বড়ো ভাইকে ছোটোবেলা থেকেই দারুণ ভালোবাসত আশা সিমেল। খামখেয়ালি স্বভাবের বেপরোয়া আর্নস্ট ছিল ছোটোভাই সাশার চোখে মস্ত হিরো! কৈশোর উত্তীর্ণ হয়ে সাশা যখন যৌবনে পা দিয়েছে সেইসময় একটা অবাঞ্ছিত ঘটনায় সমগ্র পৃথিবী সম্পর্কে তিক্ত হয়ে উঠল সে কাজকর্মে ইস্তফা দিয়ে সে পৌঁছে গেল পাসো ফানডো শহরে এবং বিস্তর খোঁজাখুঁজির পর বড়োভাই আর্নস্টের দেখা পেল সেখানকার একটা হোটেলের মধ্যে। দীর্ঘ অদর্শনের পর মিলনের আনন্দ ভালো করে উপভোগ করতে পারল না দুই ভাই–ফাভেল নামে একটি স্থানীয় মানুষ হঠাৎ অপমান করে বসল ছোটো ভাই সাশাকে। ব্যাপারটা কোনোমতে সামলে নিল আর্নস্ট। মালপত্র একটা হোটেলে রেখে পায়ে হেঁটে দাদার খোঁজে বেরিয়েছিল সাশা, পরের দিন জিনিস নিয়ে চলে এল দাদার আস্তানায়।
কলকবজার কাজ দুই ভাইয়েরই জানা ছিল। ভাঙা যন্ত্রপাতি আর অকেজো অস্ত্র মেরামতে আর্নস্ট ছিল অতিশয় দক্ষ। দাদার মতো পাকা ওস্তাদ না হলেও মোটামুটি কলকবজার কাজ জানত সাশা। দাদার সঙ্গে কথা বলে সাশা জানতে পারল আর্নস্ট এখন হিরার সন্ধান ছেড়ে স্থানীয় একটি জার্মান ব্যবসায়ীর কারখানায় যন্ত্রপাতি মেরামতের কাজ করছে। দাদার খামখেয়ালি স্বভাব সম্পর্কে যথেষ্ট সচেতন থাকলেও হিরার সন্ধান ছেড়ে হঠাৎ একটা অখ্যাত শহরে মিস্ত্রির কাজ নিয়ে দাদাকে জীবিকানির্বাহ করতে দেখে সাশার মনে হল ব্যাপারটা অহেতুক খামখেয়ালি কাণ্ড নয়–এর ভিতর কিছু রহস্য আছে। আর্নস্ট জামা খুলতেই রহস্য কিছুটা পরিষ্কার হল–তার কাঁধের উপর দেখা গেল একটি অর্ধশুষ্ক ক্ষতচিহ্ন! মনে হয়, অস্ত্রাঘাতের ফলেই ওই চিহ্নটার সৃষ্টি হয়েছে। সাশা অনুমান করল মাত্তো গ্রসো নামক স্থানে কারো সঙ্গে বিবাদের ফলেই ওই চিহ্নটার সৃষ্টি এবং সেই সংঘর্ষের জন্যই পরবর্তীকালে হিরার সন্ধান ছেড়ে স্থানত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছে। আর্নস্ট। তবু ক্ষতচিহ্ন নিয়ে কোনো কৌতূহল প্রকাশ করল না সাশা, খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাশা বুঝেছিল ব্রেজিলের মানুষগুলো বিশেষ শান্তশিষ্ট নয়।ফাভেলের প্রসঙ্গে দাদার কথাটা তার মনে পড়ছিল বার বার এখানে ফাভেলের চাইতেও খারাপ লোক আছে..
