বাঘ একপাশে ঘুরল, তারপর আশ্চর্য কৌশলে দিক পরিবর্তন করে পিছন থেকে তেড়ে আসা কুকুরদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। শত্রুর এমন অভাবনীয় আচরণের সম্ভাবনা কুকুররা কল্পনা করতে পারেনি। সরে যাওয়ার আগেই বাঘের প্রচণ্ড দুই থাবা দুটো কুকুরকে মাটির উপর পেড়ে ফেলল। একটা আহত কুকুর তার বিদীর্ণ উদর নিয়ে অতিকষ্টে সরে যাওয়ার চেষ্টা করতেই বাঘ তার উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে দাঁত বসিয়ে দিল।
শত্রুপক্ষকে বাঘ প্রায় বিধ্বস্ত করে এনেছিল, কিন্তু আহত কুকুরটাকে কামড়াতে গিয়েই সে ভুল করল। মুহূর্তের মধ্যে অন্যান্য কুকুরগুলো তাকে পিছন থেকে ও দু-পাশ থেকে ছেকে ধরল এবং কামড়ের পর কামড় বসিয়ে শরীর থেকে মাংস তুলে নিতে লাগল।
বাঘের ঘন ঘন গর্জনে বন কাঁপতে লাগল, কিন্তু এখন তার গর্জনে ভয়ের আভাস ফুটে উঠল
বাঘ হাঁপাচ্ছে। তার নিশ্বাস পড়ছে দ্রুত। কুকুরের দল বিশ্রামে রাজি নয়। তারা নতুন উদ্যমে আক্রমণ শুরু করল চিৎকার করতে করতে। বাঘ আবার গর্জে উঠল কিন্তু তার গর্জনে তেমন জোর নেই। যুদ্ধের আগ্রহ তার কমে এসেছে। সে এখন দস্তুরমতো শঙ্কিত!
আচম্বিতে ব্যাঘ্র গর্জন আর সারমেয় কণ্ঠের ঐকতান ডুবিয়ে দিয়ে ভেসে এল এক নতুন শব্দের তরঙ্গ! দূর থেকে ভেসে আসছে বহু কুকুরের কণ্ঠস্বর–একদিক থেকে নয়, বিভিন্ন দিক থেকে এবং একইসঙ্গে!
সাহায্যের আশ্বাস! দলে দলে বুনো কুকুর ছুটে আসছে যুদ্ধে যোগদান করতে।
নাজেহাল বাঘ আর দাঁড়াল না। সভয়ে লেজ গুটিয়ে সে দৌড় দিল রণক্ষেত্র ত্যাগ করে। কুকুরগুলো নাছোড়বান্দা ক্লান্ত ও আহত দেহ নিয়েই তারা বাঘের অনুসরণ করল। দেখতে দেখতে সাহেবের চোখের আড়ালে অদৃশ্য হয়ে গেল পলাতক বাঘ আর অনুসরণকারী ছয়টি কুকুরের দল…
কিছুক্ষণ পরেই সাহায্যকারী কুকুরগুলো অকুস্থলে এসে পড়ল। প্রথমে পাঁচ, পরে আরও বারোটি কুকুর সেইখানে উপস্থিত হল। নিহত তিনটি কুকুরের দেহ থেকে ঘ্রাণ গ্রহণ করতে করতে নবাগত কুকুরের দল হঠাৎ ক্রোধে ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল, তারপর ছুটে চলল সেই পথে, যে-পথ দিয়ে পালিয়েছে বাঘ এবং তার অনুসরণকারী ছয়টি কুকুর।
সব মিলিয়ে এখন প্রায় চব্বিশটি কুকুর বাঘের পিছু নিয়েছে। সাহেব বুঝলেন বাঘের আর নিস্তার নেই। কুকুরের দল একসময় বাঘকে ধরে ফেলবেই ফেলবে, তারপর সকলে মিলে তাকে ছিঁড়ে টুকরো টুকরো করে ফেলবে। বাঘকে শেষ করে ফিরে এসে কুকুরগুলো হরিণটাকেও যে খেয়ে ফেলবে এ-বিষয়ে সন্দেহ নেই।
