স্কেটন মুখে কিছু বললেন না, কিন্তু বুঝলেন ওই হাতের মালিক অসাধারণ শক্তির অধিকারী।
ম্যাকফারলেন বললে, শুধু পাথর ভাঙা নয়, আমি একটু থেমে সে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে চাইল স্কেটনের দিকে, আমি ভালো লড়াই করতেও জানি।
বেশ, বেশ, স্কেটন বললেন, তোমার মুখখানা দেখে সে-কথাই মনে হচ্ছে আমার। অত বড়ো একটা ব্যান্ডেজ কেন বাঁধতে হয়েছে সে-কথা আমি জানতে চাইব না, আমি শুধু বলব ম্যাকফারলেন! যদি ভালোভাবে বাঁচতে চাও তবে তোমাকে সেই সুযোগ দিতে আমার আপত্তি নেই। তোমাকে আমি কাজে বহাল করলুম। এখন যাও।
ম্যাকফারলেনের দুই চোখ ঝকঝক করে উঠল, হাত তুলে সে মি. স্কেটনকে অভিবাদন জানাল, তারপর তার দীর্ঘ দেহ অদৃশ্য হয়ে গেল তাঁবুর দ্বারপথে।
উত্তর ক্যানাডার দুর্ভেদ্য জঙ্গল ও ঝোপঝাড় ভেঙে তৈরি হচ্ছিল একটা পথ। যে দলটা ওই রাস্তা তৈরির কাজে নিযুক্ত হয়েছিল, মি. স্কেটন সেই দলের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক।
পাথর ভেঙে রাস্তা তৈরির কাজ করতে যে লোকগুলো এগিয়ে এসেছিল, তারা বিলক্ষণ কষ্টসহিষ্ণু–তবে দলের সবাই যে খুব শান্তশিষ্ট ভালোমানুষ ছিল তা নয়। মারপিট দাঙ্গাহাঙ্গামা মাঝে মাঝে লাগত। মি. স্কেটন জানতেন ওটুকু সহ্য করতেই হবে। দারুণ ঠান্ডার মধ্যে পাথর। ভেঙে যারা জীবিকা নির্বাহ করতে এসেছে, তাদের কাছে একেবারে শান্তশিষ্ট ভদ্রলোকের মতো ব্যবহার আশা করা যায় না। তবু যথাসম্ভব গোলমাল এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতেন মি. স্কেটন। তাই যেদিন তিনি শুনলেন ম্যাকফারলেন নামে একজন জেলখাটা কয়েদি তার কাছে কাজ চাইতে এসেছে, সেদিন তিনি একটু অস্বস্তি বোধ করলেন। অবশ্য মি. স্কেটন জানতেন অপরাধীকে ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ দিলে অনেক সময় তার চরিত্র সংশোধিত হয়–স্বভাব-দুবৃত্তদের কথা অবশ্য আলাদা, তারা সুযোগ পেলেই সমাজবিরোধী কাজকর্ম অর্থাৎ চুরি ডাকাতি খুন প্রভৃতি দুষ্কার্যে লিপ্ত হয়। কিন্তু ম্যাকফারলেনের কথাবার্তা শুনে স্কেটনের মনে হল লোকটি স্বভাব-দুবৃত্ত নয়, ভালোভাবে বাঁচার সুযোগ পেলে সেই সুযোগের সদ্ব্যবহার করতে সে কুণ্ঠিত হবে না। সেইজন্যই ম্যাকফারলেনকে কাজে বহাল করলেন মি. স্কেটন।
স্কেটনের অনুমান ঠিক হয়েছিল কিনা জানতে হলে পরবর্তী ঘটনার বিবরণ জানা দরকার। সে-কথাই বলছি…
