এই সময়ে নিতান্তই ঘটনাচক্রে একটি জিপগাড়ি চড়ে অকুস্থলে এসে পড়লেন বিখ্যাত শিকারি কেনেথ অ্যান্ডারসন। প্যান্থারের উপদ্রবের বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না, তিনি এসেছিলেন মাছ ধরতে। সঙ্গে ছিল তার ছেলে ডোনাল্ড ওরফে ডন, ডনের বন্ধু মারওয়ান, সেডন টাইনি নামে এক ওস্তাদ মাছ-শিকারি এবং থাংগুভেলু নামে এক স্থানীয় ব্যক্তি–যে একাধারে শিকার, গাড়ি পরিষ্কার, রন্ধন, পরিবেশন প্রভৃতি সর্ব বিষয়ে সর্ব বিদ্যা বিশারদ।
বাঙ্গালোরে অবস্থিত অ্যান্ডারসন সাহেবের বাড়ি থেকে পাক্কা নিরানব্বই মাইল দূরে কাবেরী নদীর ধারে যেখানে তাদের আস্তানা ফেলা হল, সেই জায়গাটা তালাইনভু গ্রাম থেকে দশ মাইল দূরে। ওইখানেই মাছ ধরা হবে বলে স্থির হল।
রাতের খাওয়া শেষ করে সকলে বনের মধ্যে একটা জায়গা পরিষ্কার করে শুয়ে পড়ল।
ওই অঞ্চলে যে একটি নরঘাতক প্যান্থারের আবির্ভাব হয়েছে সে-কথা আগন্তুকরা জানতেন না, অতএব কারো মনে দুশ্চিন্তা ছিল না। তবে একটা বিপদের সম্ভাবনা ছিল–হাতি। তাই সারা রাত অগ্নিকুণ্ড জ্বালিয়ে রাখার ব্যবস্থা হল। কিছুক্ষণ গল্প করার পর সকলেই ঘুমিয়ে পড়ল…
হঠাৎ অ্যান্ডারসন সাহেবের ঘুম ভেঙে গেল। তিনি ঘড়ি দেখলেন। তিনটে বেজে কয়েক মিনিট হয়েছে। আগুন প্রায় নিবে এসেছে, অন্ধকার ভেদ করে জ্বলছে কয়েক টুকরো জ্বলন্ত কাঠ। আগুনটাকে সারারাত জ্বালিয়ে রাখার দায়িত্ব যার ছিল, সেই থাংগুভেলু গভীর নিদ্রায় মগ্ন। সাহেবের বাঁ-দিকে তার ছেলে ডোনাল্ড নাক ডাকিয়ে ঘুমাচ্ছে। ডান দিকে মারওয়ান আর টাইনি রাতের শিশির এবং মশার আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করার জন্য মাথা-মুখ চাদর ঢাকা দিয়ে ঘুমাচ্ছে।
অ্যান্ডারসন ভাবতে লাগলেন হঠাৎ তার ঘুম ভেঙে গেল কেন? জঙ্গলের ভিতর থেকে কোনো সন্দেহজনক শব্দ ভেসে আসছে কি… কিন্তু ছেলে ডোনাল্ডের প্রচণ্ড নাসিকাগৰ্জন ছাড়া আর কিছুই তিনি শুনতে পেলেন না…
হঠাৎ তিনি জানতে পারলেন তার ঘুম ভাঙার কারণ। খুব কাছেই জেগে উঠল করাত চালানোর মতো খসখসে শ্বাপদ কণ্ঠের আওয়াজ হা-আঃ! হা-আঃ! হা-আঃ! ক্ষুধিত প্যান্থারের কণ্ঠস্বর!
