সাশা এইবার তাইগরের দিক থেকে ফিরে জর্জের দিকে চাইল। সে আশা করেছিল জর্জ গুলি চালানোর জন্য প্রস্তুত হবে, কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়েই সাশা বুঝতে পারল ছেলেটি ভীষণ ভয় পেয়েছে নিদারুণ আতঙ্কে তার বুদ্ধিভ্রংশ ঘটেছে।
ফিসফিস করে অত্যন্ত মৃদুস্বরে সাশা বলল, যাও, বার্নারদোকে ডেকে নিয়ে এসো। তার কাছে আমার ক্যামেরা রয়েছে।
–জর্জ ধীরে ধীরে পা ফেলে অকুস্থল থেকে অদৃশ্য হল এবং একটু পরেই ছোটো ভাই বার্নারদোকে নিয়ে ফিরে এল যথাস্থানে। বার্নারদের হাত থেকে ক্যামেরাটা নিয়ে নিজের রাইফেলটা তার দিকে বাড়িয়ে দিল সাশা, রাইফেলটা ধরো। আমি যখন ছবি তুলব, তখন যদি জন্তুটা আক্রমণ করে, তাহলে তুমি ওকে লক্ষ করে গুলি চালাবে।
তাইগরকে দেখে বার্নারদো দাদার মতোই ঘাবড়ে গিয়েছিল, তবে রাইফেলটা সে হাত বাড়িয়ে নিতে ভুলল না।
সাশা ক্যামেরার ফোকাস ঠিক করে শাটার টিপে দিল। একটা অস্পষ্ট শব্দ উঠল। ঠিক সেই মুহূর্তেই কুকুরগুলো হঠাৎ নীরব হয়ে পড়েছিল–শাটার টেপার ক্ষীণ শব্দ তাইগরের কানে যেতেই সে হঠাৎ ঘুরে বসে সাশার উপর তার দুই চোখের জ্বলন্ত দৃষ্টি স্থাপন করল।
রাইফেলটা আমার হাতে দাও, ফিসফিস করে বার্নারদোকে বলল সাশা। সে একবারও তাইগরের দিক থেকে চোখ সরায়নি। যখন রাইফেলের বাঁট তার হাত স্পর্শ করল, ঠিক সেই মুহূর্তে এক লাফ মেরে বিশ ফুট উঁচু বৃক্ষশাখা থেকে মাটির উপর এসে পড়ল তাইগর! কুকুরগুলো তৎক্ষণাৎ চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে তাইগরের ভয়ংকর থাবার নাগাল থেকে দূরে সরে গেল; আর হঠাৎ ভীষণ আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল বার্নারদো।
কুকুরগুলো আবার মিলিতভাবে আক্রমণ করতে ছুটে এল তাইগরের দু-পাশে। কিন্তু কুকুরদের দিকে ফিরেও তাকাল না অতিকায় মার্জার, তার জ্বলন্ত দৃষ্টি এখন নিবদ্ধ হয়েছে। বার্নারদোর উপর। একটি হাতের মুঠি সজোরে মুখের উপর চেপে ধরেছে বার্নারদো, যেন ভিতর থেকে ঠেলে-ওঠা একটা আর্ত-চিৎকার সে রুখে দিতে চাইছে প্রাণপণে এবং বিস্ফারিত দুই চক্ষের ভয়ার্ত দৃষ্টিতে নিরীক্ষণ করছে অদূরবর্তী তাইগরকে।
বার্নারদোকে লক্ষ করে ঝাঁপিয়ে পড়ল তাইগর, সঙ্গেসঙ্গে অগ্নি-উদ্গার করে গর্জে উঠল সাশার রাইফেল। সাশা দেখল একটা প্রকাণ্ড থাবা বাতাস কেটে ছুটে এল, পরক্ষণেই মাটিতে ছিটকে পড়ল বার্নারদো। আবার গুলি ছুড়ল সাশা তাইগরকে লক্ষ করে। সাশার উলটোদিক থেকে তাইগরের মাথায় গুলি চালাল জর্জ। একসঙ্গে দুটি বুলেটের আঘাতে প্রকাণ্ড জন্তুটা কুণ্ডলী পাকিয়ে মৃত্যুশয্যায় শুয়ে পড়ল।
