আবার ভেসে এল টেলিফোনে প্রহরীর কণ্ঠস্বর।লোকটির নাম টারজান। অন্তত ওই নামেই সে নিজের পরিচয় দেয়। বাঘের মতো ভয়ংকর মানুষ ওই টারজান। মি. স্কেটন, আপনি সাবধানে থাকবেন।
আমি সতর্ক থাকব।
স্কেটন টেলিফোন নামিয়ে রাখলেন।
পরের দিন সকালেই স্কেটনের ঘরে টারজান নামধারী মানুষটির শুভ আগমন ঘটল।
স্কেটন বই পড়ছিলেন। বই থেকে মুখ তুলে তিনি আগন্তুকের দিকে দৃষ্টিপাত করলেন।
চিতাবাঘের মতো ছিপছিপে পেশিবহুল বলিষ্ঠ দেহ, দুই চোখের দৃষ্টিতে এবং মুখের রেখায় রেখায় নিষ্ঠুর বন্য হিংসার পাশবিক ছায়া–টারজান?
গম্ভীরভাবে স্কেটন বললেন, তুমি টারজান? আগের ঘাঁটির প্রহরীকে তুমি মেরেছ?
স্কেটনের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলে আগন্তুক, কুৎসিত হিংস্র হাস্যে বিভক্ত হয়ে গেল তার ওষ্ঠাধর, হ্যাঁ, আমার থাবাগুলো বড়ো ভয়ানক।
শোনো টারজান, স্কেটন বললেন, ইচ্ছে করলে তুমি এখানে কাজ করতে পারো।
হ্যাঁ?
লোকটি অবাক হয়ে গেল। এত সহজে কাজ পেয়ে যাবে সে ভাবতে পারেনি। স্পষ্টই বোঝা গেল, মালিকের তরফ থেকে এই ধরনের প্রস্তাব আসতে পারে এমন আশা তার ছিল না।
হ্যাঁ, আর একটা কথা বলে দিচ্ছি, স্কেটন বললেন, এখানে গোলমাল করলে বিপদে পড়বে। এই ঘাঁটিতে এমন একটি মানুষ আছে যে তোমাকে ইচ্ছে করলে টুকরো টুকরো করে ছিঁড়ে ফেলতে পারে।
নীরব হাস্যে ভয়ংকর হয়ে উঠল টারজানের মুখ, ও! ওই লালচুলো মানুষটার কথা বলছেন বুঝি? তার কথা আমার কানে এসেছে। আমি ওই লালচুলোর সঙ্গে একটিবার দেখা করতে চাই।
ভালো কথা। খুব শীঘ্রই তার সঙ্গে তোমার দেখা হবে টারজান।
মি. স্কেটন আবার তার হাতের বইতে মনোনিবেশ করলেন। টারজান কিছুক্ষণ বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইল, কিন্তু স্কেটন একবারও বই থেকে মুখ তুললেন না।
অগত্যা টারজান স্কেটনের ঘর থেকে বেরিয়ে শ্রমিকদের শয়নকক্ষের দিকে পদচালনা করলে।
স্কেটন জানতেন টারজানের সঙ্গে ম্যাকফারলেন ওরফে রেড-এর কলহ অবশ্যম্ভাবী, কিন্তু এত তাড়াতাড়ি যে তার আশঙ্কা সত্যে পরিণত হবে কে জানত?
স্কেটনের কাছে যেদিন টারজান এসেছিল সেদিন রেড অকুস্থলে উপস্থিত ছিল না। কয়েক মাইল দূরে রাস্তা তৈরির কাজে সে ব্যস্ত ছিল। রাত্রিবেলা যখন সে শ্রমিকদের জন্য নির্দিষ্ট শয়নকক্ষে উপস্থিত হল, তখন তার চোখের সামনে ভেসে উঠল এক অদ্ভুত দৃশ্য–
মস্ত বড়ো ঘরটার মাঝখানে দাঁড়িয়ে লাফাচ্ছে আর চিৎকার করছে টারজান, এইখানে এমন কোনো মানুষ নেই যে আমার সঙ্গে লড়তে পারে।
দরজার কাছে স্থির হয়ে দাঁড়াল রেড।
শয়নকক্ষের মাঝখানে মস্ত বড় থামটার ওপর সজোরে পদাঘাত করে চেঁচিয়ে উঠল টারজান, যেকোনো লোক হ্যাঁ, হ্যাঁ, যেকোনো লোককে আমি মেরে ঠান্ডা করে দিতে পারি।
তাই নাকি? যেকোনো লোককে তুমি মেরে ঠান্ডা করে দিতে পারো? হাসতে হাসতে বললে রেড, কিন্তু আমাকে তুমি ঠান্ডা করতে পারবে না।
কথা বলতে বলতে একহাত দিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দিয়েছিল রেড, এইবার ক্ষিপ্রহস্তে গায়ের গরম জামাগুলো সে খুলে ফেলল।
শার্টের আস্তিন গুটিয়ে রেড ধীরে ধীরে এগিয়ে এল টারজানের দিকে! চরম মুহূর্ত!
