বয়স্ক মানুষটি জানাল থাকার ব্যবস্থা করতে তার অসুবিধা হবে না। তারপর সে বলল, প্রথমেই একটা গুরুতর ব্যাপারে আমি তোমাদের সাহায্য চাইব। আমার বাড়িতে একজন অতিথি আছে। তার দুই পায়ে ঘা হয়ে এমন অবস্থা হয়েছে যে, লোকটা আর হাঁটাচলা করতে পারছে না।
আর্নস্ট গেল তাদের বহনকার্যে নিযুক্ত পশুগুলোর পরিচর্যা করতে নদীর ধারে, আর সাশা গেল ইউসেবিও নামে বয়স্ক মানুষটির সঙ্গে তার অতিথিকে দেখতে।
একটি কুঁড়েঘরের ভিতর শায়িত অবস্থায় লোকটিকে দেখতে পেল সাশা। লোকটি ব্রেজিলের অধিবাসী, কাজের সন্ধানে ঘুরে বেড়ায়। সাময়িকভাবে কোনো কার্যে নিযুক্ত হলে সেই কাজ সম্পন্ন করে এবং পরবর্তী কাজের সন্ধান করতে থাকে। বর্তমানে এই অঞ্চলে এসে বিপদে পড়েছে পোকার কামড়ে তার দুই পা ক্ষতবিক্ষত হয়ে এমনভাবে বিষিয়ে উঠেছে যে, তার এখন চলাফেরা করার ক্ষমতা নেই। লোকটির নাম অ্যাপারিসিও। সে জানাল যদি তার পা দুটোকে যথাযথ চিকিৎসা করে তাকে কেউ সম্পূর্ণ সুস্থ করে দিতে পারে, তবে উক্ত চিকিৎসককে উপযুক্ত পারিশ্রমিক দিয়ে সন্তুষ্ট করতে সে প্রস্তুত।
গ্যারাপাটা নামক পোড়ার কামড় খুব মারাত্মক। পূর্বোক্ত পোকার কামড়েই অ্যাপারিসিওর পা দুটির অবস্থা হয়েছে অতিশয় শোচনীয়। পচনক্রিয়া প্রায় শুরু হয়ে গেছে। অক্লান্ত সেবা আর উপযুক্ত ঔষধ প্রয়োগ করে তিন সপ্তাহের মধ্যেই লোকটিকে সম্পূর্ণ সুস্থ করে তুলল সাশা। কথাবার্তার মধ্য দিয়ে ওই সময়ের ভিতর লোকটির সঙ্গে সাশার বন্ধুত্ব গড়ে উঠল। কথায় কথায় সাশা জানাতে পারল সাও লরেংকো নামে জায়গাটার কাছাকাছি একজন তাইগরেরো থাকে বলে শুনেছে অ্যাপারিসিও। তবে কথাটা কতটা সত্যি তা বলতে পারল না সে। বনাঞ্চলে সত্যমিথ্যা জড়িয়ে নানা ধরনের রটনা শোনা যায় স্থানীয় অধিবাসীদের মুখে। অ্যাপারিসিও জানাল। লরেংকোর কাছে অবস্থিত তাইগরেরা সম্পর্কে খোঁজ নিলে হয়তো দেখা যাবে বাস্তবে ওইরকম। কোনো শিকারির অস্তিত্ব নেই–সমস্তটাই বাজে গুজব। কিন্তু সাশা মনে মনে স্থির করল সত্যমিথ্যা সে যাচাই করবে নিজের চোখে; সেই কাজটা করতে হলে অ্যাপারিসিওকে নিয়ে তাকে যাত্রা করতে হবে নির্দিষ্ট স্থান অভিমুখে।
সাশা জানত তার দাদা কিছুতেই জঙ্গলের মধ্যে তাদের পথচলার সঙ্গী হতে চাইবে না। তাই সে আর্নস্টকে বলল তুমি এখন কোক্সিম শহরে থাকো। আমি আর অ্যাপারিসিও যাব উত্তর দিকে। তারপর পছন্দমতো একটা শহরে আবার আমরা মিলিত হব।
