পূর্বোক্ত ঘটনার পর কয়েকটা মাস অতিবাহিত হল। মার্সেলোকে কুস্তিতে হারিয়ে বেশ মোটা টাকা, পেয়েছিল সাশা আর আর্নস্ট। কিন্তু তারপর যা ঘটল, তার ফলে দুই ভাইয়ের সঙ্গে ফাভেলের বিবাদ আরও জটিল এবং আরও মারাত্মক পরিণতির দিকে এগিয়ে চলল।
ডম কার্লোস একদিন এসে সিমেল ভাইদের জানাল পাসো ফানডো শহরে লিওন বেদুইনোনামে এক দুর্ধর্ষ তুর্কি মল্লযোদ্ধা উপস্থিত হয়েছে। লোকটি সাও পাওলো শহরে যাওয়ার পথে পাসো ফানডোতে কয়েকটা দিন কাটিয়ে যাবে–উদ্দেশ্য, এই শহরে কুস্তি লড়ে কিছু অর্থ উপার্জন।
খবরদার,ডম কার্লোস সাশাকে বলল, তুমি বেদুইনোর সঙ্গে কুস্তি লড়তে যেয়ো না। ওই লোকটা মাংসপেশির চর্চা করে নিজেকে বলিষ্ঠ বলে প্রচার করে না। কিন্তু ওই তুর্কি মল্লযোদ্ধা ভীষণ শক্তিমান দক্ষিণ অঞ্চলে এক ইংরেজ কুস্তিগিরের সে ঘাড় ভেঙে দিয়েছে। হয়তো মানুষ খুনের অভিযোগে লোকটাকে আমি গ্রেপ্তার করতে পারি। তুমি বেদুইনোর সঙ্গে শক্তিপরীক্ষা করতে গেলে তোমার জীবন বিপন্ন হবে। আমি তোমায় সতর্ক করে দিচ্ছি।
শহর-চত্বরে যেখানে মার্সেলোর সঙ্গে লড়াই করেছিল সাশা, সেইখানেই এক রবিবার সন্ধ্যায় জনসমক্ষে আত্মপ্রকাশ করল তুরস্ক-দেশীয় মল্লযোদ্ধা–লিওন বেদুইনো। লোকটার দিকে ভালো করে তাকিয়ে দেখল সাশা যেমন লম্বা, তেমনি চওড়া, বৃষস্কন্ধ, কবাটবক্ষ; শালগাছের গুঁড়ির মতো পেশিস্ফীত দুই বাহুর অধিকারী বেদুইনোকে দেখলেই বোঝা যায় মানুষটা অমিতশক্তিধর। সাশার পূর্বর্তন প্রতিদ্বন্দ্বী মার্সেলো এই মল্লবীরের তুলনায় নিতান্তই তুচ্ছ। দেহের তুলনায় বেদুইনোর মাথাটি খুবই ছোটো, নাকের তলায় বিশাল গোঁফ দুই প্রান্তে সরু হয়ে উঠে গেছে গালের দুই ধারে এবং তার স্থল ওষ্ঠাধরে যে নীরব হাসির রেখা খেলা করছে, তাতে সরল কৌতুকের পরিবর্তে ফুটে উঠেছে নিষ্ঠুর হিংসার আভাস। প্রথম দর্শনেই লোকটিকে অপছন্দ করল সাশা সিমেল।
মঞ্চের ওপর দাঁড়িয়ে বেদুইনো চ্যালেঞ্জ জানাল–জনতার মধ্যে যদি কোনো সাহসী মল্লযোদ্ধা থাকে, তাহলে সে তার সঙ্গে কুস্তি লড়তে রাজি।
এইবার তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে বেদুইনোর সর্বাঙ্গ জরিপ করল সাশা। লোকটার কাধ ও পৃষ্ঠদেশ বিশাল মাংসপেশিতে সমৃদ্ধ। সাশা জানত কাধ আর পিঠের বৃহৎ মাংসপেশি মল্লযুদ্ধ বা কুস্তির পক্ষে অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। কিন্তু ওই ধরনের পেশি বক্সিং মুষ্টিযুদ্ধের পক্ষে অসুবিধাজনক। কারণ, কঁধ ও পিঠের স্থূল মাংসপেশি প্রচণ্ড শক্তির আধার হলেও দ্রুত আঘাত হানতে অপারগ–অতএব যে মাংসপেশির বিস্তার কুস্তির পক্ষে অত্যাবশ্যক, সেই পেশিশক্তি বিদ্যুত্বৎ ক্ষিপ্ত বক্সার বা মুষ্টিযোদ্ধার বিরুদ্ধে একেবারেই অকেজো। সাশা বুঝে নিল কুস্তিতে বেদুইনোকে পরাস্ত করতে না-পারলেও মুষ্টিযুদ্ধে তাকে সে নির্ঘাত হারাতে পারবে।
মঞ্চের পাশে দাঁড়িয়ে মল্লবীরকে উদ্দেশ করে সাশা বলল, বেদুইনো, আমার একটি শর্ত যদি মেনে নাও, তাহলেই আমি কাল রাতে তোমার সঙ্গে কুস্তি লড়তে রাজি আছি।
ভ্রূ কুঁচকে বেদুইনো সন্দিগ্ধকণ্ঠে বলল, শর্তটা কী?
