এইবার তিনি বেপরোয়া হয়ে উঠলেন, নিশ্চিন্ত মনে এগিয়ে চললেন সামনে। আরও কিছুক্ষণ কাটল। কিছু ঘটল না। সাহেব মনে করলেন মাছ চোর প্যান্থারের ব্যাপারটা বাড়িয়ে বলেছে। নরঘাতিনী মেয়ে-প্যান্থারের অস্তিত্ব সম্পর্কে তিনি সন্দিহান হয়ে উঠলেন।
একটা পাহাড়ি পথ বেয়ে উঠছিলেন অ্যান্ডারসন। একটু পরেই পাহাড়ের উপর উঠে তিনি নামতে শুরু করলেন ঘন বাঁশবনে ঘেরা একটি উপত্যকার দিকে…
কিছুদূর অগ্রসর হওয়ার পর গাছের পাতা ঘর্ষণের শব্দ সাহেবের কানে এল, পরক্ষণেই গাছের ডাল ভাঙার আওয়াজ! শব্দের কারণ বুঝতে শিকারির কান ভুল করল না–গাছের পাতা আর ডালপালা দিয়ে উদর পূরণ করছে হাতি!
অ্যান্ডারসন থেমে গেলেন, যেদিক থেকে শব্দ আসছে সেইদিকে দৃষ্টিনিক্ষেপ করলেন। ব্যাপারটা জটিল হয়ে দাঁড়িয়েছে। হাতি যদি একক হয়, তাহলে কাছাকাছি মানুষ দেখলে আক্রমণ করতে পারে। একক হস্তী অধিকাংশ সময়ে দলছাড়া গুন্ডা হয়, মানুষ বা অন্য জন্তু দেখলে সে হত্যা করতে চায়। হাতির দল থাকলে বিশেষ ভয় নেই, মানুষ দেখলে তাদের সরে যাওয়ার সম্ভাবনাই বেশি। শব্দ যেদিক থেকে আসছে, সাহেবের চলার পথটা গেছে সেইদিকেই। হাতিকে এড়াতে হলে ঘন বাঁশঝোপ আর কাটাবনে ঢুকতে হয়, আর সে-রকম জায়গায় ক্রুদ্ধ পান্থার বা হাতির সম্মুখীন হলে শিকারির সমূহ বিপদ–তাই সোজা রাস্তা ধরেই এগিয়ে চললেন সাহেব।
সাহেবের পিছন দিক থেকে জোর হাওয়া আসছিল। সামনে গাছের ডালপালা ভাঙার আওয়াজ হঠাৎ থেমে গেল। সাহেব কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলেন। চারদিক স্তব্ধ। অর্থাৎ হাতিও বাতাসে গন্ধ পেয়ে আহারে ক্ষান্ত হয়েছে। এখন হয় সে নিঃশব্দে সরে গেছে, অথবা মানুষটাকে চাক্ষুষ দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।
এই প্রকাণ্ড জন্তুগুলো নিঃশব্দে চলাফেরা করতে পারে, কিন্তু জঙ্গল সেখানে এমন ঘন যে, সেই নিবিড় উদ্ভিদের আবরণের ভিতর দিয়ে চলতে গেলে সামান্য একটু শব্দ হবেই হবে–সাধারণ মানুষের কান সেই তুচ্ছ শব্দের কারণ ধরতে না-পারলেও অভিজ্ঞ শিকারি সেই শব্দ থেকেই গজরাজের চলাচেলের সংবাদ জানতে পারবেন। কোনো শব্দ কানে না-আসায় সাহেব বুঝলেন হাতি স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে তার জন্য অপেক্ষা করছে। বাতাস নিশ্চয়ই তার কাছে নিকটবর্তী মানুষের সংবাদ পৌঁছে দিয়েছে হাতির ঘ্রাণশক্তি অতিশয় প্রবল।
আরও দশ মিনিট চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলেন সাহেব। হাতি নড়ল না। বোধ হয় ভাবছিল দু-পেয়ে আপদটা বিদায় না-হওয়া পর্যন্ত নিঃশব্দে অপেক্ষা করাই ভালো।
অবশেষে সাহেবের ধৈর্যচ্যুতি ঘটল। হাতিটাকে ভয় দেখানোর জন্য জোরে শিস দিতে দিতে তিনি সামনে এগিয়ে চললেন সামনের পথ ধরে। ফল হল তৎক্ষণাৎ। অবশ্য সাহেব যা আশা করেছিলেন তা হল না–হাতি স্থানত্যাগ করল বটে, কিন্তু পিছন ফিরে পালাল না, ক্রোধে চিৎকার করতে করতে ছুটে এল সাহেবের দিকে! ঘন জঙ্গল ভেদ করে মুহূর্তের মধ্যে আত্মপ্রকাশ করল একটা প্রকাণ্ড মাথা আর হত্যার আগ্রহে উদ্যত একজোড়া সুদীর্ঘ গজদন্ত!
