হাড় ভাঙার আওয়াজ!
দাঁতের চাপে হাড় ভাঙার ক্ষমতা রাখে ওই অঞ্চলে একটি মাত্র জানোয়ার
তাইগর!
দারুণ আতঙ্কে সাশার শরীরের রক্ত হিম হয়ে এল। প্রথমে সে ভেবেছিল তাইগরের শিকার হয়েছে অ্যাপারিসিও, কিন্তু একটু দূরে আর একটি গাছের ডালে ঝোলানো হ্যামকের মধ্যে অ্যাপারিসিওর উপবিষ্ট দেহ অন্ধকারের মধ্যেও অস্পষ্টভাবে সাশার দৃষ্টিগোচর হল। সে বুঝতে পারল গাছের ডালে ঝোলানো হরিণের মৃতদেহটাকে মাটিতে টেনে নামিয়ে সেটাকে ভক্ষণ করছে একটি তাইগর। হরিণের হাড়গুলো কড়মড় শব্দে ভেঙে গুঁড়িয়ে যাচ্ছে তাইগরের শক্তিশালী দুই দাঁতালো চোয়ালের চাপে…
হাড় ভাঙার আওয়াজ থামল একটু পরে। তারপর শোনা গেল ঘাসের উপর দিয়ে কোনো গুরুভার বস্তু টেনে নিয়ে যাওয়ার শব্দ এবং কিছুক্ষণ পরে সেই শব্দও গেল মিলিয়ে। সাশা বুঝল মৃত হরিণের দেহটাকে বনের মধ্যে নিয়ে গেল তাইগর অবশিষ্ট মাংস পরবর্তীকালে কাজে লাগবে বলে।
কিছুক্ষণ চুপচাপ, তারপর অ্যাপারিসিওর মৃদু কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সাশা, সিনর–জেগে আছ?
মাথার কাছে গাছের ডালে চামড়ার ফিতায় আটকানো খাপ থেকে পিস্তলটা হস্তগত করে নেমে এল সাশা। অ্যাপারিসিও তার ফ্ল্যাশলাইট জ্বালল–যেখানে হরিণটা ঝুলছিল, সেখানে এখন কিছুই নেই। দুজনে সারারাত্রি জেগে কাটিয়ে দিল–বলা তো যায় না, আরও একটি ক্ষুধার্ত তাইগরের আবির্ভাব যদি ঘটে এবং মৃগমাংসের অভাবে নরমাংস দিয়েই যদি উক্ত শ্বাপদ উদরের ক্ষুধাকে তৃপ্ত করতে চায়, তাহলে নিদ্রিত মানুষের পক্ষে তাকে বাধা দেওয়া অসম্ভব নিদ্রা যেখানে চিরনিদ্রায় পরিণত হতে পারে, সেখানে রাত্রি জাগরণের কষ্ট নিতান্তই তুচ্ছ…
সকালের আলোতে মধ্যরাতের অতিথির পদচিহ্ন চোখে পড়ল; হরিণটাকে গাছের ডাল থেকে টেনে নামানোর সময়ে তার নখের চিহ্ন গম্ভীর হয়ে মাটিতে বসে গেছে!
সেই রাতের অভিজ্ঞতা দুজনকেই ভীত ও সতর্ক করে দিল। তারা বুঝল নিশ্চিন্তে নিদ্রা গেলে যেকোনো মুহূর্তে সেই নিদ্রা চিরনিদ্রায় পরিণত হতে পারে। পূর্বোক্ত অভিজ্ঞতার পর থেকে রাত্রে তারা পালা করে জেগে থাকত–একজন যখন নিদ্রাসুখ উপভোগ করত, অপর ব্যক্তি তখন জাগ্রত অতন্দ্র প্রহরায়।
একদিন অপরাহ্নে ঘোড়া আর খচ্চর চালিয়ে ঢালু জমি দিয়ে যখন তারা অগ্রসর হচ্ছে, সেইসময় সবুজ জঙ্গলের ভিতর কুণ্ডলী-পাকানো ধোঁয়া তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করল। ওই ধোঁয়া লক্ষ করে এগিয়ে গিয়ে একটা লোকালয়ের সন্ধান পেল তারা। জনৈক স্থানীয় অধিবাসীকে প্রশ্ন করে তারা জানল এই বিস্তীর্ণ অঞ্চলটি গোচারণের জন্য সংরক্ষিত; মালিকের নাম ডম জুয়ায়ো কাজাংগো। একটা সাদা বাড়ির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে স্থানীয় লোকটি জানিয়ে দিল ওই বাড়িতেই বাস করেন মালিক মহাশয়।
