পরক্ষণেই টারজানের দেহ ডিগবাজি খেয়ে সশব্দে আছড়ে পড়ল বন্ধ দরজার ওপর!
সমবেত জনতার কণ্ঠে জাগল অট্টহাস্য! টারজানের দুর্দশা তারা উপভোগ করছে সকৌতুকে!
টারজান উঠে দাঁড়াল। ভীষণ আক্রোশে সে ধেয়ে গেল প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে, তারপর হঠাৎ শূন্যে লাফিয়ে উঠে রেড-এর মাথায় করলে প্রচণ্ড পদাঘাত।
লাথিটা রেড-এর মাথায় চেপে পড়েনি, মুখের ওপর দিয়ে হড়কে গিয়েছিল–পলকে টারজানের একটি জুতোসুদ্ধ পা ধরে ফেলল রেড। কিন্তু শত্রুকে সে ধরে রাখতে পারল না। মাটির ওপর সশব্দে আছড়ে পড়েই আবার উঠে দাঁড়াল টারজান।
উল্লসিত জনতার চিৎকারে ঘর তখন ফেটে পড়ছে! হ্যাঁ, একটা দেখার মতো লড়াই হচ্ছে। বটে!
তবে দর্শকদের মধ্যে কেউ কেউ বুঝতে পেরেছিল এটা সাধারণ লড়াই নয়। প্রথম প্রথম হয়তো যোদ্ধাদের মধ্যে কিছুটা খেলোয়াড়ি মনোভাব ছিল, কিন্তু এখন তাদের মাথায় চেপেছে খুনের নেশা।
টারজানের জুতোর তলা ছিল লোহা দিয়ে বাঁধানেনা। রেড-এর মুখের ওপর সেই লৌহখণ্ড এঁকে দিয়েছে রক্তাক্ত ক্ষতচিহ্ন।
রেড-এর গালের ওপর দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে রক্তের ধারা, চিবুকটা একপাশে বেঁকে গেছে আঘাতের বেগে।
হর্ষধ্বনি থেমে গেল। রক্তমাখা ক্ষতচিহ্ন এইবার সকলের চোখে পড়েছে।
হঠাৎ সকলের নজর পড়ল টারজানের উপর। প্রায় ২০০ মানুষের দেহের অঙ্গে অঙ্গে ছুটে গেল বিদ্যুৎ-শিহরন টারজানের হাতের মুঠিতে ঝকঝক করছে একটি ধারালো ছোরা!
জনতা নির্বাক। দারুণ আতঙ্কে তাদের কণ্ঠ হয়ে গেছে স্তব্ধ।
নিঃশব্দে বাঘের মতো গুঁড়ি মেরে টারজান এগিয়ে এল শত্রুর দিকে রেড তখন নিবিষ্ট চিত্তে ক্ষতস্থান পরীক্ষা করছে।
ভীষণ চিৎকার করে আক্রমণ করল টারজান। এক মুহূর্তের জন্য দেখা গেল চারটি হাত আর চারটি পায়ের দ্রুত সঞ্চালন, তারপরেই মৃত্যু-আলিঙ্গনে বদ্ধ হয়ে স্থির প্রস্তরমূর্তির মতো দাঁড়িয়ে গেল দুই প্রতিদ্বন্দ্বী!
একহাত দিয়ে টারজানের ছোরাসুদ্ধ হাত চেপে ধরেছে রেড, অন্য হাতের পাঁচটা আঙুল চেপে বসেছে শত্রুর কণ্ঠদেশে। টারজানও নিশ্চেষ্ট নয়, সে ছোরাসুদ্ধ হাতটি ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে প্রাণপণে এবং অপর হাতের আঙুলগুলো দিয়ে রেড-এর গলা টিপে ধরেছে সজোরে।
ঘরের মধ্যে অতগুলি মানুষ স্তব্ধ নির্বাক। প্রতিদ্বন্দ্বীদের মুখেও কোনো আওয়াজ নেই। নিঃশব্দে চলছে মৃত্যুপণ লড়াই।
হঠাৎ মট করে একটা শব্দ হল–রেড-এর শক্ত মুঠির মধ্যে ভেঙে গুঁড়িয়ে গেল টারজানের কবজির হাড়, অস্ফুট আর্তনাদ করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল টারজান।
দুই হাত কোমরে রেখে ধরাশায়ী শত্রুর দিকে দৃষ্টিপাত করলে রেড। টারজান উঠল না, সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে।
ভগ্নস্বরে রেড বললে, ওকে এবার একটু জল দাও। দেখছ না, মানুষটা যে অজ্ঞান হয়ে গেছে…
মি. স্কেটন ভুল করেননি। ম্যাকফারলেন ওরফে রেড সত্যিই ভালো লোক। পরবর্তী জীবনে ম্যাকফারলেন ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ পেয়েছিল এবং সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে সে কুণ্ঠিত হয়নি।
[আষাঢ় ১৩৭৬]
তাইগরেরো
প্রথম পরিচ্ছেদ
প্রথম দর্শনেই তিক্ততার সৃষ্টি!