সাহেব বুঝলেন নিদ্রিত অবস্থায় তার মগ্নচৈতন্য ওই শব্দে সাড়া দিয়েছে, আর সেইজন্যই তাঁর ঘুম ভেঙে গেছে।
অ্যান্ডারসন ভয় পেলেন না। শিকারি জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি জানতেন প্যান্থার মানুষের পক্ষে বিপজ্জনক নয়। প্যান্থার মানুষের সান্নিধ্য এড়িয়ে চলে। অবশ্য আহত হলে বা কোনো কারণবশত নরমাংসের প্রতি আকৃষ্ট হলে ভয়ের কথা বটে। তবে নরখাদক প্যান্থার অতিশয় বিরল। মা-প্যান্থারের কাহিনি তখন পর্যন্ত জানতেন না, তাই প্যান্থারের আক্রমণের সম্ভাবনা তাকে উদবিগ্ন করেনি।
আবার জাগল শ্বাপদ কণ্ঠে অবরুদ্ধ গর্জন ধ্বনি। সাহেব শব্দ লক্ষ করে টর্চের আলো ফেললেন। জন্তুটাকে এবার স্পষ্ট দেখা গেল। নিদ্রিত থাংগুভেলুর থেকে মাত্র কয়েক ফুট দূরে মাটির ওপর গুঁড়ি মেরে বসে রয়েছে শ্বাপদ। বসার ভঙ্গি দেখে স্পষ্টই বোঝা যায় সে থাংগুভেলুর উপর লাফিয়ে পড়ার উপক্রম করছে।
সাহেব রাইফেলের দিকে হাত বাড়ালেন। অস্ত্রটাতে গুলি ভরে পাশেই রেখে দিয়েছিলেন তিনি। কিন্তু রাইফেল বাগিয়ে ধরার আগেই হঠাৎ থাংগুভেলু ঘুমের ঘোরে উঠে বসল। তার পায়ের কাছে ছিল জলভরা ডেকচি, পায়ের ধাক্কা লেগে পাত্রটা সশব্দে নড়ে উঠল। সঙ্গেসঙ্গে জন্তুটা একলাফে অদৃশ্য হল অন্ধকার অরণ্যের গর্ভে। থাংগুভেলু অবশ্য ততক্ষণে আবার শুয়ে পড়ে গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়েছে।
অ্যান্ডারসন এইবার হইহই করে সকলকে ডেকে তুললেন এবং প্যান্থারের উপস্থিতির কথা বললেন। কেউ তার কথা বিশ্বাস করতে চাইল না। প্রত্যেকেরই বিশ্বাস তিনি ঘুমের ঘোরে দুঃস্বপ্ন দেখেছেন।
অ্যান্ডারসনকে একটু ঠাট্টা-বিদ্রূপ করে সকলেই আবার নিদ্রাদেবীর আরাধনায় মন দিল। সাহেবের আর ঘুম এল না। বাকি রাতটা তিনি রাইফেল হাতে জেগে রইলেন। তাঁর দৃঢ় বিশ্বাস একটা মানুষখেকো প্যান্থারকেই তিনি দেখেছেন–জন্তুটা থাংগুভেলুকে আক্রমণের উদ্যোগ করছিল।
পরের দিন মাছ ধরার পালা। টাইনি কয়েকটা মাছ ধরল। অ্যান্ডারসন আর তার ছেলে ডোনাল্ড ওরফে ডন অনেকক্ষণ চেষ্টা করলেন, কিন্তু তাদের ছিপে একটিও মাছ উঠল না। মারওয়ান বলল সে স্নান করতে যাচ্ছে। স্নানের ফলে যাতে মাছ ধরার বিঘ্ন না হয়, সেইজন্য যেখানে মাছ ধরা হচ্ছিল তার থেকে একটু দূরে, নদীস্রোত যেদিক থেকে আসছে, সেইদিকে চলল মারওয়ান কাঁধে একটি তোয়ালে নিয়ে।
অন্য কেউ বিশ্বাস করুক আর না-ই করুক, গতরাত্রে প্যান্থারের উপস্থিতি সম্পর্কে অ্যান্ডারসন সাহেবের কিছুমাত্র সন্দেহ ছিল না এবং সেটা যে নরখাদক এ-বিষয়েও তিনি ছিলেন নিশ্চিত, অতএব তিনি মারওয়ানকে ডেকে বললেন, দাঁড়াও, আমিও আসছি।
হাতে রাইফেল আর কাঁধে রাইফেল নিয়ে মারওয়ানকে অনুসরণ করলেন কেনেথ অ্যান্ডারসন।
সেদিন বিকালের দিকে নদীর জলে বোমা ফাটার আওয়াজ শুনে অ্যান্ডারসন সাহেব ও তার দলবল শব্দ লক্ষ করে ছুটলেন। নদীর বাঁক ঘুরতেই মাছ চোরদের দুটি ডিঙি তারা দেখতে পেলেন। একটা ডিঙিতৈ মাছ বোঝাই, আর একটাতে কয়েকজন লোক অর্থাৎ চোরের দল। সাহেবদের দেখে চোররা ঘাবড়ে গেল, তাড়াতাড়ি দাঁড় বেয়ে তারা চম্পট দেওয়ার উপক্রম করল। কিন্তু অ্যান্ডারসনের সঙ্গীরা তাদের পালাতে দিল না, বন্দুক উঁচিয়ে ভয় দেখিয়ে তাদের তীরে ডিঙি ভেড়াতে বাধ্য করা হল। তারপর শুরু হল বাগযুদ্ধ। সাহেবের ছেলে ডন তাদের চৌর্যবৃত্তির জন্য তিরস্কার করল। চোরদের বক্তব্য হচ্ছে, মাছগুলো যখন কারো ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়, তখন মাছ ধরায় দোষ কী? সাহেবরাই-বা তাদের ব্যাপারে নাক গলাচ্ছেন কোন অধিকারে? তারা কি সরকারের লোক? থাংগুভেলু এইসব আইনঘটিত প্রসঙ্গে যোগ দিল না, তার বক্তব্য হচ্ছে সবচেয়ে ভালো মাছ দুটি তাদের দিয়ে চোররা যেখানে খুশি যাক, তাদের গন্তব্য বিষয় নিয়ে শিকারিদের মাথা ঘামানোর দরকার নেই।
