ব্রেজিলের স্থানীয় ভাষায় সাকুয়ারানা বলতে বোঝায় পুমা বা কুগার। তাইগরের মতোই পুমাও বিড়াল-জাতীয় পশু, তবে আকারে ছোটো এবং স্বভাবও তাইগরের মতো ভয়ংকর নয়।
জোকুইম হঠাৎ দরজার বাইরে এসে হাঁক দিল, দ্রাগাও! কয়েক মুহূর্ত পরেই একটা লালচে-বাদামি রং-এর কুকুর দৌড়ে এল সেখানে। জোকুইম কুকুরটাকে আদর করতেই সে সজোরে গা ঘষতে লাগল লোকটার দুই পায়ে।
সাও লরেংকোর মধ্যে আমার দ্রাগাও হচ্ছে সবচেয়ে পাকা শিকারি, জোকুইম বলল, সঙ্গে সঙ্গে কুকুরটাকে সাদরে চুম্বন করল সে, তারপর সাশার দিকে ফিরে তাকাল সে, তুমি দ্রাগাও আর আমার সঙ্গে শিকার করতে চাও, সিনর? বেশ তো, কাল সকালেই আমরা শিকারের সন্ধানে যাত্রা করব।
জোকুইম আবার তার কুটিরের মধ্যে অন্তর্ধান করল। সাশা আর অ্যাপারিসিও ঘোড়ায় চড়ে ফিরল তাদের আস্তানার দিকে। সাশা যে খুব বিরক্ত ও হতাশ হয়েছে, তার হাবভাব দেখেই বুঝতে পেরেছিল অ্যাপারিসিও। সে সাশাকে বলল, ওই বুড়ো রেড ইন্ডিয়ান সম্পর্কে চট করে কিছু ভেবে নিয়ো না। তাহলে ঠকবে।
.
নবম পরিচ্ছেদ
পরের দিন খুব ভোরে, তখনও দিনের আলো ভালোভাবে ফুটে ওঠেনি সাশা শুনতে পেল তার দরজায় কেউ ধাক্কা মারছে। দরজা খুলে সাশা দেখল সামনে দাঁড়িয়ে আছে জোকুইম। তার ঊর্ধ্বাঙ্গ নগ্ন, নিম্নাঙ্গে একটা নীল প্যান্ট, প্যান্টের তলার দিকটা ঢুকিয়ে দেওয়া হয়েছে প্রকাণ্ড একজোড়া বুটজুতোর ভিতর। লোকটির চোখের দৃষ্টি পরিষ্কার, হাবভাবে নেশার চিহ্নমাত্র নেই।
দ্রাগাও আর আমি প্রস্তুত। জোকুইম বলল, তুমি তৈরি হলেই আমরা যাত্রা করতে পারি।
পরক্ষণেই অন্ধকারের মধ্যে চলন্ত ছায়ার মতো মিলিয়ে গেল সে!…
এমন অনাড়ম্বর শিকার অভিযান আগে কখনো সাশার চোখে পড়েনি। সাধারণত শিকারে যাওয়ার আগে শিকারিরা গরম কফি অথবা মাতে (চা) পান করে, তারপর একটি সরলরেখায় সারিবদ্ধ হয়ে তারা প্রবেশ করে বনের মধ্যে। এখানে সেসব কিছুই হল না। সাশা পোশাক পরে রাইফেল হাতে ঘরের বাইরে আসতেই হঠাৎ অন্ধকার যুঁড়ে সামনে এসে দাঁড়াল জোকুইম, এবার আমরা যাচ্ছি।
কথাটা বলেই সে চলতে শুরু করল। পিছনে অনুসরণরত সাশার দিকে সে ফিরেও চাইল না।
ঘর থেকে বেরিয়ে জোকুইমের সঙ্গে চলে আসার আগে অ্যাপারিসিওর ঘুম ভাঙিয়ে তাকে সঙ্গে আনেনি সাশা। পরে বুঝল কাজটা সে ভালোই করেছিল। বুড়ো জোকুইমের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে হাঁটতে গিয়ে সাশা যখন হাঁফিয়ে পড়ছিল, সেইসময় তার মনে হল দুর্বলতার সাক্ষী হিসাবে অ্যাপারিসিওর উপস্থিতি তার ভালো লাগত না।
কিছুক্ষণ চলার পর তারা জোকুইমের কুঁড়েঘরের সামনে এসে পড়ল। একবারও না-থেমে চলন্ত অবস্থাতেই সজোরে লাথি মেরে বুট দুটোকে জোকুইম ঘরের মধ্যে ছুঁড়ে ফেলল এবং নগ্ন পদেই হাঁটতে শুরু করল নিকটবর্তী অরণ্যের দিকে…।
