মার্সেলো আর বেদুইনোর সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে জয়লাভ করে পাসো ফানডো শহরে খুব জনপ্রিয় হয়ে উঠল সাশা। বিশেষ করে রুপার কারখানার সহকর্মী শ্রমিকরা সাশার কৃতিত্বে খুবই খুশি হয়েছিল। তবে ফাভেল যে সাশা সম্পর্কে তীব্র বিদ্বেষ পোষণ করে, তার আভাস পাওয়া যাচ্ছিল প্রায়ই। অবশ্য সোজাসুজি সাশার সঙ্গে সে অভদ্র ব্যবহার করেনি একবারও।
কারখানার পিছনে একটা ঘরে শ্রমিকদের খেতে দেওয়া হত; ওই ঘরে একদিন মধ্যাহ্ন ভোজনের সময়ে ভুল করে বসে পড়েছিল সাশা। ফাভেল সাশার ঠিক পিছনেই ছিল, সে হঠাৎ বলে উঠল, সরে যাও, কুত্তার বাচ্চা! এটা আমার জায়গা।
মুহূর্তের মধ্যে ঘর হয়ে গেল স্তব্ধ। সকলেই ভাবছিল এই বুঝি শুরু হয় মারামারি। কিন্তু না সাশা ভুল স্বীকার করে তার নিজের জায়গায় সরে গেল। একবার তার দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে সাশা বুঝল, আর্নস্ট রাগে আগুন হয়ে গেছে, ভাইয়ের আচরণ সে পছন্দ করেনি যেকোনো সময়ে ফাভেলের উপর ঝাঁপিয়ে পড়তে পারে আর্নস্ট।
যাই হোক, সেদিন আর কিছু ঘটল না। সেই ঘটনার পরেই ডম কার্লোসের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিল সাশা। সাক্ষাৎকার হওয়ার পরে তাদের মধ্যে যে আলোচনা হয়েছিল এবং যে-আলোচনার ফলে জোকুইম গুয়াতে তাইগরেরো সম্পর্কে জানতে চেয়েছিল সাশা সিমেল–সেইসব কথা সবিস্তারে প্রথম পরিচ্ছদেই বলা হয়েছে, পুনরাবৃত্তি অনাবশ্যক।
ফাভেলের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে চেয়েছিল আর্নস্ট। ছোটোভাই সাশার গা বাঁচিয়ে সরে যাওয়ার ব্যাপারটা তার মোটেই পছন্দ হয়নি। সে নিজেই ফাভেলকে শিক্ষা দিতে চেয়েছিল। সাশার অনুরোধে নিতান্ত অনিচ্ছার সঙ্গে সে স্থানত্যাগ করে চলে যেতে রাজি হল। ডম কার্লোসও দুই ভাইকে স্থানত্যাগ করার পরামর্শ দিয়েছিল, কারণ পাসো ফানডো শহরে থাকলে ফাভেলের সঙ্গে সিমেল-ভাইদের খুনোখুনি ঘটতে পারে যেকোনো মুহূর্তে। দু-দিন পরে রাত থাকতেই দুই ভাই শয্যাত্যাগ করল। পরিকল্পনা অনুসারে আর্নস্ট একটি ঘোড়া আর দুটি খচ্চর নিয়ে মালপত্র সমেত উত্তর দিকে রওনা দেবে এবং তিনদিনের পথ পার হয়ে রিও উরুগুয়ে ছাড়িয়ে ভাইয়ের জন্য ক্লিভল্যন্ডিয়া নামক স্থানে অপেক্ষা করবে। হের স্মিথের রুপার কারখানার অবশিষ্ট কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করে সাশা তার বেদুইনো নামে খচ্চরটার পিঠে চড়ে যাত্রা করবে এবং দাদার সঙ্গে মিলিত হবে পূর্বনির্দিষ্ট স্থানে।
আর্নস্টকে বিদায় দিয়ে হের স্মিথের কারখানার দিকে চলল সাশা বেদুইনোর পিঠে চড়ে। পথের মধ্যে ডম কার্লোসের সঙ্গে দেখা হল সাশার। একটা প্রকাণ্ড সাদা টুপি মাথায় চড়িয়ে খচ্চরের পিঠে বসেছিল ডম কার্লোস। সাশাকে দেখে হাসিমুখে টুপি খুলে অভিবাদন জানাল কার্লোস, সুপ্রভাত, সিনর সাশা। আজ সকালেই আমার কুকুর লোবো খুব চিৎকার করছিল। খুব শীঘ্রই আমি আর লোবো কোনো অপরাধীর পিছনে তাড়া করব এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই। লোবোর চিৎকার হচ্ছে সেই অভিযানের পূর্বসংকেত।
.
