কিন্তু দাদা, সাশা বলল, ওই জার্মানটা আমায় বলছিল তুমি নাকি অসুস্থ সত্যি?
এমন কিছু গুরুতর ব্যাপার নয়, আর্নস্ট বলল, কাঁধে একটা পুরানো ক্ষত আছে।
আর্নস্ট তার শার্ট খুলে ফেলল। সাশা দেখল দাদার কাঁধে একটা শুষ্ক ক্ষতচিহ্ন ছড়িয়ে আছে।
এটা একটা শয়তানের উপহার। তবে আবার একদিন লোকটার সঙ্গে আমার নিশ্চয়ই দেখা হবে। সে আমাকে যা দিয়েছে, সেইদিনই তাকে সুদে-আসলে তা ফিরিয়ে দেব।
সাশা ভাবতে লাগল মাত্তো গ্রসো নামে জায়গাটা ছেড়ে আসার সঙ্গে ওই ক্ষতচিহ্নটার হয়তো কিছু যোগসূত্র আছে–নিতান্ত অকারণে শুধুমাত্র মদ কেনার জন্য রাজার ঐশ্বর্য ফেলে পাসো ফানডো শহরে চলে আসেনি আর্নস্ট।
অনেকদিন পরে দুই ভাই-এর দেখা কথা বলতে বলতেই রাত শেষ হয়ে গেল। নিজের মালপত্র একটা হোটেলে রেখে দাদার সন্ধানে পথে বেরিয়েছিল সাশা। এবার জিনিসগুলো নিয়ে সে দাদার কুঁড়েঘরে এসে ঢুকল। স্থির হল দুই ভাই এখন এখানেই থাকবে। হের আলবার্ট স্মিথ নামে যে জার্মান রৌপ্য-ব্যবসায়ীর দোকানে আর্নস্ট কাজ করে সেখানেই ছোটো ভাইকে একটা কাজ জুটিয়ে দেবে আর্নস্ট। কিছু টাকা জমাতে পারলেই আবার হিরার সন্ধানে মাত্তো গ্রসোতে হানা দেবে আর্নস্ট-এবার আর একা নয়, সঙ্গে থাকবে ছোটো ভাই সাশা।
পরের দিনই কাজে লেগে গেল সাশা সিমেল।
একটি প্রকাণ্ড রোলার চালিয়ে রুপোর পাতগুলিকে পাতলা চাদরে পরিণত করার জন্য সাশা এবং আরও দুটি লোককে নিযুক্ত করেছিল মালিক। সাশা তার পাশের লোকটির মুখের দিকে তাকায়নি–নিবিষ্টচিত্তে সে মালিকের নির্দেশ অনুসারে কাজ করছিল। হঠাৎ খুব ধীরে মৃদুস্বরে কেউ তাকে উদ্দেশ করে বলল, সিনর সিমেল! তুমি বুঝি মালিককে তোমার গায়ের জোর দেখিয়ে খুশি করতে চাও? তোমার দেশে যে জানোয়ারগুলো ভার বহন করে, তারা বোধ হয় কথা কয় না?
সচমকে কণ্ঠস্বর লক্ষ করে ঘুরে দাঁড়াল সাশা। আবার চমক! কণ্ঠস্বরের মালিক ফাভেল! ভোজনাগারের মধ্যে আগের দিন যার সঙ্গে হাতাহাতির উপক্রম হয়েছিল সেই ব্যক্তি!
.