নির্দিষ্ট সাদা বাড়িতে গিয়ে দুজনেই মালিকের সঙ্গে পরিচিত হল। ডম জুয়ায়ো বয়স্ক ব্যক্তি, তার চুলগুলো সব সাদা হয়ে গেছে, কিন্তু সে এখনও যুবকের মতো শক্তসমর্থ। নিজেদের পরিচয় দিয়ে সাশা জানাল সে একজন ভ্রাম্যমাণ মিস্ত্রি, সঙ্গী অ্যাপারিসিও তার সহকারী। বন্দুক, পিস্তল থেকে শুরু করে প্রায় সব ধরনের যন্ত্রপাতি তারা মেরামত করতে পারে সিনর জুয়ায়ো কাজ দিলেই তাদের দক্ষতা সম্পর্কে নিঃসন্দেহ হতে পারবেন।
সিনর জুয়ায়োর বাড়িতে অচল হয়ে পড়ে ছিল ছয়টি সেলাইয়ের কল। ওইগুলো মেরামতের জন্য পারিশ্রমিকের অঙ্ক স্থির করতে গিয়েই সাশা বুঝল লোকটি অতিশয় কৃপণ। জুয়ায়োর পোষা গোরুর সংখ্যা প্রায় পঞ্চাশ হাজার, পার্শ্ববর্তী অরণ্যভূমি থেকে শুরু করে গয়াজ প্রদেশ পর্যন্ত বিপুল পরিমাণ জমি তার অধিকৃত, কিন্তু একটি পয়সা খরচ করতে গেলে তার মাথায় যেন বাজ ভেঙে পড়ে!
সাশার ক্যামেরাটি জুয়ায়োর মনে কৌতূহলের সৃষ্টি করল, সে জানতে চাইল এই হতচ্ছাড়া জায়গা থেকে কোন ধরনের ছবি তুলতে চায় সশা? উত্তরে সাশা জানাল তার সহকারী অ্যাপারিসিওর কাছে সে শুনেছে এই জায়গাটা তাইগারদের প্রিয় বাসস্থান, তাই সে ক্যামেরা এনেছে তাইগরের ফটো তোলার জন্য।
আমার অনেকগুলো গোয়ালের মধ্যে একটি গোয়ালে এখন একটা তাইগর আছে, ডম জুয়ায়ো বলল, তুমি ইচ্ছা করলে তার ফটো নিতে পারো।
গোয়ালের মধ্যে তাইগর! সাশা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, জানোয়ারটা কী জীবিত?
অবশ্যই না। ওটা মরে গেছে। ওর শরীর থেকে দুর্গন্ধ বার হচ্ছে। তবে ফটোতে তো আর গন্ধ পাওয়া যাবে না। ফটো তোলার জন্য আমি তোমার কাছে টাকাপয়সা চাইব না।
সাশা জানাল মালিক মহাশয়ের উদারতায় সে অভিভূত, কিন্তু সেই উদারতার সুযোগ নেওয়া তার পক্ষে সম্ভব নয়–কারণ, মৃত নয়, জীবন্ত তাইগরের ফটো তুলতেই সে উৎসুক।
উত্তরে জুয়ায়ো জানাল জীবন্ত তাইগরের ফটো তোলার জন্য যে-ব্যক্তি নিজের প্রাণ বিপন্ন করে, সে নিরেট মুখ।
সাশা অবশ্য গোয়ালে অবস্থিত মৃত তাইগরের ফটো তুলে নিজেকে বুদ্ধিমান প্রমাণ করতে সচেষ্ট হল না। অতএব প্রসঙ্গটা ওখানেই চাপা পড়ে গেল।
কয়েকদিন পরের কথা–সাশা পূর্বোক্ত সেলাই-এর কলগুলোকে মেরামত করার চেষ্টা করছে, এমন সময় হন্তদন্ত হয়ে সেখানে উপস্থিত হল ডম জুয়ায়ো।
আমার দুই ছেলে কাল পশ্চিম দিকে শিকার করতে যাবে,জুয়ায়ো বলল, একটা তাইগর ভীষণ উৎপাত করছে। আমার অনেকগুলো গোরু জন্তুটার কবলে মারা পড়েছে। সেটাকে মারার জন্যই যাবে আমার দুই ছেলে। ইচ্ছে করলে তুমিও যেতে পারো ওদের সঙ্গে। হয়তো জ্যান্ত তাইগরের ছবি তোলার সুযোগ পাবে তুমি।