আর্নস্ট খুবই বিরক্ত হল, আমি জানি তুমি সেই বুড়ো ইন্ডিয়ান শিকারির খোঁজ করতে চলেছ। বেশ, যাও আমি জঙ্গলের মধ্যে ঘোরাঘুরি করতে রাজি নই। আমি চাই মানুষের সাহচর্য–শহর কিংবা গ্রাম, যেখানে মানুষের বসতি আছে, আমি সেখানে থাকতে চাই।
তখন স্থির হল এখন আর্নস্ট থাকবে কোক্সিম শহরে, তারপর ভাইয়ের কাছে খবর পেলে অন্য কোথাও খুব সম্ভব কুয়ারাশহরে অপেক্ষা করবে সাশার সঙ্গে আবার মিলিত হওয়ার জন্য। ইতিমধ্যে সাশা আর অ্যাপারিসিও অগ্রসর হবে বনজঙ্গল ভেদ করে সাও লরেংকো নামে জায়গাটার দিকে।
যাত্রা শুরু করার আগে বড়ো ভাই আর্নস্টের আপত্তি সত্ত্বেও তাদের পাসো ফানডো শহর ত্যাগ করার আসল কারণ, অর্থাৎ ফাভেল-ঘটিত দুর্ঘটনার বিবরণ সাশা খুলে বলল অ্যাপারিসিওর কাছে। সব শুনে অ্যাপারিসিও বলল, আমরা যেখানে যাচ্ছি, সেই মাত্তো গ্রসোতে এসব ব্যাপার নিয়ে কেউ মাথা ঘামায় না। পাসো ফানডোর পুলিশ তাদের এলাকার মধ্যে বিভিন্ন ধরনের অপরাধীদের নিয়ে এতই বিব্রত যে, অন্য এলাকায় গিয়ে আসামিকে পাকড়াও করার সময় বা ইচ্ছা কোনোটাই তাদের নেই। অতএব ফাভেলের ব্যাপারে তোমরা নিশ্চিন্ত থাকতে পারো।
পরের দিন তিনজন যাত্রা করল উত্তর দিকে অবস্থিত কোক্সিম শহরের দিকে।
.
সপ্তম পরিচ্ছেদ
আর্নস্ট রইল কোক্সিম শহরে। সাশা ও অ্যাপারিসিও উত্তর-পশ্চিম দিকে দুর্গম বনজঙ্গল আর জলাভূমি পেরিয়ে অগ্রসর হল সাও লরেংকো নামে জায়গাটার দিকে। সাশা শুনেছিল এইসব অঞ্চল তাইগরের প্রিয় বাসস্থান। সতর্ক হয়ে যাতায়াত না-করলে হিংস্র শ্বাপদের আক্রমণে যেকোনো সময়ে পথিকের মৃত্যু ঘটতে পারে।
একদিন সন্ধ্যায় একটা আধ-শুকনো জলাশয়ের ধারে অভিযাত্রীদের তাবু পড়ল। অ্যাপারিসিও একটা হরিণকে গুলি চালিয়ে মেরেছিল। মৃতদেহটাকে তাঁবুর কাছেই জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডের কাছাকাছি একটা গাছের ডালে ঝুলিয়ে রাখা হল–উদ্দেশ্য ছিল, পরের দিন ওই মাংস দিয়েই উদরের ক্ষুধাকে তৃপ্ত করা হবে।
গাছের ডালে দোলনার মতো হ্যামক টাঙিয়ে তার মধ্যে শুয়ে পড়ল সাশা আর অ্যাপারিসিও। গভীর রাত্রে হঠাৎ সাশার ঘুম ভেঙে গেল। অগ্নিকুণ্ডের আগুন প্রায় নিবে এসেছে, অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে জ্বলছে একটা গোলাপি আভা। মাথার উপর রাতের আকাশে জ্বলছে অসংখ্য তারা, নীচে অরণ্যের বুকে রাজত্ব করছে ঘনীভূত অন্ধকার।
হঠাৎ ঘুম ভাঙার কী কারণ থাকতে পারে ভাবছিল সাশা নিশ্চয়ই কোনো শব্দ তন্দ্রার আচ্ছন্নতা ভেদ করে তাকে চেতনার জগতে ফিরিয়ে এনেছে।
সাশা যখন ঘুম ভাঙার কারণটা নির্ণয় করার চেষ্টা করছে, সেইসময় একটা অত্যন্ত স্পষ্ট ও ভয়ংকর শব্দ তার কর্ণকুহরে প্রবেশ করল–