কাল রাতে আমি তোমার সঙ্গে কুস্তি লড়ব। কিন্তু তার পরের রাতে আমার সঙ্গে তোমার দশ রাউন্ড বক্সিং লড়তে হবে। রাজি?
কয়েকটি মুহূর্ত চিন্তা করল বেদুইননা, তারপর ঘাড় নেড়ে বলল, আমি রাজি আছি।
সাশার হঠকারিতায় খুব অসন্তুষ্ট হল ডম কার্লোস, কুস্তির দুই রাউন্ড যদি কোনোরকমে আত্মরক্ষা করতে পারো, তাহলে তুমি বেঁচে যাবে সাশা। তবে বেদুইনোকে তুমি কিছুতেই হারাতে পারবে না।
সাশা বলল, কথাটা ঠিক। ওই দু-রাউন্ড আমি কোনোরকমে নিজেকে বাঁচিয়ে রাখব। তবে ঘুসির লড়াইতে লোকটাকে আমার কাছে হার মানতে হবে এ-বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই।
মার্সেলোর সঙ্গে লড়াইতে যে নাট্যশালাটিকে নির্বাচন করা হয়েছিল, এবার বেদুইনোর সঙ্গে কুস্তির জন্য সেই জায়গাটাই নির্বাচিত হল।
এক বিশাল জনতার সমাবেশ ঘটেছিল কুস্তি দেখার জন্য। ডম কার্লোস স্বয়ং উপস্থিত ছিল অকুস্থলে, তার সঙ্গে ছিল ছয়জন শান্তিরক্ষক পুলিশ। সাশাকে কার্লোস জানাল সমাগত জনতার মধ্যে বহু লোক এসেছে পিস্তল বা রিভলভার নিয়ে।
সাশা সবিস্ময়ে প্রশ্ন করল, কেন?
কার্লোস বলল, পিস্তলধারীদের মধ্যে অধিকাংশই হচ্ছে ফাভেলের বন্ধুবান্ধব। তবে আমি তোমার বন্ধুদেরও সতর্ক করে দিয়েছি তারাও পিস্তল নিয়ে এসেছে। ফাভেল যদি গুলি চালায়, তাহলে তাকে আমি বাধা দিতে পারব না, কিন্তু ব্যাপারটা যাতে সমানে সমানে হয় সেটা আমি দেখব।
ফাভেলের যে একটি পরিকল্পনা ছিল, সেটা পরে প্রমাণ হল। আর সেই পরিকল্পনা সাশাকে সম্ভাব্য মৃত্যু অথবা গুরুতর জখম হয়ে পঙ্গুত্বের দুর্ভাগ্য থেকে বাঁচিয়ে দিয়েছিল।
লড়াই শুরু হওয়ার কয়েক মিনিটের মধ্যেই সাশা বুঝতে পারল বেদুইনো লোকটা মার্সেলের চাইতে অনেক বেশি শক্তিশালী। কুস্তির কায়দাকানুনও সে ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে। সাশা তার জীবনে কখনো এমন ভয়ংকর কুস্তিগিরের পাল্লায় পড়েনি। সে বুঝতে পারছিল তুর্কি পালোয়ান যদি তাকে একবার দুই হাতের বাঁধনে বন্দি করতে পারে তাহলে তার পরাজয় অবধারিত–এমনকী হাত-পা ভেঙে পঙ্গু হয়ে যাওয়াও নিতান্ত অসম্ভব নয়। আত্মরক্ষার জন্য মাঝে মাঝে সাশা দড়ির উপর ঝাঁপ দিয়ে পড়ছিল। কুস্তির নিয়ম অনুসারে দড়ি ছেড়ে রিং-এর ভিতরে না-আসা পর্যন্ত প্রতিদ্বন্দ্বীকে অপেক্ষা করতে হয় বেদুইনোকেও তাই ওই সময়টুকু আক্রমণ থেকে বিরত থাকতে হচ্ছিল।
