ডম কার্লোসের তাইগরেরো কাহিনির সত্যাসত্য নির্ণয় করার জন্য এখন বদ্ধপরিকর হল সাশা। এবার সে একটা চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে আসবে। না হলে এই ব্যাপারটা নিয়ে সে আর মস্তিষ্ককে ঘর্মাক্ত করবে না।
এক রাতে সে সিনর শিকোকে প্রশ্ন করল, সিনর শিকো, আপনি কি এই অঞ্চলে জোকুইম গুয়াতো নামে কোনো রেড ইন্ডিয়ান শিকারিকে জানেন? শুনেছি, ওই লোকটা শুধুমাত্র বর্শা দিয়ে তাইগর শিকার করে?
জোকুইম? সিনর শিকো একটু চিন্তা করল, হ্যাঁ, এই নামে একটি লোক আছে বটে। গুয়াতে হচ্ছে রেড ইন্ডিয়ান জাতির একটি শাখার নাম। অর্থাৎ জোকুইম ওই গুয়াতো শাখার অন্তর্গত একটি মানুষ। লোকটা আমার কাছে মাঝে মাঝে কাজ করে। কিন্তু গ্রীষ্মকালে যখন তাইগররা গোরুবাছুরের উপর হামলা করে, সেইসময় ফাজেন্দা আলেগর নামে যে বিশাল র্যাঞ্চ বা গোচারণ-ভূমি বহমান নদীর উত্তরদিকে কুয়াবা শহর পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছে সেই র্যঞ্চের হয়ে ভাড়াটে শিকারি হিসাবে কাজ করে জোকুইম গুয়াতো।
আরও কিছুক্ষণ কথা বলার পর সাশা সিনর শিকোর কাছে জানতে পারল যে, প্রায় তিরিশ বছর আগে জোকুইম এই অঞ্চলে আসে। শোনা যায় সে কুড়িটা হিংস্র তাইগরকে বর্শা দিয়ে শিকার করেছে। লোকটি কারো সাহায্য নেয় না, একাই শিকার করে অবশ্য কুকুরের দল তাকে তাইগর শিকারে সহায়তা করে।
সাশা জানতে চাইল রেড ইন্ডিয়ান জাতি কি কারো সাহায্য না-নিয়ে একা শিকার করতে অভ্যস্ত?
উত্তরে সিনর শিকো জানাল তারা এককভাবে তাইগরের মুখোমুখি হতে চায় না। তারা দল বেঁধে শিকার করে। তাদের হাতে থাকে তিরধনুক আর জাগায়া (বর্শা)। তবে রেড ইন্ডিয়ান জাতির মধ্যে দু-একজন নিঃসঙ্গ তাইগর-শিকারির কথা মাঝে মাঝে শোনা যায় বটে। কিন্তু বর্তমানে জোকুইম গুয়াতো হচ্ছে একমাত্র শিকারি যে সম্পূর্ণ এককভাবে বর্শা হাতে তাইগরের বিদ্যুত্বৎ ক্ষিপ্র আক্রমণের সম্মুখীন হওয়ার সাহস রাখে। লম্বা লম্বা ঘাস আর জলাভূমির মধ্যে রাইফেল নিয়ে লক্ষ্য স্থির রাখা অসম্ভব, সেখানে বর্শা হচ্ছে একমাত্র নির্ভরযোগ্য অস্ত্র।
জোকুইম বর্শাধারী শিকারি, সিনর শিকো বলল, তার মতন নির্ভীক মানুষ আমি আর একটিও দেখিনি।
সিনর শিকো আরও বলল, আমার মনে হয় বনবাসী তাইগারদের মধ্যেও জোকুইমের খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে। বর্শাধারী তাইগরেরো এখন অত্যন্ত বিরল, তাদের সংখ্যা ক্রমশ কমে আসছে।
কয়েকদিন পরের কথা… সিনর শিকোর নির্দেশ অনুসারে নদীর পশ্চিমদিকে অশ্বারোহণে যাত্রা করল সাশা, সঙ্গে অপরিহার্য সঙ্গী অ্যাপারিসিও। কিছুদূর যাওয়ার পরে একটা ভাঙাচোরা কুঁড়েঘর তাদের চোখে পড়ল। কাছে গিয়ে তারা দেখল অধভগ্ন ও বিধ্বস্ত কুটিরের দরজাটা চামড়ার বাঁধনে আটকে কোনোরকমে দাঁড়িয়ে আছে ঘরের ভিতরটা অন্ধকার, সেখানে কোনো মানুষ বাস করে বলে মনে হয় না।
দরজার কাছে দাঁড়িয়ে সাশা হাঁক দিল, ভিতরে কেউ আছে?
