জোকুইম লোকটা জঙ্গলকে জানে, কার্লোস বলতে লাগল, মানুষ যেমন নিজের বৈঠকখানার প্রত্যেকটি আসবাবপত্র চেনে, ঠিক তেমনিভাবেই জঙ্গলকে চিনেছে জোকুইম গুয়াতো। সে নিজের হাতে পঁয়ত্রিশটা তাইগর বর্শা দিয়ে মেরেছে। শিকারের সময় সে কারো সাহায্য নেয় না। ব্যাপারটা যে কতখানি বিপজ্জনক, সে-বিষয়ে তোমার ধারণা নেই। জঙ্গল সম্বন্ধে ওয়াকিবহাল না হলে তোমার বন্দুক বা পিস্তল কোনো কাজে লাগবে না। তাইগর তোমাকে মুহূর্তের মধ্যে টুকরো টুকরো করে ফেলবে, হাতের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগই তুমি পাবে না। আমি নিজেও বন্দুক-পিস্তলের ব্যাপারে নিতান্ত আনাড়ি নই
হঠাৎ কথা থামিয়ে হাতের এক ঝটকায় অবিশ্বাস্য দ্রুতবেগে কোমর থেকে পিস্তল তুলে নিল কার্লোস, কিন্তু পাকা পিস্তলবাজ হলেও জঙ্গলের মধ্যে যে সবসময় আত্মরক্ষা করতে পারব, এমন আস্থা আমার নিজের উপরেও নেই। বন্ধু সিমেল–তোমার বয়স কম, লম্বায় তুমি প্রায় ছ-ফুট হবে, দেখে বোঝা যায় গায়ে বেশ জোর আছে কিন্তু তাইগরের সামনে তোমার এই গায়ের জোর কোনো কাজে লাগবে না। পূর্ণবয়স্ক তাইগর প্রায় নয় ফুট লম্বা, দেহের ওজন চারশো পাউন্ডের কাছাকাছি। তার ধারালো নখ দিয়ে সে তোমার বুক চিরে ফাঁক করে দিতে পারে। তাইগরের দৈহিক শক্তি তোমার চাইতে অনেক বেশি এবং সে দস্তুরমতো বিপজ্জনক। তুমি পারতপক্ষে ফাভেলকে খুন করতে চাইবে না কিন্তু তাইগর তোমার সূক্ষ্ম ন্যায়নীতির ধার ধারে না, সে তোমায় সুযোগ পেলেই হত্যা করবে আর সম্ভবত খেয়েও ফেলবে। সিমেল ভায়া, জীবন সম্বন্ধে তোমার দৃষ্টিভঙ্গি বদলানো দরকার, না হলে একদিন হয়তো প্রাণ দিয়েই তোমাকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হবে। আমার মনে হয় আর্নস্টকে নিয়ে এখনই জোকুইম গুয়াতের সঙ্গে তোমার দেখা করা উচিত। তার কাছে অত্যন্ত প্রয়োজনীয় কিছু তথ্য তোমরা জানতে পারবে, সভ্য মানুষের অভিধানে আজ পর্যন্ত যা লেখা হয়নি।
একটু থেমে লোবোর ঘাড় চুলকে দিল কার্লোস, তারপর আবার বলতে লাগল, কয়েক বছর আগে জোকুইম গুয়াতোকে আমি তাইগর শিকার করতে দেখেছি। সেই সময় জারোয়াস নামে জলাভূমির পূর্বদিকে একটা বিশাল গোশালার রক্ষণাবেক্ষণ করতাম আমি। জায়গাটা রয়েছে রিও আরাগুয়া আর উত্তর প্যারাগুয়ের মাঝখানে। ওই অঞ্চলে বাস করে অসংখ্য তাইগর। তাদের কবলে প্রতি বৎসর হাজার হাজার গোরু-বাছুর মারা পড়ে।