তৃতীয় পরিচ্ছেদ
কেটে গেছে ছয়টি মাস। ওই সময়ের মধ্যে বিভিন্ন বিষয়ে অভিজ্ঞতা সঞ্চয় করেছে সাশা। রুপোর জিনিস তৈরি করা ছাড়া আরও একটি বিদ্যা রপ্ত হয়েছে তার। সাশা এখন বন্দুক, পিস্তল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্র মেরামত করতে পারে। জার্মান মালিকটি শুধু রুপোর কারবার করে না, বিকল আগ্নেয়াস্ত্র মেরামত করার দায়িত্বও সে গ্রহণ করে উপযুক্ত পারিশ্রমিকের বিনিময়ে। তার বেতনভোগী কর্মচারীর দল ওই কাজগুলি করে। বলাই বাহুল্য, সাশা এবং তার বড়োভাই আর্নস্ট উক্ত কর্মচারীদের দলভুক্ত। সাশা ভোজনাগারে আড্ডা দিতে না-গেলেও সহকর্মীদের সঙ্গে সে মেলামেশা করত, কাজেই তাদের সঙ্গে বন্ধুত্বের সম্পর্ক গড়ে তুলতে তার অসুবিধা হয়নি। কিন্তু ফাভেল ছিল একটি ব্যতিক্রম, সাশার সঙ্গে বন্ধুত্ব স্থাপন করতে সে রাজি হল না।
হঠাৎ দুটি ঘটনা ঘটল পর পর। যার ফলে পাসো ফানডো শহরে দুই ভাইয়ের মানমর্যাদা বাড়ল এবং ফাভেলের সঙ্গে তাদের সম্পর্কের আরও অবনতি ঘটল।
একদিন বিকালে আর্নস্ট তার ছোটোভাইকে জানাল প্যারাগুয়ে থেকে একটি বলবান মানুষ শহরে উপস্থিত হয়েছে। শহর-চত্বরে সে তার অসামান্য দৈহিক শক্তি প্রদর্শন করবে সেইদিনই সন্ধ্যায়। কৌতূহল চরিতার্থ করতে আর্নস্টের সঙ্গে নির্দিষ্ট স্থানে নির্দিষ্ট সময়ে উপস্থিত হল সাশা।
যথাস্থানে গিয়ে দুই ভাই দেখল সজ্জিত মঞ্চের চারপাশে প্রচুর জনসমাগম ঘটেছে। উক্ত বলবান মানুষটি মঞ্চের উপর ওঠেনি, নীচে দাঁড়িয়ে জনতার সপ্রশংস দৃষ্টি উপভোগ করছে। লোকটির চেহারা সত্যিই প্রশংসা করার মতন এ-কথা একনজর তাকিয়েই মেনে নিল দুই ভাই। লোকটির নামও জানা গেল–সিনর মার্সেলো ক্যাসারাস।
উক্ত মার্সেলোর কাঁধের উপর ছড়ানো ছিল একটা জাগুয়ারের চামড়া এবং ওই চামড়াটা তার কোমরে এসে আবদ্ধ হয়েছে একটা প্রশস্ত কৃষ্ণবর্ণ চর্মবন্ধনী বা বেল্ট দিয়ে। তার পা থেকে অধমাঙ্গ কালো মোজার মতন এক ধরনের আঁটোসাঁটো পোশাকে ঢাকা রয়েছে। পোশাকের ভিতর দিয়েই লোকটির জানু ও পায়ের বৃহৎ পেশিগুলি দৃশ্যমান হয়ে জনতার মুগ্ধ দৃষ্টি আকর্ষণ করছে। লোকটির গায়ের রং বাদামি, পেশিস্ফিত শরীরের গঠন বুঝিয়ে দিচ্ছে শরীরের অধিকারী অসাধারণ শক্তিমান। তার চোয়াল প্রকাণ্ড, ওষ্ঠাধর পুরু, নাক বাজপাখির ঠোঁটের মতন বাঁকা। নাকের বাঁকা গড়নের জন্য মনে হয় লোকটি সর্বদাই বিরক্তির সঙ্গে ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে আছে। তবে মুখের গঠন যেমনই হোক না কেন, লোকটি আদৌ বদমেজাজি নয়। কারণ, জনতার অভিনন্দনকে স্বীকৃতি জানিয়ে তার ওষ্ঠাধরে ফুটে উঠেছে নীরব হাসির আভাস।
মার্সেলো হচ্ছে সবচেয়ে বলিষ্ঠ মানুষ,মঞ্চের উপর থেকে হেঁকে বলল একটি বিরলকেশ খর্বকায় ব্যক্তি, এমনকী বনের জাগুয়ারও মার্সেলোকে দেখে ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।
বেঁটেখাটো মানুষটি নিশ্চয়ই সে মার্সেলোর ম্যানেজার আবার হাঁক দিল, ওহে আমার আদরের খোকা, এবার মঞ্চের উপর শুয়ে পড়ো। তোমার অমানুষিক শক্তির পরিচয় দাও সকলের কাছে। ভালোমানুষের ছেলেরা তোমায় দেখতে এসেছে, তাদের হতাশ কোরো না।
