ব্যাপারটা নিয়ে চিন্তা করতে করতে সাহেবের মনে হল নরঘাতিনী মেয়ে-প্যান্থারটাকে দেখেও পাখিটা ভয় পেয়ে থাকতে পারে। আগের রাতে ওই প্যান্থারটাই যে নিদ্রিত শিকারিদের আস্তানায় হানা দিতে এসেছিল সে-বিষয়ে সাহেবের সন্দেহ ছিল না কিছুমাত্র। জন্তুটার মনুষ্যজাতির ওপর যেরকম বিদ্বেষ, আজ রাতেও নিদ্রিত শিকারিদের উপর তার হামলার সম্ভাবনা আছে বলেই সাহেবের মনে হল। অগ্নিকুণ্ডের মধ্যে আরও একটা কাঠ তিনি ফেলে দিলেন, আলোটা জোর হলে নজর রাখার সুবিধা হবে। তারপর নদীর ধারে একটা মস্ত গাছের গুঁড়িতে ঠেস দিয়ে রাইফেল বাগিয়ে বসলেন।
পিছনে নদী, পৃষ্ঠরক্ষা করছে গাছের গুঁড়ি–অতএব পিছন থেকে আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা নেই। নিশ্চিন্ত হয়ে পাহারা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হলেন অ্যান্ডারসন…
রাত দুটো বাজল। তখন পর্যন্ত উল্লেখযোগ্য কিছু ঘটেনি। পিছন থেকে ভেসে আসছে নদীর কল্লোলধ্বনি। মাঝে মাঝে জলচর জীবের সশব্দ আলোড়ন… মাছ, অথবা কুমির হওয়াটাও বিচিত্র নয়। বিপরীত দিকে নদীকূল থেকে ভেসে এল রাতচরা সারসের বিষণ্ণ চিৎকার। তারার মালায় সাজানো অন্ধকার আকাশের পটে আরও অন্ধকার এক উড়ন্ত ছায়া কয়েক মুহূর্তের জন্য সাহেবের দৃষ্টিপথে ধরা দিয়ে অদৃশ্য হল। অন্ধকারেও ওই উড়ন্ত ছায়ার স্বরূপ নির্ণয় করতে ভুল করেননি শিকারি, ওটা হর্নড় আটল নামক অতিকায় পেঁচা। ওই পাখি রাতের শিকারি, অন্ধকারে খরগোশ ও অন্যান্য ছোটোখাটো জীবজন্তু মেরে খায়।
পেচক অন্তর্ধান করার পরেই কাঠের ওপর করাত চালানোর মতো একটা কর্কশ চাপা আওয়াজ সাহেবের কানে এল। জলকল্লোল ভেদ করে ওই অস্পষ্ট আওয়াজ আলাদা করে ধরার মতো শ্রবণশক্তি এবং ওই শব্দের তাৎপর্য উপলব্ধি করার মতো শিক্ষা সকলের নেই কিন্তু অভিজ্ঞ শিকারি কেনেথ অ্যান্ডারসন বুঝলেন শব্দটা এসেছে প্যান্থারের গলা থেকে! অর্থাৎ মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে উপস্থিত হয়েছে ঘাতিনী!
আবার, আবার সেই মৃদু অথচ ভীতিপ্রদ শব্দ। এবারে খুব কাছে। নিদ্রিত মানুষগুলোর পিছনেই একটা ঘন ঝোপ থেকে শব্দ এসেছে। আক্রমণের মুখে সাহস সঞ্চয় করার জন্যই জন্তুটা চাপা গলায় গর্জন করছে। এখনই সে আক্রমণ করবে সন্দেহ নেই। শ্বাপদের উদ্দেশ্য বুঝলেও সাহেব টর্চের বোম টিপলেন না। কারণ সামনের ঝোপটাকে একটা নিরেট অন্ধকারের ভ্রুপের মতো লাগছিল, প্যান্থারকে সাহেব তখনও দেখতে পাচ্ছিলেন না। যদি এই মুহূর্তে সে ঝোপের আড়ালে থাকে, তাহলে আলো জ্বাললেও সাহেব তাকে দেখতে পাবেন না কিন্তু জন্তুটা তাকে দেখেই চম্পট দেবে, তাকে গুলি করার আর সম্ভাবনা থাকবে না। সুতরাং সাহেব আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করতে চাইলেন।
কিন্তু প্যান্থার অপেক্ষা করতে রাজি হল না। আক্রমণের পূর্ব মুহূর্তে প্যান্থার যেরকম তীব্র ও ছোটো গর্জনে তার অস্তিত্ব জানিয়ে দেয়, ঠিক সেইভাবে গর্জন করে জন্তুটা একলাফে ঝোপ থেকে বেরিয়ে নিদ্রিত শিকারিদের কাছাকাছি এসে পড়ল। আর একটি লাফ দিলেই সে এসে পড়বে মানুষগুলোর ওপর।
ঠিক এই সুযোগের জন্যই অপেক্ষা করছিলেন সাহেব। টর্চের আলোকরেখা অন্ধকারকে বিদীর্ণ করে নির্দিষ্ট নিশানাকে সাহেবের দৃষ্টিগোচর করে দিল–নিক্ষিপ্ত আলোকে জ্বলে উঠল প্যান্থারের দুই চক্ষু!
