।
জোকুইম এসে পৌঁছাল ক্রুদ্ধ তাইগরের প্রায় বিশ গজ দূরত্বের মধ্যে। জন্তুটার চেহারা তখন ভয়ংকর হয়ে উঠেছে। যে-পুমাটাকে মেরেছিল জোকুইম, অথবা যে-জাগুয়ারটাকে বার্নারদো আর জর্জের সঙ্গে শিকার করেছিল সাশা, এই জন্তুটা একেবারেই তাদের মতন নয়–এটা যেমন হিংস্র, তেমনই নির্ভীক। অর্ধবৃত্তাকারে ঘুরে ঘুরে সে কুকুরগুলোকে আক্রমণ করার চেষ্টা করছে, সেইসঙ্গে তার গলা থেকে বেরিয়ে আসছে রুদ্ধ রোষের চাপা গর্জনধ্বনি।
জোকুইম ততক্ষণে পৌঁছে গেছে তাইগরের দশ গজের ভিতর। নতুন শত্রুর আবির্ভাব হতেই তার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল তাইগর, তার দুই চোখ হিংস্র আক্রোশে জ্বলে উঠল দু-টুকরো জ্বলন্ত কয়লার মতো। সে বুঝল এই হচ্ছে তার আসল শত্রু, একে নিপাত করতে পারলেই আজকের যুদ্ধে তার জয় নিশ্চিত। জোকুইমও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তাইগরের দিকে দুই হাতের শক্ত মুঠিতে বর্শাদণ্ড জমির সঙ্গে সমান্তরাল, বর্শার ফলা জমি থেকে দু-ফুট উপরে স্থির হয়ে রয়েছে।