চতুর্থ পরিচ্ছেদ
কারখানার কাজ শুরু হওয়ার সঙ্গেসঙ্গে সাশা মালিককে জানিয়ে দিল আর্নস্ট কাজ ছেড়ে চলে গেছে। অসমাপ্ত কাজ যথাসম্ভব তাড়াতাড়ি শেষ করে সাশা নিজেও কারখানা ছেড়ে চলে যাবে অন্যত্র। দু-দুজন দক্ষ কারিগর তার কারখানা ছেড়ে চলে যাচ্ছে বলে মালিক দুঃখপ্রকাশ করল। ফাভেল কিছু বলল না। কিন্তু তার মুখের দিকে তাকিয়ে সাশা বুঝল লোকটা খুব উত্তেজিত হয়ে উঠেছে। হের স্মিথ তার বিদায়ভাষণ জানানোর পর সাশা হঠাৎ এগিয়ে এসে ফাভেলের দিকে হাত বাড়িয়ে দিল, আমি চিরদিনের মতো বিদায় গ্রহণ করছি, আর কখনো এখানে ফিরে আসব না। আমার উপর কারো রাগ বা বিদ্বেষ থাকলে আমি দুঃখিত হব। সিনর ফাভেল, তুমি কি আমার সঙ্গে করমর্দন করবে না?
অত্যন্ত বিনয়ের সঙ্গে নত হয়ে অভিবাদন করল ফাভেল, তারপর সাশার প্রসারিত হাত চেপে ধরল, নিশ্চয়ই সিনর। আমি সানন্দে তোমার হাতে হাত মেলাচ্ছি। তোমার মতো গুণী মানুষের বিচ্ছেদ সমগ্র কারিগর-সম্প্রদায়ের পক্ষেই দুঃখজনক।
হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে মালিক হের স্মিথকে উদ্দেশ করে সে বলে উঠল, আমার যন্ত্রপাতিগুলো আমি একবার পরীক্ষা করব, আশা করি কেউ কিছু মনে করবে না।
ইঙ্গিতটা অত্যন্ত অপমানকর। সাশার মনে হল কেউ যেন তাকে সজোরে থাপ্পড় মারল।
হের স্মিথ উত্তেজিত কণ্ঠে বলে উঠল, তুমি ও-কথা বললে কেন? তোমার খুব অন্যায় হয়েছে ফাভেল।
ফাভেল বলল, ও আমার যন্ত্র নিয়ে কাজ করছিল। ও চলে যাওয়ার আগে আমার জিনিসগুলো ঠিক আছে কি না, সেটা আমি দেখে নিতে চাই।
সাশা ফাভেলের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিল। সে বুঝতে পারছিল ফাভেলের দিকে তাকিয়ে থাকলে সে আর রাগ সামলাতে পারবে না। তার মনের যে অবস্থা, তাতে একবার লড়াই শুরু হলে ফাভেলকে খুন না-করে সে থামতে পারবে না। মুখ নামিয়ে সে একমনে কাজ করতে লাগল…
সারাদিন কাজ করেও হাতের কাজ শেষ করতে পারেনি সাশা, তাই রাতেও সে কাজ করছিল। একটা রুপোর তৈরি রেকাব প্রায় শেষ করে এনেছিল সাশা, এইবার শুধু কয়েকটা সূক্ষ্ম কাজ হয়ে গেলেই তার ছুটি। কারখানায় কেউ ছিল না, সাশা একাই কাজ করছিল। হঠাৎ একটা শব্দ শুনে সাশা ঘুরে দাঁড়াল এবং দেখল তার পিছনেই এসে দাঁড়িয়েছে ফাভেল।
