পরের দিন সকালেই জোকুইম হাজির সাশার কুটিরে, সঙ্গে শিকলে বাঁধা দুটি কুকুর। একটি কুকুর আকারে ছোটো, কিন্তু দেহের গঠনে বোঝা যায় যে দস্তুরমতো শক্তিশালী পশু। অন্য কুকুরটি সঙ্গীর চাইতে দৈহিক আয়তনে বড়ো, দেখলে মনে হয় এই জন্তুটাও শরীরে যথেষ্ট শক্তি রাখে।
জোকুইম বলল, যতদিন আবার চাঁদ না-উঠছে, ততদিন আমি আর শিকারে যাব না। এই দুটি কুকুরের মধ্যে একটিকে তুমি রাখতে পারো, এরা দুজনেই শিকারে ওস্তাদ। অবশ্য দ্রাগাওর সঙ্গে ওদের তুলনা চলে না, কিন্তু ও-রকম কুকুর তো একটাই হয়।
জোকুইম বড়ো কুকুরটিকে দেখিয়ে বলল, ও শিকারের পিছনে তাড়া করার সময়ে মুখ দিয়ে একটুও আওয়াজ করে না। ওর সঙ্গে শিকারে গেলে ওকে ভালো করে জানা দরকার। ছোটোটার নাম ভ্যালেন্ট। আমার মনে হয় ছোটো কুকুরটি তোমার উপযুক্ত সঙ্গী হবে।
সাশা বলল, বেশ ছোটো কুকুরটিকেই আমি নিলাম। জোকুইম তার কথা রেখেছিল। সাশা যতদিন চিনির কারখানায় ছিল ততদিন সে শিকারে বার হয়নি। তবে সাশার মনে ক্ষোভ বা দুঃখ ছিল না, সে দস্তুরমতো খুশি–ডম কার্লোস তাকে যা বলেছিল, তা নিশ্চিত সত্য বলে প্রমাণিত হয়েছে। সে অবশ্য জোকুইমকে তাইগর শিকার করতে দেখেনি। তাইগর বা জাগুয়ারের সঙ্গে পুমার যথেষ্ট তফাত–কিন্তু সাশা বুঝেছিল জোকুইমের পক্ষে বর্শার সাহায্যে জাগুয়ার শিকার আদৌ অসম্ভব নয়।
কিছুদিন পর সিনর শিকোর কাছে বিদায় নিয়ে সাশা বেরিয়ে পড়ল কুয়াবা অভিমুখে, যেখানে দাদা আর্নস্ট তার জন্য অপেক্ষা করছে। সঙ্গে ছিল বিশ্বস্ত সহচর অ্যাপারিসিও।
জঙ্গলের পথে পথে সারা শীতকালটা কেটে গেল, গ্রীষ্ম যখন শুরু হচ্ছে, সেইসময় একদিন তারা এসে পৌঁছাল কুয়াবা শহরের দ্বারে। তখন সন্ধ্যা আগত, তাই শহরে না-ঢুকে প্রান্তসীমায় তাঁবু খাঁটিয়ে তারা রাত কাটাল এবং পরের দিন সকালে প্রবেশ করল কুয়াবা শহরের মধ্যে। শহর চত্বরে একটি বলিতো (ক্যান্টিন) নামক বিপণিতে তারা আর্নস্টকে দেখতে পেল। সে একটা টেবিলের সামনে বসে ছিল, ভাইকে দেখে হাত তুলে অভ্যর্থনা জানাল।
সাশা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আর্নস্টকে পর্যবেক্ষণ করল। সে একইরকম আছে–সোনালি দাড়ি, বিশাল বক্ষ, দৃঢ় পেশিবদ্ধ বলিষ্ঠ বাহু–কিন্তু দেহে নয়, মনের দিক থেকে দাদা যেন বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছে।
কয়েকটা কথা বলার পর আর্নস্ট যা বলল, তা শুনে দাদার মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে আর কোনো প্রশ্ন তোলার সুযোগ পেল না সাশা।
আর্নস্ট বলল, আমরা যখন কোক্সিমে ছিলাম, তখন সেখানকার পুলিশ জানিয়েছিল একটি ছোটোখাটো চেহারার লোক আমাদের খোঁজ করেছিল। আমরা লোকটা সন্ধান পাইনি। ব্যাপারটা তোর মনে আছে সাশা?
