প্রায় সঙ্গেসঙ্গে দরজাটা খুলে গেল, ভিতরে প্রবেশ করল হের স্মিথ। ফাভেলকে দেখে সে প্রশ্ন করল, তুমি এত রাত্রে কীজন্য এখানে এসেছ?
তীব্রস্বরে উত্তর দিল ফাভেল–সাশাকে শোনানোর জন্যই সে চেঁচিয়ে উঠেছিল, আমার যন্ত্রপাতিগুলো যথাস্থানে আছে কি না দেখতে এসেছি।
সাশা তার হাতের দিকে তাকাল। যে-ফাইলটা নিয়ে সে কাজ করছিল, সাধারণত সেইটা দিয়েই ফাভেল কাজ করে। তবে কারখানার যন্ত্রপাতিগুলোর মালিক হচ্ছে হের স্মিথ। সে ছাড়া
অপর কেউ কোনো যন্ত্রের মালিকানা দাবি করতে পারে না। . সাশা তার জায়গা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সঙ্গেসঙ্গে একটা ভারী লোহার যন্ত্র তুলে নিল ফাভেল। তাকে সম্পূর্ণ অগ্রাহ্য করে সাশা র্যাক থেকে তার টুপি আর কোট তুলে নিল এবং হের স্টিথকে উদ্দেশ করে বলল, বিদায় সিনর! আমার কাজ শেষ করে গেলাম। পারিশ্রমিক আমি আগেই পেয়ে গেছি। সুতরাং আমাদের মধ্যে দেনাপাওনার ব্যাপারটাও মিটে গেল।
সাশা বেরিয়ে গেল, কিন্তু জায়গাটা ছেড়ে চলে গেল না। কারখানা থেকে একটু দূরে একটা গাছের ছায়ায় অন্ধকারের মধ্যে আত্মগোপন করে সে ফাভেলের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। যাই হোক, কারখানার মধ্যে হের স্মিথকে সাক্ষী রেখে সে কিছু করতে ইচ্ছুক ছিল না। আজকের অপমান সহ্য করা যায় না–ফাভেলকে সমুচিত শিক্ষা দেওয়ার জন্য অন্ধকারে গা-ঢাকা দিয়ে শিকার-সন্ধানী শ্বাপদের মতো অপেক্ষা করতে লাগল সাশা।
একটু পরে হের স্মিথের অস্পষ্ট কণ্ঠস্বর শুনতে পেল সে। ফাভেলকে গুড নাইট জানিয়ে বিদায় নিচ্ছে মালিক। তারপরেই হঠাৎ নিবে গেল কারখানার আলো। দরজা বন্ধ করে ফাভেল বাইরে এসে দাঁড়াল। এইবার এগিয়ে এল সাশা, ডাকল, ফাভেল!
কণ্ঠস্বর লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াল ফাভেল, পরক্ষণেই চিৎকার করে উঠল, ডাকাত! ডাকাত!
সাশা ছুটে এল ফাভেলের দিকে। গোলমাল শুনে যেকোনো সময়ে অকুস্থলে চলে আসতে পারে হের স্মিথ। না, এখন এখানে মালিকের উপস্থিতি চায় না সাশা। ইতিমধ্যে একটা পিস্তল বার করে ফেলেছে ফাভেল, কিন্তু অস্ত্রটা ব্যবহার করার সুযোগ পেল না সে মুহূর্তের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেটাকে ছিনিয়ে নিল সাশা। ফাভেল একহাতে সাশার মুখে নখ দিয়ে আঁচড় কাটছিল আর অন্য হাত দিয়ে চেষ্টা করছিল পিস্তলটা আবার হস্তগত করতে তার মুখ থেকে বেরিয়ে আসছিল একটা দুর্বোধ্য জান্তব ধ্বনি!
কারখানার পার্শ্ববর্তী যে-বাড়িটায় হের স্মিথ বাস করে, সেখান থেকে হঠাৎ ভেসে এল তার গলার আওয়াজ, ফাভেল! কী হয়েছে? কীসের গোলমাল শুনছি ওখানে?
