স্থানীয় একটি নাট্যশালায় পূর্বোক্ত প্রতিযোগিতার স্থান নির্ণয় করা হল। আর্নস্ট এবং সাশা ডম কার্লোসের সঙ্গে দেখা করে প্রতিযোগিতার খবর জানিয়েছিল। ডম কার্লোস বলল সে যথাসময়ে যথাস্থানে উপস্থিত থাকবে এবং যতক্ষণ পর্যন্ত সমস্ত টিকিট বিক্রি না হয়, ততক্ষণ সে টিকিটঘরের ভিতর বিক্রেতাদের সঙ্গেই অবস্থান করবে। শুধু তাই নয়–টিকিট বিক্রির সমস্ত টাকা সে নিজের কাছেই রাখবে প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত।
আর্নস্টের দিকে তাকিয়ে ডম কার্লোস বলল, সিনর ফাভেল আর তোমাদের মধ্যে তিক্ততার সৃষ্টি হয়েছে এটা আমি লক্ষ করেছি। যাতে কোনো অশান্তি না হয়, সেইজন্যই আমি প্রতিযোগিতা চলার সময়ে উপস্থিত থাকব।
ফাভেল যেন সতর্ক থাকে, চাপা গলায় গর্জে উঠল আনস্ট, আমি ওই ইঁদুরটার অসভ্যতা অনেকদিন সহ্য করেছি। বেশি বাড়াবাড়ি করলে ওকে এবার উচিত শিক্ষা দেব।
নির্দিষ্ট দিনে মঞ্চের উপর দাঁড়িয়ে সাশা দেখল মঞ্চের কিনারায় বসে আছে ফাভেল। সে একা নয়, তার আশেপাশে রয়েছে একদঙ্গল লোক, স্পষ্টই বোঝা যায় ওরা সবাই ফাভেলের স্যাঙাত সকলের মুখেই জ্বলছে সিগারেট, ধোঁয়ার আড়ালে মানুষগুলোর মুখ হয়ে গেছে অস্পষ্ট। মাঝে মাঝে লোকগুলোকে চাপা গলায় কিছু বলছিল ফাভেল। সাশা একটা ষড়যন্ত্রের আভাস পেল।
প্রথম রাউন্ডে বার বার আক্রমণ করল মার্সেলো। প্রত্যেকবারই তার আক্রমণ এড়িয়ে জমিতে-পেতে-রাখা ক্যানভাসের উপর তাকে ফেলে দিল সাশা। মার্সেলো অবশ্য প্রতিবারই লম্ববান অবস্থা থেকে দণ্ডায়মান হয়েছে এবং খ্যাপা ষাঁড়ের মতন তেড়ে গেছে প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে। হঠাৎ একবার মার্সেলোর কোমর জড়িয়ে ধরে কুস্তির এক প্যাঁচে তাকে জমিতে পেড়ে ফেলল সাশা। মার্সেলো তার শরীরটাকে বাঁকিয়ে ফেলল, ঘাড়ের পেশিগুলোর প্রচণ্ড শক্তি প্রয়োগ করে কঁধ দুটোকে জমির উপর তুলে রাখল কিছুতেই সাশা তাকে চিত করতে পারল না। প্রথম রাউন্ডের লড়াই সমান সমান হল।
দ্বিতীয় রাউন্ডে সাশার শ্বাসকষ্ট শুরু হল–ফাভেল ও তার বন্ধুদের সিগারেট উদগিরণ করছে ধূম্রজাল এবং সেই ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে মঞ্চের উপর উঠে এসে বিব্রত করছে সাশাকে। মাঝে মাঝেই ধোঁয়ার আক্রমণে কেশে উঠছে সাশা।
হঠাৎ লড়াই থামিয়ে মঞ্চের ধারে এসে দাঁড়াল সাশা, নীচে ফাভেলের দিকে তাকিয়ে সে বলে উঠল, তুমি যেভাবে সিগারেট ফুঁকছ, ওভাবে কেউ সিগারেট টানে না। ধোঁয়ার জন্যে আমাদের শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। দর্শকরা এখানে এসেছে কুস্তি দেখতে আশা করি তাদের কথা ভেবে তোমরা আর সিগারেট টানবে না। এভাবে ধোঁয়ার মধ্যে দাঁড়িয়ে কাশতে কাশতে কুস্তি লড়া সম্ভব নয়।
