বলাই বাহুল্য, এমন সুযোগ হাতছাড়া করল না সাশা। জর্জ আর বার্নারদো নামে মালিকের দুই ছেলের সঙ্গে ঘোড়ায় চড়ে সাশা যাত্রা করল তাইগর শিকারের উদ্দেশে। তাদের সঙ্গে চলল একদল শিকারি কুকুর। মাটিতে গন্ধ শুঁকতে শুঁকতে কুকুরের পাল এগিয়ে যাচ্ছিল, তাদের অনুসরণ করছিল অশ্বারোহী দুই ভাই। খুব মনোযোগের সঙ্গে ব্যাপারটা লক্ষ করছিল সাশা পিছন থেকে। তার দুই সঙ্গী কুকুরের সাহায্যে শিকার করতে অভ্যস্ত হলেও ওই ধরনের শিকারে সাশা ছিল অনভিজ্ঞ।
কয়েক মিনিট ঘোড়ার পিঠেই চতুষ্পদ ও দ্বিপদ শিকারিদের অনুসরণ করতে চেষ্টা করল সাশা, কিন্তু কিছুক্ষণ পরে ঘন ঝোপ আর লতার বেড়াজাল ভেদ করে ঘোড়া চালানো অসম্ভব হয়ে উঠল। তখন ঘোড়াটাকে একটা গাছে বেঁধে রেখে সাশা দৌড়াতে শুরু করল। বড়ো ভাই জর্জও ঘোড়া থেকে ছেড়ে পায়ে হেঁটেই অগ্রসর হচ্ছিল। একটু পরে তাকে আর কুকুরের দলটাকে দেখতে পেল সাশা। কুকুরগুলো একটা মস্ত গর্তের সামনে তখন বৃত্তাকারে ঘুরছিল।
জর্জ গর্তটাকে দেখিয়ে ফিসফিস করে বলল, কায়তেতু! অর্থাৎ শুয়োর!
যাচ্চলে! তাইগরের পরিবর্তে শুয়োর! কুকুরগুলো প্রথমে তাইগরের পিছু নিয়ে পরে শুয়োরের গন্ধে আকৃষ্ট হয়েছিল, অথবা প্রথম থেকেই কুকুরদের চালচলন বুঝতে ভুল করেছিল দুই ভাই–সেটা সঠিকভাবে নির্ণয় করতে পারল না সাশা। তবে তাইগরের পরিবর্তে শুয়োর শিকারের সম্ভাবনা তাকে আদৌ উৎসাহিত করতে পারেনি। কিন্তু জর্জ আর বার্নারডো শূকরমাংস ভোজনের আশায় উৎফুল্ল হয়ে উঠল, মহা উৎসাহে তারা আগুন ধরিয়ে দিল গর্তের মুখে। কিছুক্ষণ পরেই গর্তের ভিতর থেকে ছিটকে বেরিয়ে এসে একটা শুয়োর দৌড় দিল ঘন জঙ্গলের দিকে। তৎক্ষণাৎ গর্জে উঠল রাইফেল, লুটিয়ে পড়ল বুলেট-বিদ্ধ শূকরের মৃতদেহ।
সেই রাতে সুস্বাদুবরাহমাংস দিয়ে নৈশভোজন সমাপ্ত করল তিন শিকারি। তিনজন একসঙ্গে ঘুমিয়ে পড়লে বিপদ ঘটতে পারে, তাই রাত্রে পালা করে জেগে থাকাই উচিত বলে বিবেচনা করল জর্জ আর সাশা। বার্নারদো বয়সে ছোটো বলে তাকে রাত জেগে পাহারা দেওয়ার কর্তব্য থেকে অব্যাহতি দেওয়া হল।
পরের দিন খুব ভোরে উঠে আবার কুকুর নিয়ে তাইগরের সন্ধানে ছুটল তিন শিকারি। কিছুক্ষণ পরেই অগ্রবর্তী সারমেয়-বাহিনীর দলপতির কণ্ঠে জাগল গভীর গর্জন! কুকুরের ভাষা বুঝতে পারত জর্জ আর বার্নারদো–দলপতির কণ্ঠস্বর শুনেই তারা বুঝে নিল সারমেয়-বাহিনী এইবার তাইগরের সন্ধান পেয়েছে। শব্দ লক্ষ করে ঘোড়া ছুটিয়ে দিল জর্জ, অন্য দুজন তাকে অনুসরণ করল।
কিছুদূর যাওয়ার পর কর্দৰ্মাক্ত জমির উপর তাইগরের থাবার চওড়া দাগ তাদের চোখে পড়ল। পদচিহ্ন যেখানে রয়েছে, সেখানে এক ইঞ্চি গভীর কয়েকটি গর্তের সৃষ্টি করেছে তাইগরের ভয়ংকর নখগুলো!