বার্নারদো তখন হাঁটু পেতে বসে পড়েছে। সাশা দেখল তার শার্ট অনেকটা জায়গা নিয়ে লম্বালম্বিভাবে ছিঁড়ে গেছে। প্রথমে সাশা ভেবেছিল তাইগরের ধারালো নখ বার্নারদোর পাঁজর বিদীর্ণ করেছে–পরে দেখা গেল তা নয়, তাইগরের থাবার তালু সজোরে আঘাত করে ছেলেটিকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে এবং সেই আঘাতের ফলেই ছিঁড়ে গেছে শার্ট–ভয়ংকর নখগুলো বার্নারদোর শরীর স্পর্শ করতে পারেনি, সে ছিল সম্পূর্ণ অক্ষত।
ওই ঘটনার পর বহু তাইগর শিকার করেছে সাশা। ত্রিশটি বছর কাটিয়েছে সে দক্ষিণ আমেরিকার বনে জঙ্গলে। ওই সময়ের মধ্যে তিনশো তাইগর মেরেছে সে। নিহত জন্তুগুলোর মধ্যে অন্তত তিরিশটি পশুর সম্মুখীন হয়েছিল সে বর্শা হাতে। তবে দক্ষিণ আমেরিকার বনরাজ্যের অপ্রতিদ্বন্দ্বী সম্রাট তাইগরকে সে কখনো ঘৃণা করতে পারেনি ভয়াল সুন্দর ওই হিংস্র জীবটি সম্পর্কে সে পোষণ করত শ্রদ্ধামিশ্রিত এক অদ্ভুত ভালোবাসা!
.
অষ্টম পরিচ্ছেদ
তাইগর শিকারের পর কেটে গেল দুটি সপ্তাহ। ওই সময়ের মধ্যে যেসব বিকল যন্ত্র মেরামতের জন্য চুক্তিবদ্ধ হয়েছিল সাশা, সেই যন্ত্রগুলোকে সে সারিয়ে ব্যবহারের উপযুক্ত করে দিল। তারপর পারিশ্রমিকের অর্থ গ্রহণ করে ডম জুয়ায়োকে বিদায় জানিয়ে সাও লরেংকোর পথে রওনা হল সাশা। বলাই বাহুল্য, সঙ্গে ছিল পথের দিশারী অ্যাপারিসিও।
প্রায় মাস দুই ধরে বনজঙ্গল আর বিপজ্জনক জলাভূমি অতিক্রম করে সাও লরেংকোর কাছাকাছি সিনর শিকো পিন্টো নামে এক ভূস্বামীর গৃহে আতিথ্য গ্রহণ করল সাশা ও অ্যাপারিসিও।
ওই সময়ের মধ্যে দাদা আর্নস্টের সঙ্গে যোগাযোগ রাখার কোনো উপায় ছিল না সাশার। বনের পথে সরকারি ডাকবিভাগ সম্পূর্ণ অচল, স্থানীয় মানুষ সম্পূর্ণ নির্ভর করে বেসরকারি ব্যবস্থার ওপর। এখানে আসার আগে এক র্যাঞ্চ মালিকের অতিথি হয়েছিল সাশা। সেখানে সে শুনল খুব শীঘ্রই একটি লোক স্থানীয় অধিবাসীদের চিঠিপত্র নিয়ে রওনা দেবে দেশের বিভিন্ন স্থানে অবস্থিত আত্মীয়স্বজনের কাছে ওই চিঠিগুলো পৌঁছে দেওয়ার জন্য। পূর্বোক্ত পত্রবাহকের হাতে চিঠি দিয়ে কোক্সিমে দাদা আর্নস্টকে খবর পাঠাল সাশা কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই কুয়াবা শহরে এসে দাদা আর্নস্টের সঙ্গে দেখা করবে সে।
সিনর শিকো পিন্টো নামে যে ভূস্বামীর আতিথ্য গ্রহণ করেছিল সাশা, সে ছিল ওই অঞ্চলের একজন চিনির কারবারি। সাশা আর অ্যাপারিসিওর সাময়িক বাসস্থান হিসাবে বরাদ্দ ছিল একটি মাটির কুঁড়েঘর। সিনর শিকোকে দুজনেই কথা দিয়েছিল চিনির কারখানার যন্ত্রপাতিগুলো তারা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করবে এবং ওই কাজ শেষ না-করে তারা স্থানত্যাগ করবে না।
