আচম্বিতে ম্যাকফারলেনের বাঁ-হাতের মুঠি বিদ্যুদবেগে ছোবল মারল প্রতিদ্বন্দ্বীর মুখে! প্রতিদ্বন্দ্বী মুষ্টিবীর মাটির ওপর ঠিকরে পড়ে অজ্ঞান হয়ে গেল!
একটি ঘুসিতেই লড়াই ফতে!
তীব্র উল্লাসে চিৎকার করে জনতা ম্যাকফারলেনকে অভিনন্দন জানাল। সেই মুহূর্তে তার নূতন নামকরণ করল রেড অর্থাৎ লাল। লাল চুলের জন্যই ওই নাম হয়েছিল তার। আমরাও এখন থেকে ম্যাকফারলেনকে রেড নামেই ডাকব।
সন্ধ্যার পরে নিজের ঘরে বসে ধূমপান করছিলেন মি. স্কেটন। হঠাৎ সেখানে ঊর্ধ্বশ্বাসে ছুটে এল একটি শ্রমিক। শ্রমিকটি জানাল তাদের দলভুক্ত একটি অল্পবয়সি ছেলেকে দলেরই একজন লোক স্নানের চৌবাচ্চার মধ্যে ঠেসে ধরেছিল, ছেলেটি ভয়ে হতবুদ্ধি হয়ে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে, মি. স্কেটনের এখনই একবার আসা দরকার।
স্কেটন তাড়াতাড়ি ছুটলেন। অকুস্থলে গিয়ে তিনি দেখলেন, একটি অল্পবয়সি কিশোর শীতে ঠকঠক করে কাঁপছে–তার দেহে কোনো বস্ত্রের আচ্ছাদন নেই, ভয়ে তার বুদ্ধিভ্রংশ ঘটেছে।
স্কেটন তাড়াতাড়ি ছেলেটিকে বিছানায় শুইয়ে উপযুক্ত শুশ্রূষার ব্যবস্থা করলেন। ছেলেটির নিউমোনিয়া হওয়ার সম্ভাবনা ছিল, স্কেটনের যত্নে সেই যাত্রা বেঁচে গেল।
পূর্বোক্ত ঘটনার চার দিন পরে স্কেটনের ঘরে আবির্ভূত হল এক বিপুলবপু পুরুষ। লোকটির মস্ত বড়ো শরীর ও রুক্ষ মুখচোখ দেখলেই বোঝা যায় মানুষটি খুব শান্তশিষ্ট নয়।
লোকটি স্কেটনের বেতনভোগী শ্রমিক। তার দুর্দান্ত স্বভাবের জন্য স্কেটন তাকে পছন্দ করতেন না।
আগন্তুক কর্কশ স্বরে বললে, মি. স্কেটন, দেখুন হতভাগা রেড আমার কী অবস্থা করেছে।
মি. স্কেটন দেখলেন লোকটির দুই চোখের পাশে ফুটে উঠেছে আঘাতের চিহ্ন।
স্কেটন বললেন, রেড তোমাকে মারল কেন?
খুব মোলায়েম স্বরে লোকটি বললে, আমি কিছু করিনি স্যার। হতভাগা রেড হঠাৎ এসেই আমাকে দু-ঘা বসিয়ে দিল। আমি স্যার ঝগড়াঝাটি পছন্দ করি না। আমি আপনার কাছে নালিশ জানাতে এসেছি।
স্কেটন অবাক হয়ে ভাবলেন যে মানুষ চিরকালই দুর্বিনীত ও দুর্দান্ত স্বভাবের পরিচয় দিয়ে এসেছে, সে হঠাৎ আজ আঘাতের পরিবর্তে আঘাত ফিরিয়ে না-দিয়ে শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো জানাতে এল কেন?