অ্যান্ডারসন তার আস্তানায় ফিরে এসে দেখলেন টাইনি ফিরে এসেছে। একটু পরে এসে পড়ল মারওয়ান। তারা কেউ কিছু দেখেনি বা শোনেনি। বেশ দেরি করে এল সাহেবের ছেলে ডন। সে একটা প্যান্থারের পায়ের ছাপ দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছিল। কিছুক্ষণ বনের পথে চলতে চলতে একটা গুহা তার চোখে পড়ে। গুহার মধ্যে প্যান্থর থাকতে পারে ভেবে সে কয়েকটা ঢিল ছুঁড়ে মারে। তার আশা ছিল ঢিল খেয়ে গুহার ভিতর থেকে বেরিয়ে আসতে পারে প্যান্থার। হ্যাঁ, বেরিয়ে এসেছিল বটে কিন্তু প্যান্থার নয়, এক ভল্লুকী! তার পিঠে ছিল দু-দুটো বাচ্চা! ভল্লুকী বাচ্চা নিয়ে অন্ধের মতো ছুটতে ছুটতে অরণ্যগর্ভে অদৃশ্য হল, ডনকে সে দেখতে পায়নি। ভাগ্যিস দেখেনি, মানুষ দেখলে হয়তো সে আক্রমণ করত আর আত্মরক্ষার জন্য অনিচ্ছাসত্ত্বেও তাকে গুলি করতে বাধ্য হত ডন।
ভল্লুক পরিবারের সঙ্গে প্যান্থারের সহাবস্থান অসম্ভব, অতএব অনুসন্ধানপর্বে ইস্তফা দিয়ে আস্তানায় ফিরে এসেছিল ডোনাল্ড ওরফে ডন।
বনের মধ্যে অ্যান্ডারসন সাহেবের অভিজ্ঞতার কাহিনি শুনে সবাই তো অবাক। বাঘ আর কুকুরের লড়াইয়ের ঘটনা সকলকেই আকৃষ্ট করল। আশ্চর্যের বিষয় হল যে, হাতিকে ভয় দেখানোর জন্যে সাহেবের গুলি ছোঁড়ার আওয়াজ কেউ শুনতে পায়নি।
রাতে শুতে যাওয়ার আগে আগুন জ্বালানোর ব্যবস্থা হল। ঠিক হল দু-ঘণ্টা পর পর পালা কবে সবাই পাহারা দেবে। চটপট রাতের খানা শেষ করে সকলে গল্পগুজব আরম্ভ করল। একসময় কথাবার্তা থেমে গেল, সকলের চোখে নামল তন্দ্রার আবেশ। পালা অনুসারে প্রথম দু-ঘণ্টা পাহারা দেবে থাংগুভেলু, তারপর মারওয়ান, তারপর অ্যান্ডারসন সাহেব স্বয়ং অ্যান্ডারসনের পরে যথাক্রমে ডোনাল্ড আর টাইনি।
ঘুমিয়ে পড়ার আগে অ্যান্ডারসন শুনতে পেলেন পাহাড়ের উপর থেকে ভেসে আসছে। বাঘের গর্জন। তার মনে হল যে-বাঘটিকে কুকুরের দল তাড়া করেছিল এবং শেষ পর্যন্ত নিশ্চয়ই হত্যা করেছিল, সেই নিহত বাঘের সঙ্গিনীই পাহাড়ের উপর গর্জন করে ফিরছে…
নির্দিষ্ট সময়ে সাহেবকে ঘুম থেকে তুলে মারওয়ান বলল, একটা প্যান্থারকে সে শিকারিদের আস্তানার পিছনে পাহাড়টার উপর থেকে ডাকতে শুনেছে। আওয়াজ আসছিল অনেক দূর থেকে। হ্যাঁ, আরও একটা কথা তার মনে পড়ছে–একটা পাখি, সম্ভবত বনমোরগ, শিকারিদের শয্যার খুব কাছ থেকে হঠাৎ চিৎকার করতে করতে পাখা ঝটপটিয়ে উড়ে গেছে। ব্যাপাটা এত তুচ্ছ যে, সে ঘটনাটার কথা উল্লেখ করতে ভুলে গিয়েছিল।
মারওয়ান শুয়ে পড়ল। অ্যান্ডারসন তাকে কিছু বললেন না, কিন্তু বনমোরগের ব্যাপারটা তার কাছে আদৌ তুচ্ছ মনে হয়নি। পাখিটা হঠাৎ চিৎকার করে অন্ধকারের মধ্যে উড়ে গেল কেন? সে নিশ্চয়ই দিনের আলো থাকতে থাকতে রাতের নিরাপদ আশ্রয় হিসাবে ওই জায়গাটাকে বেছে। নিয়েছিল। কোনো বিপদের সম্ভাবনা না-থাকলে পাখিটা রাতের অন্ধকারে অনিশ্চিত আশ্রয়ের জন্য অন্ধের মতো স্থানত্যাগ করে ছোটাছুটি করবে না। এই বিপদটা হয়তো শিকার-সন্ধানী পাইথন, বনবিড়াল বা ভাম হতে পারে এমনকী ক্ষুধার্ত কোনো প্যান্থারের উপস্থিতি অসম্ভব নয়। হরিণ, শুয়োর প্রভৃতি জানোয়ার প্যান্থারের প্রিয় খাদ্য হলেও পক্ষিমাংসে তার অরুচি নেই।