তার কথা আমি ভুলেই গিয়েছিলাম। তুমি বললে তাই মনে পড়ল। তা সেই লোকটার তুমি সন্ধান পেয়েছ?
মাথা নেড়ে গম্ভীরভাবে আর্নস্ট বলল, আমি তাকে শুধু খুঁজে পাইনি, স্বচক্ষে দেখেছি এই শহরে। লোকটির নাম সিনর ফাভেল!
.
দশম পরিচ্ছেদ
আর্নস্টের কথা শুনে প্রথমে খুবই আনন্দিত হয়েছিল সাশা–ফাভেল তাহলে বেঁচে আছে! খুনের দায় থেকে তাহলে সাশা অব্যাহতি পেয়েছে। যদিও ফাভেলের মতো মানুষের খুন হওয়াই উচিত।
কিন্তু একটু পরেই আনন্দের পরিবর্তে জাগল প্রচণ্ড ক্রোধ–ফাভেল তাহলে দূরদূরান্ত পেরিয়ে তাদের ধাওয়া করছে প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য! সাশা স্থির করল এবার দেখা হলে ফাভেলকে সে জেনেশুনে ঠান্ডা মাথায় খুন করবে। আর্নস্টও ফাভেলকে মেরে নিশ্চিন্ত হতে চায়–তবে সাশার পরিবর্তে সে নিজেই হতে চায় হন্তারক
দুই ভাই বিস্তর খোঁজাখুঁজি করেও ফাভেলকে কোথাও দেখতে পেল না। প্রথম তাকে দেখেছিল আর্নস্ট, তার সঙ্গে ছিল কয়েকটি লোক সম্ভবত বন্ধুবান্ধব। অত লোকের সামনে দোকানের মধ্যে ফাভেলের সঙ্গে বোঝাঁপড়া করতে পারেনি আর্নস্ট, সে ফাভেলকে একা পেতে চেয়েছিল, কিন্তু প্রথম দর্শনের পর আর কোনোদিনই আর্নস্ট ফাভেলের সাক্ষাৎ পায়নি।
কিছুদিন কুয়াবা শহরে কাটিয়ে আগের পরিকল্পনা অনুসারে হিরার সন্ধানে যাত্রা করল দুই ভাই। তখনও অ্যাপারিসিও ছিল তাদের সঙ্গে। মাত্তো গ্রসোর বনভূমিতে হিরার লোভে ছুটেছিল আরও বহু মানুষ। শুধু স্থানীয় মানুষ নয় অনেক বিদেশিও এসে ভিড় করেছিল মাত্তো গ্রসোর খাঁড়ির ধারে ধারে হিরার লোভে।
সেই হীরক-অভিযানে বারংবার বিপদে পড়েছে দুই ভাই এবং ভাগ্যের আশীর্বাদে মরতে মরতে বেঁচে গেছে অনেকবার। সেসব কাহিনি সবিস্তারে বলার জায়গা এখানে নেই–তাই সংক্ষেপে বলছি উক্ত অভিযানে তারা সফল হয়েছিল, বেশ কিছু অর্থের মালিক হয়েছিল দুই ভাই–তারপর একদিন এই ভবঘুরে জীবনে বিরক্ত হয়ে বড়ো ভাই আর্নস্ট একটি স্থানীয় মেয়েকে বিবাহ করে সংসারী হল এবং ছোটো ভাই সাশা তার বেদুইনো নামক অশ্বতরটির পিঠে চেপে ভ্যালেন্টো নামে কুকুরটিকে নিয়ে বেরিয়ে পড়ল অরণ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ভ্রমণ করে অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের জন্য।
আসলে দুই ভাইয়ের চরিত্র ছিল দুধরনের। আর্নস্ট ছিল ঘরমুখো, বনজঙ্গল ছিল তার দুই চোখের বিষ। সাশার মন ছিল বহির্মুখী–অরণ্যের স্নিগ্ধ শ্যামলিমা এবং বিপজ্জনক পরিবেশ তাকে আকর্ষণ করত সর্বদা তাই সুযোগ পেলেই ঘর ছেড়ে সে ছুটত বনের দিকে।