মহা মুশকিল! ওই এলাকায় কোনো গুন্ডা হাতির অস্তিত্ব সরকার থেকে ঘোষণা করা হয়নি। জন্তুটাকে গুলি করে মারলে বন বিভাগ অ্যান্ডারসনকে নিয়ে টানাটানি করবে আর তার ফলে সাহেবের দুর্গতির সীমা থাকবে না। দৌড়ে পালাতে গেলে মৃত্যু অনিবার্য, কারণ ক্রুদ্ধ হস্তী তাহলে নির্ঘাত সাহেবকে অনুসরণ করে ধরে ফেলবে এবং হত্যা করবে–দৌড়ের প্রতিযোগিতায় মানুষের পক্ষে হাতিকে হারিয়ে দেওয়া সম্ভব নয়। অবশ্য গুলি চালিয়ে হাতির হাঁটু ভেঙে দিয়ে পরিত্রাণ পাওয়া যায়, কিন্তু তাহলে জন্তুটা দিনের পর দিন অসহ্য যন্ত্রণা ভোগ করবে–অনর্থক জানোয়ারকে কষ্ট দিতে ইচ্ছুক ছিলেন না অ্যান্ডারসন সাহেব।
হ্যাঁ, আর একটা উপায় আছে, আর সেই উপায়ই অবলম্বন করলেন সাহেব। শূন্যে রাইফেল তুলে আওয়াজ করতেই হাতি চমকে থেমে গেল। তার পায়ের ধাক্কায় রাশি রাশি ঝরাপাতা আর ধুলোর ঝড় উড়ল চারদিকে। সাহেব সামনে এগিয়ে এসে আবার রাইফেলের আওয়াজ করলেন।
এইবার গজরাজ ভয় পেল। ক্রুদ্ধ বৃংহন-ধ্বনির পরিবর্তে তার কণ্ঠে জাগল ভয়ার্ত চিৎকার। ছোট্ট বেঁটে লেজটা পিছনের দুই পায়ের ফাঁকে গুটিয়ে সে দ্রুতবেগে পলায়ন করল।
সব দিক রক্ষা পাওয়ায় খুশি হলেন সাহেব। হাতি বাঁচল, তিনিও বাঁচলেন। কিন্তু নিজের উপর তিনি বিরক্ত। চুপচাপ আরও কিছুক্ষণ অপেক্ষা করলে হাতিটা নিশ্চয়ই চলে যেত। রাইফেলের আওয়াজ শুনে খুনি প্যান্থার আর এদিকে আসবে না। মাত্র আধঘণ্টা হল তিনি আস্তানা ছেড়ে বনের মধ্যে এসেছেন, এখন আর এগিয়ে যাওয়া উচিত হবে কি? প্যান্থারের সাক্ষাৎ আজ পাওয়া যাবে বলে মনে হয় না। কিছুক্ষণ চিন্তার পর সাহেব আবার অগ্রসর হলেন। অন্তত মিনিট দশের মধ্যে প্যান্থার, হাতি বা অন্য কোনো হিংস্র জানোয়ারের দেখা পাওয়ার সম্ভাবনা নেই; রাইফেলের শব্দে কাছাকাছি যেসব পশু ছিল, তারা নির্ঘাত দূরে সরে পড়েছে। পদে পদে চারদিকে নজর রাখার দরকার আর ছিল না, তাই খুব কম সময়ের মধ্যেই ঘন বাঁশবন পেরিয়ে একটা ফাঁকা জায়গায় তিনি পৌঁছে গেলেন। এখানে রয়েছে বাবুল, বোরাম, ছোটো ছোটো তেঁতুল গাছ এবং মাটির ওপর বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে লম্বা লম্বা ঘাস আর ঘাস। পায়ে চলা যে-পথ ধরে সাহেব এগিয়ে চলছিলেন, সেই পথটা বিস্তীর্ণ ঘাসের সমুদ্রে হারিয়ে গেছে, তার পরিবর্তে এখানে-ওখানে তৃণাবৃত প্রান্তর ভেদ করে আত্মপ্রকাশ করেছে আরও অনেকগুলো ছোটো ছোটো পায়ে-চলা পথ। হরিণদের পায়ে পায়ে ওই পথগুলোর সৃষ্টি হয়েছে। জায়গাটা পরীক্ষা করে অ্যান্ডারসন বুঝলেন তিনি হরিণদের প্রিয় বাসভূমিতে এসে পড়েছেন। মাংসাশী পশুর প্রিয় খাদ্য হচ্ছে হরিণ–সুতরাং সাহেবের আশা হল এইখানে খুনি প্যান্থার হয়তো হানা দিতে পারে।