মিষ্টি হাসি হেসে মধু ঢালা ঠান্ডা গলায় রেড বললে, কী হে স্যাঙাত–তুমি তৈরি?
রেড স্কটল্যান্ডের অধিবাসী। সে শক্তিশালী মানুষ। তার লড়াইয়ের অস্ত্র হচ্ছে দুই হাতের বজ্রমুষ্টি।
টারজান বর্ণসংকর–তার বাপ ফরাসি, মা রেড ইন্ডিয়ান। সেও বলিষ্ঠ মানুষ। কিন্তু তার লড়াইয়ের ধরন আলাদা। ছলে-বলে-কৌশলে যেভাবেই হোক শত্রু নিপাত করতে সে অভ্যস্ত; মারি অরি পারি যে কৌশলে, এই হল তার নীতি।
দুই বিচিত্র প্রতিদ্বন্দ্বী পরস্পরের সম্মুখীন হল।
টারজান খুব ধীরে ধীরে এগিয়ে এল। রেড-এর বলিষ্ঠ দুই হাতের কবলে ধরা পড়ার ইচ্ছা তার ছিল না–হঠাৎ বিদ্যুদবেগে ঝাঁপিয়ে পড়ে সে শত্রুর মাথায় প্রচণ্ড মুষ্ট্যাঘাত করলে, প্রায় সঙ্গেসঙ্গেই অপর হাতখানি সবেগে আঘাত হানল শত্রুর উদরে এবং চোখের পলক ফেলার আগেই ছিটকে সরে গেল প্রতিদ্বন্দ্বীর নাগালের বাইরে।
টারজানের চোখ দুটো এতক্ষণ ক্রোধে ও ঘৃণায় জ্বলছিল জ্বলন্ত অঙ্গারখণ্ডের মতো, কিন্তু এইবার তার বিস্ফারিত চক্ষুতে ফুটে উঠল আতঙ্কের আভাস।
তার একটি আঘাতেও শত্রুর দেহ স্পর্শ করতে পারেনি! রেড আক্রমণ করলে না, স্থির হয়ে অপেক্ষা করতে লাগল শত্রুর জন্য।
আবার আক্রমণ করল টারজান। চিতাবাঘের মতো দ্রুত ক্ষিপ্রচরণে আবার ঝাঁপিয়ে পড়ল সে, ক্রুদ্ধ সর্পের ছোবল মারার ভঙ্গিতে তার দুই হাত বারংবার আঘাত হানল শত্রুর দেহে, তারপর আবার ছিটকে সরে এসে উপস্থিত হল পরবর্তী আক্রমণের জন্য।
টারজানের চোখে এইবার স্পষ্ট ভয়ের ছায়া। শত্রুর একজোড়া বলিষ্ঠ বাহু তার প্রত্যেকটি আঘাত ব্যর্থ করে দিয়েছে! দু-খানি হাত যেন দুটি লোহার দরজা-ইস্পাত-কঠিন সে-হাত দুটির বাধা এড়িয়ে টারজানের আঘাত রেড-এর শরীর স্পর্শ করতে পারেনি একবারও!
টারজান এইবারে অন্য উপায় অবলম্বন করলে। জ্যা-মুক্ত তিরের মতো তার দেহ ছুটে এল শত্রুর উদর লক্ষ করে। ওই অঞ্চলে নদীর ধারের গুন্ডারা সাধারণত পূর্বোক্ত পদ্ধতিতে লড়াই করে, হাত দিয়ে সেই ভীষণ আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখা যায় না। কিন্তু রেড হুঁশিয়ার মানুষ, সেও অনেক ঘাটের জল খেয়েছে, অন্যান্য বারের মতো এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে শত্রুর আক্রমণ ঠেকিয়ে রাখার চেষ্টা করল না–সাঁৎ করে একপাশে সরে গিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বীর পায়ে পা লাগিয়ে মারল এক টান!