দরজা ঠেলে একটি রেড ইন্ডিয়ান বাইরের উজ্জ্বল সূর্যালোকে আত্মপ্রকাশ করল। লোকটির সঠিক বয়স অনুমান করা অসম্ভব মনে হয় ষাট হবে কিন্তু তার গায়ের চামড়া এখনও টান টান, কুঁচকে যায়নি একটুও। লোকটির পরনে নীল প্যান্ট আর খাকি শার্ট শার্টের হাতা কনুইয়ের কাছে ছিঁড়ে উড়ে গেছে–পা নগ্ন, জুতো নেই।
লোকটিকে দেখেই সাশা বুঝতে পারল সে মদ্যপান করে নেশাগ্রস্ত হয়েছে। সাশার মনটা খারাপ হয়ে গেল তার দাদা আর্নস্টের কথাই সঠিক প্রমাণিত হল–বনজঙ্গল ভেঙে এত কষ্ট করে এত দূরে এসে সে আবিষ্কার করল একটি নেশাখোর মাতাল বুড়ো রেড ইন্ডিয়ানকে! কী আফশোস!
যাই হোক গাছের সঙ্গে ঘোড়া বেঁধে লোকটির ইঙ্গিতে সঙ্গীকে নিয়ে কুটিরের মধ্যে প্রবেশ করল সাশা। কুঁড়েঘরের ভিতরটা খুব নোংরা আর দুর্গন্ধে পরিপূর্ণ। বেশ বোঝা যায় লোকটি এখানে একলাই বাস করে। ছোটো ঘরটার একধারে একটা ছেঁড়াখোঁড়া তাপ্লিমারা হ্যামক টাঙানো আছে। হ্যামকের তলায় একটা জাগ কাত হয়ে পড়ে ঘরের মালিকের বর্তমান অবস্থার কারণ নির্দেশ করছে!
সাশা বিনীতভাবে বলল, তুমিই কি সেই বিখ্যাত তাইগরেরো, যার কথা আমি শুনেছি?
লোকটির কালো চোখ দুটিতে বিদ্যুতের মতো জ্বলে উঠল বুদ্ধির দীপ্তি, কিন্তু তার মুখের ভাব রইল আগের মতোই অসাড়, সেখানে অনুভূতির কোনো চিহ্ন নেই। সাশা ঘরের ভিতরটা খুঁটিয়ে দেখল–কয়েকটা তির আর ধনুক ছাড়া একটা প্রকাণ্ড বর্শা তার চোখে পড়ল। বর্শাটা হাতে নিয়ে পরীক্ষা করল সাশা চওড়া একটা লোহার ফলা কাষ্ঠদণ্ডের সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ফলার দুই পাশ কোনো বস্তুকে কেটে ফেলার উপযুক্ত করা হলেও জিনিসটা তেমন ধারালো হয়নি।
বুড়ো রেড ইন্ডিয়ান সাশার সামনে এসে দাঁড়াল, তুমি আমার মনিব সিনর শিকো পিন্টোর কাছ থেকে আসছ?
সাশা জানাল বর্তমানে সে পূর্বোক্ত সিনর শিকোর কাছ থেকেই আসছে বটে; কিন্তু অনেক দূরবর্তী যে-অঞ্চলে তাইগর-শিকারি হিসাবে তার খ্যাতি ছড়িয়ে পড়েছে, সেই রিও গ্র্যান্ড দো সাল নামে জায়গাটা থেকেই সে এসেছে কেবলমাত্র খ্যাতনামা তাইগরেরোর সঙ্গে আলাপ করতে।
আমার মনিবের কাছ থেকে তুমি কি কোনো প্রস্তাব এনেছ? বুড়ো বলল, নদীর কাছাকাছি নীচু জমিতে এখন তাইগরের দেখা পাওয়া যাবে। বর্ষা শুরু হলে তারা এই উঁচু জমির উপর উঠে আসবে। এখন এই জায়গাটাতে যে-জন্তুটার তুমি দেখা পাবে, তার নাম সাকুয়ারানা।
