অ্যান্ডারসন এতক্ষণ চুপ করে ছিলেন, এবার বললেন, আচ্ছা, তোমরা বলতে পারো এই এলাকায় কোনো মানুষখেকো প্যান্থার আছে কি না?
বেশ কিছুক্ষণ সকলে স্তব্ধ। তারপর একজন মৃদুস্বরে বলল, হ্যাঁ, ভোরাই, আছে। জন্তুটা অনেক মানুষ মেরেছে। আমাদের দলেই কালু নামে একটি লোক তার কবলে মারা গেছে। কয়েকদিন আগে। আমরা তাই দিনের বেলায় মাছ ধরছি। আমরা চাঁদনি রাতেই মাছ ধরি। কিন্তু এখন সন্ধ্যার পর কেউ ঘরের বাইরে যেতে সাহস পায় না।
লোকটির কথা শুনে সাহেবের ছেলে ডন দারুণ উত্তেজিত হয়ে উঠল, চুলোয় যাক মাছ। আমরা তোমাদের কোনো ক্ষতি করব না। আমাদের কাছে এই প্যান্থার সম্পর্কে সব কিছু খুলে বলো। আমরা শিকারি, জন্তুটাকে গুলি করে মারতে চেষ্টা করব।
লোকগুলো আশ্বস্ত হয়ে তীরে নামল। তারপর তাদের মুখ থেকে সাহেব এবং তার সঙ্গীরা প্যান্থারটির সম্পর্কে সব কিছু শুনলেন। সেসব কথা আগেই সবিস্তারে বলা হয়েছে, তাই এখানে আর পুনরাবৃত্তি করলাম না।
ঘটনার বিবরণ শুনে শিকারিদের সহানুভূতির সঞ্চার হল মা-প্যান্থারের উপর। বন্য শ্বাপদের এমন প্রতিহিংসা গ্রহণের প্রবৃত্তি বড়ো একটা হয় না। ব্যাঘ্র জাতীয় পশুরা অনেক সময় মানুষের অস্ত্রে আহত হলে নরভুক হয়, কিন্তু তার কারণ স্বতন্ত্র। আহত অবস্থায় দ্রুতগামী বলিষ্ঠ বন্য পশুদের হত্যা করতে অসমর্থ হয়ে বাঘ অথবা প্যান্থার মানুষের মতো দুর্বল শিকারের প্রতি আকৃষ্ট হয়। সেখানে প্রতিশোধ গ্রহণের মনোভাব থাকে না, অতি সহজে ক্ষুধা নিবারণের জন্যই তারা নরখাদকে পরিণত হয়।
কিন্তু এই মেয়ে-প্যান্থারটি মানুষকে হত্যা করে, মাংস খায় না। শুধু প্রতিশোধ নেওয়ার জন্যই সমগ্র মনুষ্যজাতির বিরুদ্ধে সে জেহাদ ঘোষণা করেছে! এমন ঘটনার কথা বড়ো একটা শোনা যায় না।
যাই হোক, মা-প্যান্থারের প্রতি সহানুভূতি থাকলেও শিকারিরা তাকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নিলেন। জন্তুটা বেঁচে থাকলে বহু নিরপরাধ মানুষ তার কবলে মারা পড়বে। অতএব মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক ওই পশুকে হত্যা করাই শিকারির কর্তব্য বলে সকলে মনে করলেন।
শিকারিরা বড়ো জানোয়ার মারতে আসেননি, এসেছিলেন মাছ ধরতে। তবে মাছ ধরার সাজসরঞ্জাম ছাড়াও তাদের সঙ্গে দুটি রাইফেল আর দুটি শটগান ছিল। পরামর্শের ফলে স্থির হল টাইনি শটগান নিয়ে নদীর স্রোত অনুসরণ করে নদীতীর ধরে হাঁটবে ঘণ্টা দুই, তারপর ফিরে আসবে শিকারিদের আস্তানায়। মারওয়ান আর একটি শটগান নিয়ে নদীস্রোতের বিপরীত দিকে নদীতীরেই অনুসন্ধান করবে। অ্যান্ডারসন ও তার ছেলে ডন প্যান্থারের সন্ধান করবেন ভিন্ন ভিন্ন দিকে জঙ্গলের মধ্যে, তাদের হাতে থাকবে রাইফেল। থাংগুভেলু একটা গাছে উঠে জিপগাড়ি আর ছড়িয়ে-থাকা সরঞ্জামের উপর নজর রাখবে। স্থির হল, প্রত্যেকেই আস্তানায় ফিরবে বিকাল ৫টার মধ্যে।
