জাগুয়ারের চামড়াটা একটানে খুলে ফেলল মার্সেলো, পরক্ষণেই প্রকাণ্ড লাফ মেরে উঠে এল মঞ্চের উপর এবং শুয়ে পড়ল চিত হয়ে।
ম্যানেজারের ইঙ্গিতে বিপুলবপু এক নিগ্রো প্রকাণ্ড এক নেহাই এনে রাখল মার্সেলোর বুকের উপর; তারপর প্রায় এক ইঞ্চি পুরু একটি লোহার ডান্ডা ওই নেহাই-এর উপর রেখে সরে দাঁড়াল।
সিনর! তোমায় দেখে মনে হচ্ছে তুমি বেশ শক্তিমান পুরুষ, বেঁটে ম্যানেজার হঠাৎ ভিড়ের ভিতর দণ্ডায়মান সাশার দিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করল, হাতুড়ি আর ছেনি দিয়ে ওই লোহার ডান্ডাটাকে তুমি ভেঙে ফেলতে পারো?
তৎক্ষণাৎ এক লাফে মঞ্চের উপর উঠে এল সাশা। নীচে যেখানে দাদা দাঁড়িয়ে আছে, সেদিকে তাকাল সে দেখল আর্নস্টের ঠোঁটে কৌতুকের হাসি–অর্থাৎ দাদা তাকে সমর্থন করছে।
বাঃ! সিনর সিমেল, তুমি যোগ্য ব্যক্তিকেই সঙ্গী হিসেবে বেছে নিয়েছ, ভেসে এল বিদ্রূপশানিত কণ্ঠস্বর, একটা ষাঁড়ের বিরুদ্ধে আর একটা ষাঁড়! বাঃ! চমৎকার!
স্বর লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াতেই সাশা কণ্ঠস্বরের মালিককে দেখতে পেল–ফাভেল!
আরও একজন ফাভেলের দিকে ঘুরে দাঁড়িয়েছিল–আর্নস্ট।
এই রে! এই বুঝি দাদা ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাভেলের উপর–সাশা ইশারায় আর্নস্টকে নিষেধ করতে উদ্যত হল। কিন্তু ঠিক সেই সময় ম্যানেজার তার জামার হাত ধরে টানল এবং বুঝিয়ে দিল সাশাকে কী করতে হবে। নেহাই-এর উপর বসানো লোহার ডান্ডার গায়ে ছেনিটাকে ধরে রাখবে বিশালদেহী নিগ্রো ওই ছেনিতে হাতুড়ি মেরে ডান্ডাটাকে ভেঙে দুই খণ্ড করার দুরূহ কর্তব্যটি সম্পন্ন করার দায়িত্ব পড়েছে সাশার উপর।
আমি জোরে আঘাত করে ডান্ডা ভেঙে ফেলতে পারি, সাশা বলল, কিন্তু লোকটা যে তাহলে মারা পড়বে।
মার্সেলোর কিছু হবে না, ক্ষুদ্রকায় ম্যানেজার হাসল, তুমি সমস্ত শক্তি দিয়ে আঘাত করো।
সোজাসুজি আঘাত করবে ঠিক ছেনির উপর, তলা থেকে ভেসে এল ফাভেলের কণ্ঠস্বর, ষাঁড়েরও কিছু দক্ষতা থাকা দরকার। দেখো, যেন আঘাতটা ফসকে না যায়।
সাশা দাদার দিকে তাকাল আর্নস্ট ধৈর্যের শেষ সীমায় পৌঁছে গেছে, এখনই বুঝি সে ঝাঁপিয়ে পড়ে ফাভেলের ঘাড়ে। হাত নেড়ে দাদাকে কিছু করতে নিষেধ করল সাশা, তারপর মঞ্চের একেবারে কিনারায় এসে দাঁড়াল।
সিনর ফাভেল! তুমি বোধ হয় তোমার গায়ের জোর দেখাতে চাও? সাশা ফাভেলকে উদ্দেশ করে বলল, আমি ঠিক এই কাজটা করতে উৎসুক নই। বেশ তো তুমিই উঠে এসো, দেখ এই হাতুড়িটা যদি তুলতে পারো।