মুখে বিস্ময় প্রকাশ না করে স্কেটন বললেন, তুমি যাও। যদি রেড দোষ করে থাকে আমি তাকে শাস্তি দেব।
অনুসন্ধান করে আসল খবর জানলেন মি. স্কেটন। সমস্ত ঘটনাটা হচ্ছে এই
ওই ঝগড়াঝাটি পছন্দ না-করা লোকটি কয়েকদিন আগে অল্পবয়সি ছেলেটিকে জলের মধ্যে চেপে ধরেছিল। দলের শ্রমিকরা ব্যাপারটা পছন্দ করেনি, কিন্তু সাহস করে কেউ প্রতিবাদ জানাতে পারেনি। ওই লোকটা ছিল পয়লা নম্বরের ঝগড়াটে, আর তার গায়েও ছিল ভীষণ জোর–তাই সবাই তাকে ভয় করত যমের মতো।
অকুস্থলে ম্যাকফারলেন উপস্থিত ছিল না। পরে সমস্ত ঘটনাটা যখন সে সহকর্মীদের মুখ থেকে জানল, তখনই সে ঝগড়াটে লোকটির কাছে কৈফিয়ত চাইল। ফলে মারামারি। রেডের হাতে মার খেয়ে শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকটি স্কেটনের কাছে অভিযোগ করতে এসেছিল।
সব শুনে স্কেটন বললেন, রেড যা করেছে, ভালোই করেছে।
এক রাতে স্কেটন যখন শুতে যাওয়ার উদ্যোগ করছেন, সেই সময় তার সামনে কাচুমাচু মুখে এসে দাঁড়াল রেড।
স্কেটন প্রশ্ন করলেন, কী হয়েছে?
রেড একটু হাসল, বোকার মতো ডান হাত দিয়ে বাঁ-কানটা একটু চুলকে নিল, তারপর মুখ নীচু করে বললে, স্যার! ঘুমাতে পারছি না স্যার!
–ঘুমাতে পারছ না! কেন?
–ওরা বড়ো গোলমাল করছে স্যার। স্কেটন কান পেতে শুনলেন। শ্রমিকদের শয়নকক্ষ থেকে ভেসে আসছে তুমুল কোলাহল ধ্বনি।
মি. স্কেটন ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত্রি গভীর, যেকোনো ভদ্রলোকই এখন শয্যার বুকে আশ্রয় নিতে চাইবে।
মুখ তুলে গম্ভীর স্বরে স্কেটন বললেন, তোমার হাতে তো বেশ জোর আছে শুনেছি তবে তুমি ঘুমাতে পারছ না কেন?
রেড কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল, তারপরই তার চোখে-মুখে খেলে গেল হাসির বিদ্যুৎ। স্যার! স্যার! আপনি কী বলছেন স্যার? আপনি কি
বাধা দিয়ে স্কেটন বললেন, শোনো! তাঁবুর লোকজনদের মধ্যে যাতে নিয়মশৃঙ্খলা বজায় থাকে তুমি সেই চেষ্টাই করবে। আজ থেকে তুমি হলে এই দলের পুলিশম্যান! বুঝেছ?
এক মুহূর্তের মধ্যে যেন রূপান্তর ঘটল মানুষটির। জ্বলজ্বল করে উঠল রেডের দুই চোখ, সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে স্কেটনকে সে অভিবাদন জানাল, তারপর দৃঢ় পদক্ষেপে অদৃশ্য হয়ে গেল মুক্ত দ্বারপথে।
দশ মিনিটের মধ্যেই শ্রমিকদের কোলাহলমুখর শয়নকক্ষ হয়ে গেল নিস্তব্ধ এবং নিবে গেল বৈদ্যুতিক আলোর দীপ্তি।
রেড তার কর্তব্য পালন করেছে!
মি. স্কেটন শয্যাগ্রহণ করার উপক্রম করলেন আর ঠিক সেই সময়ে বেজে উঠল টেলিফোন। যন্ত্রটাকে তুলে নিলেন স্কেটন।
টেলিফোনের তারে এক উদবেগজনক সংবাদ পেলেন স্কেটন। তাঁর আস্তানা থেকে কয়েক মাইল দূরে রাস্তা তৈরির জন্য গড়ে উঠেছিল আর একটা ঘাঁটি। এ ঘাঁটির প্রহরী টেলিফোনে জানিয়ে দিল যে, তাদের ঘাঁটি থেকে একটি অতিশয় ভয়ংকর মানুষ স্কেটনের আস্তানার দিকে যাত্রা করেছে। প্রহরীর মুখ থেকে আরও বিশদ বিবরণ জানা গেল–ওই গুন্ডাপ্রকৃতির লোকটা নাকি তাদের ঘাঁটিতে খুব উপদ্রব শুরু করেছিল, প্রহরী তাকে বাধা দিতে গিয়ে দারুণ মার খেয়েছে।