ফাভেল হাতের সিগারেট ফেলে পা দিয়ে মাড়িয়ে আগুন নিবিয়ে দিল। তার বন্ধুরাও তার দৃষ্টান্ত অনুসরণ করল। তারপর কয়েক মিনিটের মধ্যেই শেষ হয়ে গেল লড়াই। কৌশল ও শক্তির যুদ্ধে কৌশলই জয়ী হল। অর্থাৎ সাশার কাছে পরাজিত হল মার্সেলো।
মঞ্চের উপর থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে ফাভেল ও তার বন্ধুদের দেখতে পেল সাশা। ফাভেলের মুখ রক্তহীন বিবর্ণ–সাশা বুঝল ফাভেল মার্সেলোর উপর বাজি ধরেছিল, সেই বাজি সে হেরে গেছে। সাশার শরীর ও মন তখনও উত্তপ্ত, তখনও সে থেকে থেকে কাশছে, ফাভেলকে দেখেই তার মাথায় ক্রোধের আগুন জ্বলে উঠল। দ্রুত পদক্ষেপে এগিয়ে এসে সে ফাভেলের সামনে দাঁড়াল।
সিনর ফাভেল! তুমি যদি আমার মুখে সিগারেটের ধোঁয়া ছড়িয়ে দিতে চাও, সাশা বলল, তাহলে আমি যখন একা থাকব, তখনই ওই কাজটা করো। তুমি আর তোমার বন্ধুরা শুধু আমাকেই বিব্রত করোনি, প্যারাগুয়ে থেকে যে ভদ্রলোক এখানে এসেছেন জনতাকে আনন্দ দিতে তাঁকেও তোমরা যথেষ্ট জ্বালিয়েছ।
ফাভেলের জবাবের জন্য অপেক্ষা না-করে পাশের দরজা দিয়ে মঞ্চের পিছন দিকে চলে গেল সাশা। হঠাৎ কেউ তাকে স্পর্শ করল। ঘুরে দাঁড়িয়ে ডম কার্লোসকে দেখতে পেল সাশা। কার্লোসের পাশে দাদা আর্নস্ট।
এই মুহূর্তে আমার সঙ্গে চলে এসো, কার্লোস বলল, জামাকাপড় ছাড়ার দরকার নেই। সমস্ত টাকাপয়সা আর তোমার পোশাক পরিচ্ছদ আমার কাছেই রয়েছে। বাইরে তোমার জন্য অপেক্ষা করছে একটা ঘোড়ার গাড়ি। চলে এসো চটপট, এখন আর একটা কথাও নয়।
পথে কোনো কথা হল না। ডম কার্লোস শুধু একবার বলেছিল জনতার মধ্যে অসন্তোষ আর ক্ষোভ সে লক্ষ করেছে। আর্নস্টের কুটিরে পৌঁছে তারা যখন ধূমপান করছে, সেইসময় সাশাকে লক্ষ করে কার্লোস বলল, তুমি ফাভেলকে চটিয়ে কাজটা ভালো করনি। তুমি তাকে অপমান করেছ। ফাভেল বাজি হেরে বেশ কিছু টাকা গচ্চা দিয়েছে। তার উপর তোমার কথায় উপস্থিত সকলেই বুঝেছে ফাভেল বাজি হেরেছে। টাকা আর ইজ্জত, দুটোই সে হারিয়েছে। সেইজন্য তোমাকেই সে দায়ী করবে। কিছুতেই সে তোমাকে ক্ষমা করবে না।
সাশা উদ্ধতভাবে জবাব দিল, ফাভেল আমার ক্ষতি করতে পারবে না। সে যদি আমার সঙ্গে লাগতে আসে, তাহলে সে-ই বিপদে পড়বে।
ডম কার্লোস বলল, আমার কথা তুমি বুঝতে পারছ না। আমাদের রীতিনীতি তোমাদের মতো নয়। আমরা প্রতিশোধ গ্রহণের জন্য জীবন বিপন্ন করতে পারি, কিন্তু অপমানিত হয়ে বেঁচে থাকতে চাই না। এইভাবে প্রতি মুহূর্তে ফাভেলকে ছোটো করার চাইতে তাকে খুন করলেও তার প্রতি যথেষ্ট দয়া দেখানো হত।
