ফাভেলের সঙ্গে দৈনন্দিন কলহ যখন চরম পরিণতির দিকে এগিয়ে যাওয়ার উপক্রম করছে, সেইসময় একদিন পরামর্শ ও উপদেশের জন্য ডম কার্লোসের দরজায় উপস্থিত হল সাশা সিমেল…
দূর দিগন্ত থেকে অস্তায়মান সূর্যের রক্তিম রশ্মি ছড়িয়ে পড়ছিল রিও গ্র্যান্ড ডো সাল নামে উদ্ভিদ-আচ্ছন্ন প্রান্তরের বুকে। সেই প্রান্তর ছাড়িয়ে বিস্তীর্ণ ভূখণ্ডের ভিতর দিয়ে চলে গেছে বিখ্যাত মাত্তো গ্রুসোর রহস্যময় অরণ্য, যেখানে ঘন উদ্ভিদ ও জলাভূমির বুকে অবস্থান করছে বিভিন্ন ও বিচিত্র মৃত্যুদ–শ্বাপদ, সরীসৃপ, চোরাবালি!
কিন্তু বিশাল প্রান্তর ও দূরবর্তী অরণ্যের নৈসর্গিক সৌন্দর্য বা অস্তায়মান সূর্যের আলোছায়ার খেলা দেখে মুগ্ধ হওয়ার অবকাশ ছিল না সাশার–সে সোজা এসে দাঁড়াল উম কার্লোসের সামনে।
শহরের বাইরে অরণ্য ও নগরের সীমানার উপর ডম কার্লোসের বাড়ি। বাড়িটার মধ্যে বৈশিষ্ট্য কিছুনা-থাকলেও দরজার দিকে তাকালে যেকোনো মানুষের পিলে চমকে যাবে। দরজার উপর সুতোয় বেঁধে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে সারি সারি মানুষের কান! যে-অপরাধীদের প্রাণদণ্ড দিয়েছে কার্লোস, ওগুলো তাদের মুণ্ড থেকে কর্তিত স্মারকচিহ্ন।বহু যুদ্ধজয়ের নীরব সাক্ষী।
কার্লোসকে ডাকাডাকি করার দরকার হল না। একটা কাঠের টুলের উপর বাড়ির সামনে বসে ছিল সে। পাশে দাঁড়িয়েলোবো নামে কুকুরটা প্রভুর আদর উপভোগ করছিল মহানন্দে। সাশাকে দেখে সাদর অভ্যর্থনা জানাল ডম কার্লোস।
সাশা বিলক্ষণ উত্তেজিত ছিল। বাজে কথায় সময় নষ্ট না-করে তৎক্ষণাৎ ফাভেল-ঘটিত সমস্যার কথা জানিয়ে সে পরামর্শ চাইল ডম কার্লোসের কাছে।
আমাদের এখানে, অর্থাৎ ব্রেজিলে আমরা একটা নীতি অনুসরণ করি, সাশার মুখের উপর একটিমাত্র চক্ষুর তীব্র দৃষ্টি স্থাপন করে ডম কার্লোস বলল, আমরা অন্যের ব্যাপারে নাক গলাই না, গায়ে পড়ে কারো সঙ্গে ঝগড়াও করি না। কিন্তু আমায় যদি কেউ অপমান করে বা আক্রমণ করে, তাহলে তাকে হত্যা করতে আমি কিছুমাত্র দ্বিধা করব না। যে-লোক তোমাকে অপমান বা আক্রমণ করতে পারে, সে হচ্ছে খ্যাপা কুকুরের শামিল–তাকে তোমার খুন করাই উচিত। এই যে লোবো, ও যদি তোমাকে কামড়াতে যায়, তাহলে ওকে মেরে ফেলতে কি তুমি দ্বিধা করবে?
যাকে নিয়ে এই ভয়াবহ মন্তব্য, তার দিকে একবার সস্নেহে দৃষ্টিপাত করল কার্লোস। প্রভুর চোখে চোখ রেখে ঘন ঘন লাঙ্গুল আন্দোলিত করে প্রভুকে সমর্থন জানাল লোবো। যেমন মনিব, তেমনি কুকুর!