ব্যাপারটা অবশ্য খুবই বিপজ্জনক। নদীর ধারে ঝোপঝাড় ও জঙ্গলের মধ্যে লুকিয়ে থেকে প্যান্থার খুব সহজেই শিকারির গতিবিধি লক্ষ করতে পারবে, কিন্তু শিকারির পক্ষে উদ্ভিদের আবরণ ভেদ করে জন্তুটার অস্তিত্ব আবিষ্কার করা সম্ভব নয়। জন্তুটা নরহত্যা করতে উগ্রীব, প্রথম আক্রমণের সময়েই তাকে গুলি চালিয়ে বোড়ে ফেলতে না-পারলে শিকারি নিজেই শিকারে পরিণত হবে সন্দেহ নেই। দলের প্রত্যেকেই বিভিন্ন দিকে ছড়িয়ে থাকবে, অর্থাৎ নিজেরাই টোপ হয়ে শ্বাপদকে আকৃষ্ট করবে–অতর্কিত আক্রমণের ফলে বিপন্ন সঙ্গীকে সাহায্যের সুযোগ অন্য শিকারিরা পাবে না, তাই প্রত্যেক শিকারিকেই নির্ভর করতে হবে নিজের ক্ষমতার উপর। ভুল হলে মৃত্যু নিশ্চিত।
আগের রাতে একটা শম্বর হরিণের চিৎকার শুনেছিলেন অ্যান্ডারসন সাহেব। হরিণজাতীয় পশু অনেক সময় মাংসাশী শ্বাপদের অস্তিত্ব বুঝতে পারলে চিৎকার করে বনের অন্যান্য বাসিন্দাদের সাবধান করে দেয়। অতএব যেদিক থেকে বিগত রাত্রে শম্বর হরিণের চিৎকার সাহেবের কানে ভেসে এসেছিল, সেইদিকেই তিনি যাত্রা করলেন প্যান্থারের সন্ধানে।
পার্বত্য পথ বেয়ে এগিয়ে চললেন সাহেব। চারদিকে ছড়ানো বড়ো বড়ো পাথর, ঘন ঝোপঝাড়। ওই পাথর বা ঝোপের আড়ালে প্যান্থার লুকিয়ে থাকতে পারে অনায়াসে। কিছুদূর যাওয়ার পর ছেলে ডন এবং তার সঙ্গীদের নিরাপত্তা সম্পর্কে চিন্তিত হয়ে পড়লেন অ্যান্ডারসন। কিন্তু এখন আর কিছু করার নেই, তিনি আশা করলেন তারাও তাঁর মতোই সতর্কতা অবলম্বন করবে।
চারদিক নিস্তব্ধ। অসহ্য গরম। পাখিদের কলকণ্ঠ সম্পূর্ণ নীরব। চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি নিক্ষেপ করতে করতে অগ্রসর হলেন সাহেব। সামনে বড়ো পাথর বা ঝোপঝাড় দেখলে তীক্ষ্ণদৃষ্টিতে সেদিকে তাকিয়ে কাছে আসছিলেন সাহেব, তবে তিনি জানতেন পিছন থেকেই বিপদের ভয় বেশি–কারণ, বাঘ অথবা প্যান্থার মানুষ মারতে অভ্যস্ত হলেও মানুষকে ভয় পায় এবং সেইজন্যই অধিকাংশ সময়ে তারা মানুষকে পিছন থেকে আক্রমণ করে। অতএব সাহেবকে ক্রমাগত থামতে হচ্ছিল, কখনো সামনে কখনো পিছনে তাকাতে তাকাতে খুব ধীরে ধীরে তিনি অগ্রসর হচ্ছিলেন। বাতাসের ধাক্কায় আন্দোলিত উদ্ভিদ এবং বৃক্ষশাখার মর্মরধ্বনি শুনে মাঝে মাঝে প্যান্থারের অস্তিত্ব কল্পনা করে রাইফেল তুলে ধরেন তিনি, একটু পরেই নিজের ভুল বুঝতে পেরে আবার অস্ত্র নামিয়ে পদচারণা করেন–এইভাবে কিছুক্ষণ চলার পর অ্যান্ডারসন বুঝলেন তার স্নায়ু দুর্বল হয়ে পড়ছে, একেবারে অনভিজ্ঞ নতুন শিকারির মতো আচরণ করছেন তিনি।