ঘন জঙ্গলের সবুজ শ্যামলিমার বুকে রক্তাভ বিদ্যুতের মতন চমকে উঠছিল দ্রাগাওর লালচে বাদামি শরীর, পরক্ষণেই আবার অন্তর্ধান করছিল শিকারিদের দৃষ্টির অন্তরালে অরণ্যের গর্ভে। দ্রাগাওকে আর দেখতে না-পেলেও ঝোপঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে জোকুইমের পিঠ আর মাথা দেখতে পাচ্ছিল সাশা। হঠাৎ থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল জোকুইম, সামনের দিকে আঙুল বাড়িয়ে বলল, সাকুয়ারানা।
সাশা তাকিয়ে দেখল একটা মস্ত গাছের তলায় ঊর্ধ্বমুখে দাঁড়িয়ে সারমেয় ভাষায় চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে দ্রাগাও, তার দৃষ্টি নিবদ্ধ রয়েছে পূর্বোক্ত গাছের ডালে উপবিষ্ট একটি পুমার দিকে।
পুমা সাধারণত মানুষকে আক্রমণ করে না। কিন্তু কোণঠাসা হলে যেকোনো জানোয়ারই হিংস্র আক্রমণে ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে। গাছের উপর পুমার অবস্থাও সেইরকমই। যেকোনো মুহূর্তে অরণ্যের শান্তিভঙ্গ হতে পারে রক্তাক্ত যুদ্ধে। সময় থাকতে পুমার একটা ছবি তুলে না-রাখলে পরে হয়তো সেই সুযোগ আর পাওয়া যাবে না–অতএব ক্যামেরাকে বন্ধনমুক্ত করে পুমার ফটো তুলল সাশা।
জোকুইম আন্দাজেই বুঝল ক্যামেরার কাজ হয়ে গেছে, সে হাত বাড়িয়ে রাইফেলের দিকে ইশারা করল। সাশা বুঝল তাকেই এখন গুলি চালাতে হবে। সে রাইফেল তুলল, সঙ্গেসঙ্গে শূন্যে একটি নিখুঁত অর্ধবৃত্ত রচনা করে লাফ দিল পুমা এবং এসে পড়ল মাটি থেকে কয়েক ফুট মাত্র উঁচু একটা ডালের উপর। দ্রাগাও তীব্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল। লক্ষ্য স্থির করে গুলি ছুড়ল সাশা। তৎক্ষণাৎ আবার লাফ মারল পুমা। গুলি লাগল তার বুকে।
মরণাহত পুমা মাটিতে পড়ল, কিন্তু তখনও তার লড়াইয়ের উদ্যম শেষ হয়নি। সে এবার ঝাঁপ দিল সাশার দিকে। একইসঙ্গে আক্রমণ করল জোকুইম আর দ্রাগাও। জোকুইমের বর্শা এবং দ্রাগাও একইসঙ্গে ছুটল পুমার কণ্ঠ লক্ষ করে বর্শা, দ্রাগাও আর পুমা মিলিত হল শূন্যপথে। দ্রাগাওর কণ্ঠভেদ করে বর্শাফলক বিদ্ধ হল পুমার কাঁধের ঠিক পিছনে। পুমার দেহ যখন মাটিতে ছিটকে পড়ল, তখন সে প্রাণহীন মৃত। তবু সাশা কোনো ঝুঁকি নিতে চাইল না, জন্তুটার মৃত্যু–সম্বন্ধে নিশ্চিত হওয়ার জন্য সে আবার গুলি ছুড়ল।
বর্শা ফেলে দিয়ে মরণাপন্ন দ্রাগাওকে জড়িয়ে ধরল জোকুইম। কিছুক্ষণ পরে জোকুইমের আলিঙ্গনের মধ্যেই মৃত্যুবরণ করল দ্রাগাও। শোকবিহ্বল জোকুইমের দিকে তাকিয়ে সাশা বুঝল এখানে তার উপস্থিতি অনাবশ্যক। ক্যামেরাটাকে মাটি থেকে তুলে নিয়ে সে নিঃশব্দে স্থানত্যাগ করল…