লোবোর উপর থেকে চোখ সরিয়ে সাশার মুখের দিকে তাকাল কার্লোস, তবে একটা কথা মনে রেখো। ফাভেলকে খুন করলে আমি আর লোবো তোমাকে অনুসরণ করব। কারণ, ফাভেলের আত্মীয়স্বজন নিশ্চয়ই আমায় টাকা দিয়ে খুনিকে হত্যা করতে বলবে, আর পেশা অনুসারে আমিও তোমাকে বা তোমার ভাইকে অথবা দুজনকেই হত্যা করতে বাধ্য হব। বন্ধুদের কান কেটে নিতে আমার খুবই খারাপ লাগবে, কিন্তু সে-রকম কিছু ঘটলে অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গেই আমার অপ্রীতিকর কর্তব্য পালন করতে হবে। এটাই আমার পেশা যে!
ডম কার্লোসের বক্তব্য শেষ হলে সাশা বলল, তাহলে তুমি আমায় ফাভেলকে এড়িয়ে চলতে বলছ?
না, না, কার্লোস বলল, তোমার বিবেক যা বলবে, তুমি তা-ই করবে।
আমি ওই খুদে ভোঁদড়টাকে এড়িয়ে চলতে পারি না, সাশা বলল, কারণ, আমরা এক জায়গায় কাজ করি। আর আমি ওর ভয়ে পালিয়ে যেতেও চাই না। সেটা সম্ভব নয় আমার পক্ষে।
না, তুমি ফাভেলকে এড়িয়ে যেতে পারবে না, কার্লোস হাসল, মনে হচ্ছে লোবোকে নিয়ে আমার বন্ধুদের পিছনে আমাকেই তাড়া করতে হবে, আর শেষ পর্যন্ত অত্যন্ত দুঃখের সঙ্গে তাদের কানগুলো কেটে আনতে হবে। সিনর সিমেল, তোমায় আমি একটা উপদেশ দিচ্ছি, শোনো। এখন তুমি চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা করার জন্য অস্থির হয়ে উঠেছ, প্রতিপক্ষের দম্ভ তুমি সহ্য করতে পারছ না কিন্তু মাত্তো গ্রসোর প্রাকৃতিক পরিবেশ, মানুষ এবং জানোয়ার তোমায় পরিবেশের উপযুক্ত করে তুলবে। সেখানে গেলে তুমি বুঝতে পারবে চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা কেমনভাবে করতে হয়।
একটু থেমে ডম কার্লোস আবার বলতে লাগল, রিও সাও লরেংকো নামে যে-জায়গাটা আছে, সেখানে গেলে সম্ভবত তুমি একজন বুড়ো ইন্ডিয়ানের দেখা পাবে। ঠিক কোথায় গেলে তাকে পাওয়া যাবে, সেটা আমি যথাসময়ে তোমাকে জানিয়ে দেব। তার নাম জোকুইম গুয়াতো। লোকটি ওস্তাদ তাইগরেরো। কারো সাহায্য না-নিয়ে বর্শা দিয়ে সে তাইগর মারতে পারে।
দক্ষিণ আমেরিকার জাগুয়ারকে স্থানীয় মানুষ তাইগর বলে। সাশা শুনেছিল রেড ইন্ডিয়ানরা বর্শা দিয়ে জাগুয়ার শিকার করে। অবশ্য তারা দলবদ্ধ হয়ে জাগুয়ারকে আক্রমণ করে। কারো সাহায্য না-নিয়ে সম্পূর্ণ এককভাবে যে নিঃসঙ্গ শিকারি বর্শা দিয়ে জাগুয়ার মারতে পারে, তাকেই তাইগরেরো আখ্যা দেওয়া হয়।
তবে তেমন কোনো মানুষ সাশার চোখে পড়েনি। তাইগরেরোর অস্তিত্ব সম্পর্কে তার যথেষ্ট সন্দেহ ছিল। সন্দেহ অকারণ নয়–তাইগরেরো সম্পর্কে অনেক গালগল্প শোনা যায় বটে, কিন্তু স্বচক্ষে তাইগরেরোকে শিকার করতে দেখেছে, এমন মানুষের সাক্ষাৎ পায়নি সাশা সিমেল। এই প্রথম সে জোকুইম নামে এক তাইগরেরোর কথা শুনল ডম কার্লোসের মুখে।
