জোকুইম তখন জন্তুটার থেকে প্রায় দশ ফিট দূরে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু তাইগরের ভয়ংকর বিকৃত মুখের উপর তার দৃষ্টি নেই, সে তাকিয়ে আছে জন্তুটার পায়ের দিকে।
পরে জেনেছিলাম বর্শাধারী শিকারি ওইভাবেই লড়াই করে–কারণ, তাইগর যতই দাঁত খিঁচিয়ে গর্জন করুক না কেন, শিকারিকে নাগালের মধ্যে পেতে হলে প্রথমেই তাকে পা চালাতে হবে, অর্থাৎ লাফ মারতে হবে। তাই শ্বাপদের পায়ের দিকেই নজর রাখে শিকারি, মুখের দিকে নয়।
অরণ্য-সম্রাটকে কাদা ছুঁড়ে অপমান করার পর পাঁচ সেকেন্ডের বেশি সময় যায়নি, এর মধ্যেই দুই হাতে বর্শা বাগিয়ে চরম মুহূর্তের জন্য প্রস্তুত হয়েছে জোকুইম–মাটির দিকে সামান্য ঝুঁকে আছে বর্শার ধারালো ফলা, ডান দিকের পাঁজর আর কনুইয়ের মাঝখানে চেপে ধরা আছে বর্শার কাষ্ঠদণ্ড।
তাইগর ঝাঁপ দিল চোখের নিমেষে। একটা কালো-হলুদ বিদ্যুৎ যেন চমকে উঠল মুহূর্তের জন্য, পরক্ষণেই কী ঘটল ঠিক বুঝতে পারলাম না শুধু দেখলাম জন্তুটা শূন্যে পাক খেয়ে মাটির উপর ছিটকে পড়ল চিত হয়ে।
আমি দেখলাম, জোকুইমের বর্শা তাইগরের বুকের মধ্যে বসে গেছে এবং সে প্রাণপণ শক্তিতে বর্শার ডান্ডাটা ধরে জন্তুটাকে মাটিতে চেপে রাখার চেষ্টা করছে। তাইগরের ওজন রেড ইন্ডিয়ান শিকারির চাইতে তিনগুণ বেশি, কিন্তু যথাসাধ্য চেষ্টা করেও জন্তুটা জোকুইমকে ঠেলে সরিয়ে নিজেকে মুক্ত করে উঠে দাঁড়াতে পারল না… বর্শার ফলা বুকের মধ্যে আরও গম্ভীর হয়ে ঢুকে যেতে লাগল… অবশেষে রক্তাক্ত দেহে মৃত্যুবরণ করল তাইগর…
সেই ঘটনার কথা আমি জীবনে ভুলতে পারব না। ওটা শিকার নয়, লড়াই। কোনো সাদা চামড়ার মানুষ ওভাবে লড়াই করতে পারে না। ওইভাবে তাইগরকে দ্বন্দ্বযুদ্ধে বধ করার ক্ষমতা রাখে কয়েকজন রেড ইন্ডিয়ান। তারাও বোধ হয় শেষ হয়ে গেছে। জোকুইম ছাড়া কোনো জীবিত তাইগরের সাক্ষাৎ আমি পাইনি। সাশা, আমার কথা শোনো, যেভাবেই হোক জোকুইমের সঙ্গে দেখা করো। ব্রেজিলের মাটিতে তোমার মতো বিদেশির বেঁচে থাকা কঠিন, এখানে বাঁচার কৌশল তোমায় শেখাতে পারে একমাত্র জোকুইম।
সাশা অবশ্য ডম কার্লোসের উপদেশ শিরোধার্য করে তৎক্ষণাৎ জোকুইমের আস্তানার উদ্দেশে যাত্রা করেনি। কিন্তু কিছুদিন পরেই ফাভেলের সঙ্গে কলহ যখন রক্তাক্ত সংঘর্ষে পরিণত হল, তখন যে-ঘটনাচক্রের আবর্তে সাশা সিমেল একদিন তাইগরের সান্নিধ্যে এসে পড়েছিল এবং ব্রেজিলের জনপদ, অরণ্য ও জলাভূমির বুকে নরঘাতক দ্বিপদের ছুরি, বন্দুক আর নরখাদক শ্বাপদের শানিত নখদন্তকে যেভারে ফাঁকি দিয়ে নিশ্চিত মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে এসেছিল সেইসব চমকপ্রদ বিবরণ পরিবেশিত হয়েছে বর্তমান কাহিনির পরবর্তী অংশের বিভিন্ন পরিচ্ছেদে…
.