ম্যাকফারলেন যখন মি. স্কেটনের কাজে বহাল হল, তখন শীতের মাঝামাঝি। আবহাওয়া খুবই কষ্টকর। ক্যানাডা অঞ্চলে শীতকালে ঝড় হয়। ঝড়বৃষ্টির জন্য অনেক সময় সাময়িকভাবে কাজকর্ম বন্ধ রাখা হত। রাস্তা তৈরির কাজে যে লোকগুলো নিযুক্ত হয়েছিল তারা সেই সময় ভিড় করত ব্যায়ামাগারের মধ্যে। ব্যায়ামাগারটি তৈরি করে দিয়েছিলেন মি. স্কেটন দলের লোকদের জন্য। নানা ধরনের খেলা হত সেখানে। তবে দলের লোকদের কাছে সবচেয়ে প্রিয় খেলা ছিল বক্সিং বা মুষ্টিযুদ্ধ। স্কেটনের দলভুক্ত শ্রমিক ছাড়া অন্যান্য লোকজনও আসত মুষ্টিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে।
সেদিন রবিবার। ব্যায়ামাগারের মধ্যে মুষ্টিযুদ্ধের আসর জমছে না। লাল পোশাক গায়ে চড়িয়ে দস্তানা পরিহিত দুই হাত তুলে সগর্বে পদচারণা করছে একটি বলিষ্ঠ মানুষ এবং চারপাশে দণ্ডায়মান জনতার দিকে তাকিয়ে গর্বিত কণ্ঠে চ্যালেঞ্জ জানাচ্ছে বার বার। কিন্তু তার আহ্বানে সাড়া দিয়ে এগিয়ে আসছে না কোনো প্রতিযোগী–এর আগে যে কয়জন তার সামনে মোকাবেলা করতে এসেছিল তারা সবাই বেদম মার খেয়ে কাবু হয়ে পড়েছে।
লোকটি শুধু শক্তিশালী নয়, মুষ্টিযুদ্ধের কায়দাও সে ভালোভাবেই আয়ত্ত করেছে সে পাকা বক্সার।
আমি লড়তে রাজি আছি, জনতার ভিড় ঠেলে একটি দীর্ঘকায় মানুষ এগিয়ে এল, তার মাথার ওপর লটপট করছে রাশি রাশি আগুন রাঙা চুল আর ওষ্ঠাধরে মাখানো রয়েছে ক্ষীণ হাসির রেখা–ম্যাকফারলেন!
রক্তকেশী নবাগতকে সোল্লাসে অভ্যর্থনা জানাল সমবেত জনতা—
দস্তানা লাগাও। ওর হাতে মুষ্টিযুদ্ধের দস্তানা পরিয়ে দাও।
ম্যাকফারলেনের উন্মুক্ত পুরোবাহুর (forearm) দিকে দৃষ্টিপাত করলে মুষ্টিযোদ্ধা দড়ির মতো পাকানো মাংসপেশিগুলি তার একটুও ভালো লাগল না।
নীরস কণ্ঠে মুষ্টিবীর জানতে চাইল, ইয়ে–তুমি তুমি কি বলে–মানে, বক্সিং লড়তে জান তো?
না, জানি না, ম্যাকফারলেন উত্তর দিলে, তবে শিখতে দোষ কী? আজ থেকে তোমার কাছেই বক্সিং শিখব।
লড়াই শুরু হল। কিছুক্ষণের মধ্যেই সবাই বুঝল, ম্যাকফারলেন শক্তিশালী মানুষ বটে, কিন্তু মুষ্টিযুদ্ধে সে একেবারেই আনাড়ি। তার প্রতিদ্বন্দ্বীর বজ্রমুষ্টি তার মুখে ও দেহে আছড়ে পড়ল বারংবার কোনোরকমে দুই হাত দিয়ে আত্মরক্ষা করতে লাগল ম্যাকফারলেন। কয়েকটি মার সে বাঁচাল বটে কিন্তু পাকা মুষ্টিযোদ্ধার সব আঘাত সে আটকাতে পারল না। তার মুখের উপর দেহের উপর আছড়ে পড়তে লাগল ঘুসির পর ঘুসি।
জনতা ওই দৃশ্য আর সহ্য করতে পারছিল না, কয়েকজন চিৎকার করে উঠল, ওহে বোকারাম, হাত চালাও, শুধু শুধু দাঁড়িয়ে মার খাও কেন?
জনতার চিৎকারে কর্ণপাত করলে না ম্যাকফারলেন, অন্যান্য মুষ্টিযোদ্ধার মতো সরে গিয়ে আত্মরক্ষার চেষ্টাও সে করলে না, এক জায়গায় দাঁড়িয়ে সে দু-হাত দিয়ে ঘুসি আটকাতে লাগল এবং আঘাতের পর আঘাতে হয়ে উঠল জর্জরিত।