জোকুইম আর আমি একদিন ভোর হওয়ার একটু আগে ঘোড়ায় চড়ে দুটো কুকুর নিয়ে একটা তাইগরের সন্ধানে যাত্রা করেছিলাম। জন্তুটা কিছুদিন ধরে ভীষণ উপদ্রব করছিল। ভোরের আলো ফোঁটার সঙ্গেসঙ্গে কুকুর দুটো তাইগরের পায়ের ছাপ আবিষ্কার করল একটা খাঁড়ির ধারে। পদচিহ্নের আকৃতি ও গভীরতা দেখে বুঝলাম জন্তুটা মস্ত বড়ো, দেহের ওজন সাড়ে তিনশো পাউন্ডের কম হবে না। তাইগর সাঁতার কাটতে ওস্তাদ, জলে নেমে সে কোথায় সরে পড়েছে কে জানে। কিন্তু দুপুরের দিকে কুকুর দুটো একটা দ্বীপের মতো জায়গার উপর তাইগরকে ঘেরাও করে ফেলল। দ্বীপের চারপাশে জল খুব গভীর নয়, কিন্তু কাদায় পিছল জলাভূমির মধ্যে পা রাখাই মুশকিল। জলের উপর এখানে-ওখানে বিচ্ছিন্নভাবে গুচ্ছ গুচ্ছ ঘাস আর বর্শার ফলার মতো ভাঙা গাছের ডাল প্রতিপদে আমাদের বাধা দিচ্ছিল। জলাভূমির পাড়ে ঘোড়া রেখে আমরা জলে নেমেছিলাম। আমার হাতে রাইফেল, জোকুইমের হাতে বর্শা। বর্শার দৈর্ঘ্য ছয় ফুটের মতো, তার মধ্যে ফলাটাই হবে দু-ফুট লম্বা।
জোকুইম একবার হাত নেড়ে আমাকে জলার মধ্যে নামতে বারণ করল। কিন্তু আমি তখন তাইগরটাকে শিকার করার জন্য ব্যস্ত হয়ে উঠেছি, জোকুইমের নিষেধ না-শুনে রাইফেল হাতে এগিয়ে চললাম অগভীর জল ভেঙে দ্বীপটার দিকে। অভিজ্ঞ শিকারির নির্দেশ অমান্য করার ফল পেলাম হাতে হাতে জলের মধ্যে অদৃশ্য লতার ফঁসে পা জড়িয়ে সশব্দে আছড়ে পড়লাম। হাতের রাইফেল ছিটকে পড়ে অদৃশ্য হল জলাভূমির গর্ভে এবং আমার নাকে-মুখে হুড়হুড় করে ঢুকল কাদা-মাখা জল।
কোনোমতে নিজেকে সামলে দ্বীপের কাছে ডাঙার মাটিতে হাত রাখলাম, তারপর মুখ তুলেই দেখতে পেলাম জঙ্গলের রাজা তাইগরকে। একটা মস্ত গাছে পিঠ দিয়ে সে রুখে দাঁড়িয়েছে আর কুকুর দুটো জলের ধারে দাঁড়িয়ে জন্তুটার উদ্দেশে চিৎকার করছে তারস্বরে। তাইগর মাঝে মাঝে এগিয়ে এসে কুকুর দুটোকে লক্ষ করে থাবা চালাচ্ছে, সৌভাগ্যের বিষয় প্রত্যেকবারই ফসকে যাচ্ছে তার থাবার নিশানা।
সেই সময় রাইফেল হাতে থাকলে অনায়াসে জন্তুটাকে গুলি করে মারতে পারতাম। রাইফেলের খোঁজ নেওয়ার জন্য উঠে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেই পায়ের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ল অসহ্য যন্ত্রণার শিহরন–গোড়ালি মচকে গেছে, আমার এখন দাঁড়ানোর ক্ষমতা নেই।
সেই অবস্থাতেই জোকুইমকে দেখলাম। সে তাইগরের খুব কাছে প্রায় দশ ফুটের মধ্যে এসে পড়েছে। আমি বুঝলাম জন্তুটা যদি এখন তাকে আক্রমণ করে, তাহলে পিছিয়ে এসে জলাভূমির মধ্যে আশ্রয় গ্রহণ করার সময় সে পাবে না। আমি চেঁচিয়ে তাকে সাবধান করতে গেলাম, কিন্তু কুকুরের চিৎকারে আমার কণ্ঠস্বর ডুবে গেল জোকুইম আমার গলার আওয়াজ শুনতে পেল না…
বাঁ-হাতে বর্শা ধরে ডান হাত দিয়ে একতাল কাদামাটি তুলল জোকুইম, তারপর সেই মাটির তালটাকে ছুঁড়ে মারল তাইগরের মুখে। ফল হল বিস্ময়কর প্রকাণ্ড হাঁ করে জোকুইমের দিকে ফিরল তাইগর, তার গলা থেকে বেরিয়ে এল ভীষণ গর্জনধ্বনি। জন্তুটার ফাঁক-হয়ে-যাওয়া চোয়ালের প্রকাণ্ড হাঁ দেখে আমার মনে হল জোকুইমের পুরো শরীরটাকেই সে বুঝি এক কামড়ে গিলে ফেলবে।