দ্বিতীয় পরিচ্ছেদ
খুব ছোটোবেলা থেকেই সাশা সিমেল ছিল দাদা আর্নস্টের অনুরাগী ভক্ত। আর্নস্ট চিরকালই গৃহবিমুখ, যাযাবর। সাশা যখন বারো বছরের বালক, সেইসময় আর্নস্ট গৃহত্যাগ করে দক্ষিণ আমেরিকায় চলে যায়। কিছুকাল পরে সিমেল পরিবারের সকলে জানতে পারল আর্জেন্টিনার নৌসেনাদলে যোগ দিয়েছে আর্নস্ট। তখন থেকেই সাশা ভেবে রেখেছিল বড়ো হয়ে সে দাদার কাছে চলে যাবে। কয়েক বৎসর পরে আর্জেন্টিনার একটা রেলপথ যেখানে তৈরি হচ্ছে, সেখানেই অনেক খোঁজাখুঁজি করে দাদাকে ধরে ফেলল সাশা। তখন আর সাশা নিতান্ত বালক নয়, দস্তুরমতো এক বলিষ্ঠ যুবক। যেকোনো পরিস্থিতির মোকাবিলা করার সামর্থ্য তার হয়েছে।
আর্নস্ট আর সাশা আবার বিচ্ছিন্ন হল। আর্নস্ট চলে গেল উত্তর দিকে ব্রেজিল নামক প্রদেশে হিরার সন্ধানে, আর সাশা যেখানে গেল সেই জায়গাটার নাম হল বুয়েনস এয়ার্স।
এরপর বহুদিন দাদার দেখা পায়নি সাশা। একবার মাত্র একটা চিঠি পেয়েছিল সে দাদার কাছ থেকে। সেই চিঠির সূত্র ধরে পাসো ফানডো শহরে এসে এক জার্মান ইঞ্জিনিয়ারের কাছে অনুসন্ধান করে আর্নস্টের হদিশ পেয়ে গিয়েছিল সাশা।
জার্মানটির নির্দেশ অনুসারে একটি ভোজনাগারে ঢুকেই সাশা তার দাদাকে দেখতে পেল। কিন্তু দুই ভাইয়ের মিলনের আনন্দকে তিক্ত করে দিল ফাভেল নামে একটি লোক। আর্নস্টের সঙ্গে একই টেবিলে বসে পানভোজন করছিল ওই লোকটি। তার চেহারাটা ছোটোখাটো হলেও স্বভাব ছিল অতিশয় উগ্র। প্রথম দর্শনেই সাশাকে সে অপমান করে বসল। আর্নস্ট তৎক্ষণাৎ বাধা না-দিলে নির্ঘাত সাশার ঘুসি পড়ত ফাভেলের মুখে। দৈহিক শক্তিতে ফাভেল কোনোমতেই সাশার সঙ্গে পাল্লা দিতে সমর্থ ছিল না, হয়তো এক ঘুসিতেই সে ঠিকরে পড়ত মাটিতে। কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটলে পরবর্তীকালে সাশার জীবন যে বিপন্ন হতে পারে, সে-বিষয়ে সম্পূর্ণ সচেতন ছিল আর্নস্ট–সেইজন্যই ব্যাপারটাকে মুখোমুখি থেকে হাতাহাতি পর্যন্ত গড়াতে দেয়নি সে।
ভোজনাগার থেকে ভাইকে নিয়ে বেরিয়ে এল আর্নস্ট এবং কিছুদূর হেঁটে গিয়ে প্রবেশ করল একটি কুঁড়েঘরে। সাশা বুঝল ওই কুটিরটি এখন দাদার আস্তানা।
আলেক্স! আর্নস্ট বলল, মাত্তো গ্রসো জায়গাটাতে ছড়ানো আছে রাজার ঐশ্বর্য! শুধুমাত্র তুলে নেওয়ার অপেক্ষা।
সাশা বলল, তা তো বুঝলাম। কিন্তু তুমি তাহলে ফিরে এলে কেন?
আমার মদ ফুরিয়ে গিয়েছিল। জঙ্গলে তো মদ পাওয়া যায় না। তাই মদ কিনতে এখানে এসেছিলাম। কিন্তু আমার ঘোড়াটা এখানে এসেই হঠাৎ মারা গেল। গায়ে হেঁটে অতদূর যাওয়া সম্ভব নয়। অথচ ঘোড়া কেনার মতন যথেষ্ট টাকাও আমার কাছে নেই। অতএব এখানেই একটা রুপার দোকানে কাজ নিলাম। তোকেও ওখানে একটা কাজ আমি জুটিয়ে দিতে পারব আলেক্স। তারপর কিছু টাকা হলে দুই ভাই আবার ফিরে যাব মাত্তো গ্রসোর জঙ্গলে বুঝেছিস? সেখানে ছড়িয়ে আছে রাশি রাশি হিরা, যাকে বলে রাজার ঐশ্বর্য।