হঠাৎ আলোর ঝলকানি লেগে জন্তুটা থমকে গেল, সাহেব রাইফেলের নিশানা স্থির করে ট্রিগার টিপতে উদ্যত হলেন
আচম্বিতে একটা প্রচণ্ড শব্দ! তারপরই আর একটা!
সঙ্গেসঙ্গে চিৎকার করে লাফিয়ে উঠল সাহেবের ছেলে ডন, জানিয়ে দিল বাবা গুলি ছোঁড়ার আগেই তার রাইফেল ঘাতিনীকে মৃত্যুশয্যায় শুইয়ে দিয়েছে।
জন্তুটা তখনও মরেনি। খুব ধীরে ধীরে সে শ্বাস টানছিল, তার শরীর কেঁপে কেঁপে উঠে প্রকাশ করছিল প্রাণশক্তির শেষ স্পন্দন।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যে সেই স্পন্দনও স্তব্ধ হয়ে যায়। মৃত্যুবরণ করল ঘাতিনী।
মা-প্যান্থারের মৃত্যুতে খুশি হননি সাহেব। তবে সমস্ত ব্যাপারটার মধ্যে ছেলের কৃতিত্ব তাকে মুগ্ধ করেছিল।
বাস্তবিক, ঘুম-জড়ানো চোখে অন্ধকারের মধ্যে অব্যর্থ সন্ধানে লক্ষ্য ভেদ করার ক্ষমতা কয়জনের থাকে?
[১৩৮৭]
টারজানের প্রতিদ্বন্দ্বী
হুঁ, তুমি! তোমার নাম ম্যাকফারলেন?
মুখ তুলে প্রশ্ন করলেন মি. স্কেটন।
তার সামনে যে অপরূপ মূর্তিটি দাঁড়িয়ে ছিল, তার চেহারাটা সত্যি দর্শনীয় বস্তু। রোগাও নয়, মোটাও নয়, লম্বা একহারা শরীর, মাথা ভরতি আগুনের মতো লাল টকটকে আঁকড়া চুল, চুলের নীচে একজোড়া জ্বলজ্বলে চোখ ছাড়া মুখের কোনো অংশ দৃষ্টিগোচর হয় না, কারণ চোখ দুটি ছাড়া লোকটির সমস্ত মুখের ওপর বাঁধা আছে পুরু কাপড়ের আস্তরণ বা ব্যান্ডেজ।
মি. স্কেটনের প্রশ্নের উত্তরে আগুন্তুক বললে, আজ্ঞে হ্যাঁ, আমার নাম ম্যাকফারলেন।
স্কেটন বললেন, তোমার কথা আমি শুনেছি। তুমি নাকি জেল খেটেছ? যাই হোক, ভালোভাবে যদি বাঁচতে চাও আমি তোমাকে সুযোগ দিতে পারি। হুঁ, আর একটা কথা–পাথর ভাঙার কাজ সম্পর্কে তোমার কোনো অভিজ্ঞতা আছে?
পুরু কাপড়ের তলা থেকে ভেসে এল অস্ফুট হাস্যধ্বনি, আজ্ঞে হ্যাঁ, পাথর ভাঙার কাজই তো করেছি।
ম্যাকফারলেন তার জামা গুটিয়ে ডান হাতখানা তুলে ধরলে মি. স্কেটনের সামনে মি. স্কেটন দেখলেন তার বাহু বেষ্টন করে ফুলে উঠেছে দড়ির মতো পাকানো মাংসপেশি!