আর্নস্ট হস্তক্ষেপ না-করলে তখনই শুরু হত মারামারি। দুই পক্ষের মাঝখানে দাঁড়াল আর্নস্ট, ফাভেলকে মিষ্টি কথায় শান্ত করে ছোটোভাইকে সে টেনে নিয়ে গেল একপাশে, তারপর বলল, বহুদিন পরে তোর সঙ্গে দেখা হল আলেক্স। দারুণ ভালো লাগছে।
দীর্ঘকাল পরে দাদার দেখা পেয়ে সাশাও খুব খুশি হয়েছিল, কিন্তু ফাভেল নামে অপরিচিত মানুষটির অভদ্র আচরণ তার মন থেকে সব আনন্দ মুছে দিয়েছিল–ক্রুদ্ধ স্বরে সে প্রশ্ন করল, লোকটা কে?
আর্নস্ট বিব্রত বোধ করল, ওর নাম ফাভেল। লোকটা ব্রেজিলের স্থানীয় বাসিন্দা, আমার সঙ্গে এক কারখানায় কাজ করে।
এমন অভদ্র মানুষের সঙ্গে তুমি কাজ কর?
ইয়ে মানে একেবারে একা নিঃসঙ্গ জীবন কাটানো যায় না। লোকজনের সঙ্গে মিশতেই হয়। এখানে ফাভেলের চাইতেও খারাপ লোক আছে। ফাভেল আমার বন্ধু নয়, সহকর্মী মাত্র। ওকে নিয়ে আলোচনার প্রয়োজন নেই। তারপর তোর খবর কী?
সাশা জানাল দেশ থেকে, অর্থাৎ রাশিয়া থেকে, চিঠি পেয়ে সে আর্নস্ট সিমেলের বর্তমান ঠিকানা জানতে পেরেছে। অনেক ঝাট-ঝামেলা সহ্য করে পাসসা ফানভো শহরে এই হোটেলের ভিতর দাদাকে সে পাকড়াও করেছে। আর্নস্ট আগে ছিল ব্রেজিলের মাত্তো গ্রসো নামক অরণ্যসংকুল স্থানে, পরে স্থান পরিবর্তন করে উপস্থিত হয়েছে এই পাসো ফানডো শহরে…
আজকের ব্যাপার নয় দ্বিতীয় মহাযুদ্ধের আগেকার কথা। আর্নস্ট সিমেল আর সাশা সিমেল দুই ভাই। জাতে তারা রুশ। কিন্তু জন্মস্থান ল্যাটভিয়া। বড়ো ভাই আর্নস্ট ছোটোবেলা থেকেই কিছুটা খামখেয়ালি আর বেপরোয়া। কোনো বিষয়ে ঝোঁক চাপলে অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না-করেই সে এগিয়ে যেত এবং অজানা বিপদের মধ্যে ঝাঁপিয়ে পড়তে দ্বিধা করত না সাশা সিমেল কিছুমাত্র। কোনো এক অশুভ মুহূর্তে তার মনে হল হিরার জন্য বিখ্যাত ব্রেজিলের মাত্তো গ্রসসা নামক বনভূমিতে হিরার সন্ধান পেলে রাতারাতি অগাধ অর্থের মালিক হওয়ার সম্ভাবনা আছে–সঙ্গেসঙ্গে সে রওনা হল পূর্বোক্ত স্থানের উদ্দেশে। তারপর বেশ কয়েক বছর সে নিরুদ্দেশ… দীর্ঘকাল পরে বাড়িতে তার চিঠি এল জানা গেল আর্নস্ট সিমেল এখন আর মাত্তো গ্রসসাতে নেই, রয়েছে ব্রেজিলেরই পাসো ফানডো নামক শহরে।