আগেই বলেছি দাদার মতো ওস্তাদ মিস্ত্রি না হলেও যন্ত্রপাতির কাজ জানত সাশা। অতএব যে-কারখানায় দাদা কাজ করত, সেখানে কাজ জুটিয়ে নিতে সাশার অসুবিধা প্রবাদপুরুষ। হল না। মালিকের ব্যবহার ভালো, সে সাশাকে পছন্দও করত, কিন্তু ফাভেলের কুনজরে পড়ে গেল সাশা সিমেল। প্রথম দিনেই যে বিরোধের সূত্রপাত ঘটেছিল, পরবর্তীকালে সেই বিরোধ এগিয়ে চলল এক ভয়াবহ সম্ভাবনার দিকে। সাশা আর আর্নস্ট প্রাণপণে বিরোধ এড়িয়ে চলার চেষ্টা করত, কিন্তু সহ্য করার একটা সীমা তো আছে–সাশা বুঝতে পারছিল অদূর ভবিষ্যতে একদিন ধৈর্যের বাঁধ ভাঙবে, মানসিক তিক্ততা সেইদিন গড়িয়ে যাবে রক্তাক্ত সংঘর্ষের দিকে…
এইবার পাঠকদের সঙ্গে বর্তমান কাহিনির অন্যতম প্রধান চরিত্রের পরিচয় করিয়ে দেওয়ার সময় হয়েছে–ডম কার্লোস! ওই নামটির সঙ্গে জড়িত ছিল পাসো ফানডো শহরের যাবতীয় বাসিন্দার শ্রদ্ধা, বিস্ময় ও আতঙ্ক!
দক্ষিণ আমেরিকা তথা ব্রেজিলের বিভিন্ন অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলার অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। পাসো ফানডো শহরকেও ওই নিয়মের ব্যতিক্রম বলা চলে না। সেই প্রায়-অরাজক শহরে স্বেচ্ছায় শান্তিরক্ষকের কর্তব্য পালন করতে এগিয়ে এসেছিল একটি রেড ইন্ডিয়ান। অবশ্য সেই পবিত্র কর্তব্যপালন করার জন্য সে অর্থগ্রহণ করত জনসাধারণের কাছ থেকে। ডম কার্লোস নামক ওই ব্যক্তি রাজ্য সরকারের কাছ থেকে মাইনে পেত না। শান্তিরক্ষার কাজটাকে সে বেছে নিয়েছিল স্বাধীন পেশা হিসেবে। অত্যন্ত বিপজ্জনক পেশা সন্দেহ নেই তবে ওই পেশার উপযুক্ত মানুষ ছিল ডম কার্লোস বন্দুক, পিস্তল প্রভৃতি আগ্নেয়াস্ত্রে তার নিশানা ছিল অব্যর্থ।
পাসো ফানডো শহরের অত্যাচারিত বা নিহত মানুষের আত্মীয়স্বজন যখন কার্লোসের কাছে। সুবিচারের আশায় উপস্থিত হত, তখনই প্রচুর অর্থের বিনিময়ে বিচারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হত ডম কার্লোস। সরকারি বিচারক অপরাধীকে প্রাণদণ্ড দিলে সেই দণ্ড কার্যকরী করে সরকারি জল্লাদ; কিন্তু ডম যখন অপরাধীকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করত, তখন সেই দণ্ড কার্যকরী করার ভার গ্রহণ করত স্বহস্তে। খুনিদের হত্যা করার পর তাদের কানগুলো কেটে রেখে দিত সে। ওগুলো তার যুদ্ধজয়ের স্মৃতিচিহ্ন বা স্মারক।
বন্দুক-পিস্তলের নিশানায় সিদ্ধহস্ত ডম কার্লোসের ভয়ে শহরের সমাজবিরোধী দুবৃত্তরা খুন করার আগে একটু চিন্তা করত। খুন করার পর নিজেরও খুন হয়ে যাওয়ার ভয়াবহ সম্ভাবনাকে ভয় করে না এমন খুনি পাসো ফানডো শহরেও নিতান্ত বিরল। অপরাধীরা অবশ্য আত্মরক্ষার চেষ্টা করত। দুবৃত্তের কবলে একটি চোখ হারিয়েছিল ডম কার্লোস, তবে উক্ত ব্যক্তিকে প্রায়শ্চিত্ত করতে হয়েছিল প্রাণ দিয়ে। প্রৌঢ়বয়স্ক, একচক্ষু, রোগা চেহারার ডম কার্লোস নামক মানুষটি ছিল চোর-ডাকাত আর খুনিদের কাছে মূর্তিমান দুঃস্বপ্ন। কিন্তু ওই পেশাদার শান্তিরক্ষকটি আর্নস্ট আর সাশাকে খুব ভালোবাসত। মানবচরিত্র সম্পর্কে দস্তুরমতো অভিজ্ঞ ছিল ডম কার্লোস সরল সাদাসিধে স্বভাবের জন্যই তার বিশেষ প্রিয়পাত্র হয়ে উঠেছিল দুই ভাই।