ফাভেলের মুখ বিকৃত হয়ে গেল। দারুণ ক্রোধে তার দুই চোখ জ্বলে উঠল আগুনের মতো পরক্ষণেই হাতের সিগারেট মঞ্চের খুঁটিতে ঘষে নিবিয়ে দিয়ে দ্রুত পদক্ষেপে অদৃশ্য হয়ে গেল জনতার মধ্যে।
সাশা এবার হাতুড়িটা তুলে নিল। পরপর তিনবার সজোরে আঘাত হানল সে। দু-টুকরো হয়ে ছিটকে পড়ল লৌহদণ্ড। মার্সেলো এবার একহাতের বগলে নেহাইটাকে চেপে ধরে উঠে দাঁড়াল। দারুণ উল্লাসে চিৎকার করে তাকে অভিনন্দন জানাতে লাগল সমবেত জনতা। মৃদুহাস্যে জনতাকে অভিবাদন জানাল মার্সেলো।
জনতার উৎসাহ এবার মার্সেলো আর সাশার মধ্যেও খেলোয়াড়ি মনোভাব জাগিয়ে তুলল। সাশাকে একটা চেয়ারে বসিয়ে দাঁতে কামড়ে চেয়ার সমেত সাশাকে শূন্যে তুলে ফেলল মার্সেলো। তারপর একটা মোটরগাড়ি ছুটে এসে মার্সেলোর বুকের উপর দিয়ে চলে গেল। পরপর আরও কয়েকটি খেলা দেখিয়ে দর্শকদের বিস্ময়ে স্তব্ধ করে দিল প্যারাগুয়ের বলিষ্ঠ মানুষ! রাত পর্যন্ত নিবিষ্টচিত্তে সব খেলা দেখল সাশা, তারপর ম্যানেজারকে ডেকে বলল, আমরা যদি একটা প্রতিযোগিতার আয়োজন করি, তাহলে বিশাল এক জনতার সমাবেশ ঘটবে।
বেঁটে ম্যানেজার হঠাৎ সন্দিগ্ধ হয়ে উঠল, কীরকম প্রতিযোগিতার কথা বলছ তুমি?
কুস্তি, সাশা বলল, ওই বিদ্যাটা আমার ভালোই জানা আছে।
তুমি কেমন পারিশ্রমিক আশা কর? ম্যানেজার জানতে চাইল, অবশ্য যদি পারিশ্রমিকের অর্থ গ্রহণ করার জন্য তুমি জীবিত থাকো।
সাশা বলল, যে জিতবে, সে সমস্ত টাকা পাবে। পাশে দাঁড়িয়ে ছিল দাদা আর্নস্ট, সে সাশার হাত চেপে ধরল। তুমি নিতান্ত নির্বোধ, আলেক্স, আনস্ট বলে উঠল, লোকটা তোমাকে দু-টুকরো করে ভেঙে ফেলবে।
তাহলে টিকিট বিক্রি যে-টাকা উঠবে, সবটাই সে নিয়ে যাবে, সাশা ম্যানেজারের দিকে তাকাল, তুমি কী বল?
মার্সেলো পাশে এসে হাসিমুখে সাশার কথা শুনছিল। ম্যানেজার কিছু বলার আগেই সে বলে উঠল, আমি খুনি নই।
তুমি যদি আমার প্রস্তাবে রাজি না হও, তাহলে স্বীকার করো তুমি ভয় পেয়েছ, সাশা বলল।
মার্সেলোর মুখের হাসি মুছে গেল, ললাটে ফুটল কুঞ্চনরেখা।
মার্সেলো কাউকে ভয় পায় না, ম্যানেজার বলল, তোমার মৃত্যুর জন্য তুমিই দায়ী হবে।
আর্নস্ট ছেটো ভাই সাশার নিরাপত্তার কথা ভেবে চিন্তিত হয়ে পড়লেও সাশার মনে দুশ্চিন্তা ছিল না একটুও। সাশা জানত মার্সেলো প্রচণ্ড শক্তিশালী পুরুষ, সে যদি চেপে ধরতে পারে, তাহলে সাশার মেরুদণ্ড ভেঙে ফেলবে অনায়াসে কিন্তু ক্ষিপ্র গতি ও কৌশলের সাহায্যে প্রতিদ্বন্দ্বীকে যে পরাস্ত করা যাবে, এ-বিষয়ে সাশা ছিল নিশ্চিত। মার্সেলো অমানুষিক শক্তির অধিকারী হলেও মল্লযুদ্ধ সম্বন্ধে তার যে কোনো অভিজ্ঞতা নেই, সেটাও বুঝতে পেরেছিল সাশা।