জন্তুটা লাফ দিতে প্রস্তুত হয়েছিল, জর্জ মৃদুস্বরে বলল, না হলে মাটিতে নখের দাগ দেখাই যেত না।
এতক্ষণ পর্যন্ত সাশার কল্পনাতেই ছিল তাইগরের অবস্থান, কিন্তু এইবার সে জন্তুটার অস্তিত্ব সম্পর্কে সচেতন হল এবং সঙ্গেসঙ্গে তার ধমনীতে রক্তস্রোত চঞ্চল হয়ে সর্বাঙ্গে জাগিয়ে তুলল উত্তেজনার শিহরন!
কুকুরগুলো ছুটতে শুরু করল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই অন্তর্ধান করল শিকারিদের দৃষ্টিসীমার অন্তরালে। সবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে কুকুরগুলোকে অনুসরণ করতে সচেষ্ট হল তিন শিকারি। শিকারকে তাড়া করার আগে ক্যামেরাটাকে বার্নারদোর হাতে তুলে দিয়েছিল সাশা।
আচম্বিতে ভয়ংকর শব্দে বেজে উঠল কুকুরের তীব্র কণ্ঠস্বর! ঘোড়া থেকে লাফিয়ে নেমে শব্দ লক্ষ করে ছুটল জর্জ আর সাশা। সামনেই একটা ঝোপ, সেটা পার হতেই সাশার চোখে পড়ল একটা ভয়াবহ দৃশ্য–ঝোপের পরেই যে ফাঁকা জায়গাটা রয়েছে, সেখানে মাটির উপর শুয়ে রক্তাক্ত শরীরে ছটফট করছে একটা কুকুর, তার বিদীর্ণ উদর থেকে বেরিয়ে এসেছে ভিতরের নাড়িভুঁড়ি! জন্তুটাকে যন্ত্রণা থেকে আশু মুক্তি দিতে তার মাথা লক্ষ করে গুলি ছুড়ল সাশা–সব শেষ।
ঠিক সেইসময় সামনের বনভূমির দিকে সাশার দৃষ্টি আকর্ষণ করল জর্জ। জর্জের ইঙ্গিত অনুসারে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতেই যে-দৃশ্যটি সাশার চোখের সামনে ফুটে উঠল–পরবর্তীকালে সেইরকম দৃশ্য বহুবার দর্শন করলেও প্রথম দিনের সেই অভিজ্ঞতা সাশা কোনোদিনই ভুলতে পারবে না
মাটি থেকে প্রায় বিশ ফুট উপরে একটা গাছের ডালে বসে শিকারিদের নিবিষ্টচিত্তে নিরীক্ষণ করছে তাইগর!
তার চোখের দৃষ্টিতে ভয় বা ক্রোধের চিহ্ন নেই, আছে শুধু কৌতূহলের আভাস!
সাশা পরে জানতে পেরেছিল বনবাসী পশুদের মধ্যে তাইগরকে ভয় করে না একটিমাত্র জানোয়ার পেকারি! ওই জন্তুটা হচ্ছে একধরনের বুনো শুয়োর; আকারে ছোটো, স্বভাবে ভয়ংকর। পেকারিরা সর্বভুক, আমিষ বা নিরামিষ কোনো খাদ্যেই তাদের আপত্তি নেই। তাইগরকে দেখলেই পেকারিরা দল বেঁধে আক্রমণ করে। দলের মধ্যে পড়ে গেলে তাইগরের আর রক্ষা নেই, কয়েকটি শত্রুকে হত্যা করলেও দলবদ্ধ পেকারির আক্রমণে মৃত্যু তার অবধারিত। তাই পেকারির দল তাইগরকে আক্রমণ করলেই সে চটপট গাছে উঠে পড়ে। গাছের তলায় অনেকক্ষণ আস্ফালন করার পর পেকারিরা যখন বুঝতে পারে তাইগরকে তারা আর ধরতে পারবে না, তখন তারা দল বেঁধে স্থানত্যাগ করে। এতক্ষণ গাছের উপর বসে সাগ্রহে দলটাকে লক্ষ করছিল তাইগর, এইবার হঠাৎ ঝাঁপ দিয়ে দলছুট একটা পেকারিকে মুখে তুলে নিয়ে সে বিদ্যুদবেগে সরে পড়ে দলটার নাগালের বাইরে। এই তাইগরটাও বোধ হয় কুকুর আর মানুষের মিলিত দলটাকে পেকারি-জাতীয় জীব ভেবে নিয়ে সুযোগের জন্য অপেক্ষা করছিল।