এখনই এখানে হের স্মিথ ছুটে আসবে–লড়াই চটপট শেষ করার জন্য অস্থির হয়ে উঠল সাশা, পিস্তলের বাঁট দিয়ে সজোরে হাতুড়ির মতো আঘাত হানল ফাভেলের মাথায়। একটা ভোঁতা ধাতব শব্দ এবং ফাভেল হল ধরাশয্যায় লম্বমান। সাশা ঝুঁকে দেখল ফাভেলের মুখ চাঁদের আলোতে ফ্যাকাশে সাদা মনে হচ্ছে, রক্তহীন সেই বিবর্ণ মুখে প্রাণের চিহ্নমাত্র নেই।
সাশা সোজা হয়ে দাঁড়াল। এবার পালাতে হবে। সে ফাভেলকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল, খুন করতে চায়নি। তবে খুন যখন হয়েই গেছে, তখন পালানো ছাড়া উপায় নেই। কিন্তু সে স্থানত্যাগ করার আগেই নিকটবর্তী ঝোপ থেকে একটা মূর্তি উঠে দাঁড়াল–তার মাথার উপর সাদা টুপিটা দেখেই মানুষটাকে চিনতে পারল সাশা। ডম কার্লোস!
শেষ পর্যন্ত এই কাণ্ডটা ঘটালে? কার্লোস বলল, তুমি আমার কথামতো শহর ছেড়ে চলে গেলে না কেন? তাহলে এই ব্যাপারটা ঘটত না।
ধরাশায়ী ফাভেলের দিকে সে তাকাল, একবার পা দিয়ে নিস্পন্দ দেহটাকে স্পর্শ করল।
লোকটা আমায় চোর বলেছিল, সাশা বলল, ওর কাছে কৈফিয়ত না-নিয়ে আমি চলে যেতে পারি না।
চোর বলার জন্য আবার কৈফিয়ত কীসের? কার্লোস বলল, হয় তুমি চুরি করেছ, নয়তো চুরি করনি। এক্ষেত্রে আমি ধরে নিচ্ছি তুমি চুরি করনি।
আলবত আমি চুরি করিনি। সাশা ক্রুদ্ধস্বরে বলল, মুখটাকে আমি সেই কথাটাই বুঝিয়ে দিতে চেয়েছিলাম।
তুমি বেশ ভালোভাবেই সে-কথা বুঝিয়ে দিয়েছ, কার্লোস বলল, এখন আমাকে বুঝতে হবে লোকটা এখনও বেঁচে আছে কি না। তুমি এখন এখান থেকে চটপট সরে পড়ো। হের স্মিথ এখানে এসে পড়বে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে।
বাক্যব্যয় না-করে তৎক্ষণাৎ স্থানত্যাগ করল সাশা। বেদুইনোর পিঠে দীর্ঘ বনপথ অতিক্রম করে সে যখন একটা নদীর ধারে এসে পৌঁছাল, তখন ভোরের আলো দেখা দিয়েছে। নদী পার হয়ে উত্তর দিকের রাস্তা ধরে অগ্রসর হল সাশা। হঠাৎ পিস্তলের আওয়াজ পেয়ে সে চমকে উঠল। শব্দ লক্ষ করে দৃষ্টিনিক্ষেপ করতেই তার চোখে পড়ল নদীর অপর তীরে উচ্চভূমিতে দাঁড়িয়ে আছে ডম কার্লোস। সাশার সঙ্গে দৃষ্টি বিনিময় ঘটতেই মাথা থেকে কার্লোস সাদা টুপিটা খুলে ফেলল এবং পিস্তল তুলে আকাশের দিকে গুলি ছুড়ল।
সাশা বুঝল কার্লোস ইচ্ছা করলে পথের মধ্যেই তাকে ধরে ফেলতে পারত। মনে মনে তাকে ধন্যবাদ জানিয়ে সাশা বেদুইনোকে ছুটিয়ে দিল নির্দিষ্ট লক্ষ্য অভিমুখে।
.
পঞ্চম পরিচ্ছেদ
পাসো ফানডোর চাইতে অনেক ছোটো শহর ক্লিভল্যন্ডিয়া। সেখানে পৌঁছে একটা ক্যান্টিনের ভিতর দাদা আর্নস্টকে খুব সহজেই খুঁজে পেল সাশা। ওই শহরে সব মিলিয়ে প্রায় ছ-শো নরনারী বাস করে। এখানে দুপুর মানেই দিবানিদ্রার সময়। ক্যান্টিনে যখন সাশা প্রবেশ করল, তখন সেখানে বসে ছিল আর্নস্ট একা, দ্বিতীয় কোনো প্রাণী সেখানে উপস্থিত ছিল না।
