এই মাছ চুরির জন্য দুটি ডিঙি নৌকা ব্যবহার করা হয়। একটি ডিঙি থেকে বোমা ছোঁড়া হয়, আর একটি শুধু মাছ বোঝাই করার জন্য থাকে। মাছের ভারে ডিঙি যতক্ষণ ডুবে যাওয়ার উপক্রম না করে, ততক্ষণ পর্যন্ত চোররা মাছ ধরে যায়। জোয়ালের জলে মাইল পাঁচেক ডিঙি ভাসিয়ে একসময়ে তারা ডিঙি থামায়, তারপর মাছগুলোকে থলিতে ভরে রাখে। প্রত্যেক চোর একটা করে থলি বহন করে। ডিঙি দুটোকে উলটো করে ফেলে এক-একটা ডিঙি দুজন করে মানুষ মাথায় তুলে হাঁটতে থাকে সেইদিকে, যেখান থেকে তারা প্রথম ডিঙি ভাসিয়েছিল।
নদীতে জোয়ারের জল ঠেলে ওই গোলাকার চামড়ায় ঢাকা ডিঙি নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়, তাই এই পরিশ্রম। হালকা দাঁড়গুলো অবশ্য সমস্যা নয়। হাতে হাতে সেগুলো সবাই নিয়ে যায়। অমাপক্ষ হলে চোররা বিশ্রাম নেয়। আবার শুক্লপক্ষের আবির্ভাবে তাদের কাজকর্ম শুরু।
সেই রাতটাও ছিল শুক্লপক্ষের চাঁদনি রাত। একদল চোর চুরি করতে বেরিয়েছিল। ক্রমাগত বোমা মেরে মাছ তুলে তারা ডিঙি বোঝাই করছিল। মাছ বোঝাই করার ডিঙিতে ছিল মাত্র একটি লোক। কারণ, লোক কম হলে সংখ্যায় বেশি মাছ রাখা যায়। প্রায় মাঝরাত পর্যন্ত মাছ ধরার পর যে ডিঙি থেকে বোমা ছোঁড়া হচ্ছিল, সেই ডিঙির লোকরা হাঁক দিয়ে মাছ-বোঝাই ডিঙির মালিককে বলল, অনেক হয়েছে, এবার ডাঙায় ভেড়াও। কিছু খাওয়া দরকার।
মাছ-বোঝাই ডিঙির নিঃসঙ্গ লোকটি খুশি হল, সে সতর্কভাবে খরস্রোতা নদী বেয়ে ধীরে ধীরে ডিঙিটাকে পাড়ে নিয়ে এল। ডিঙির তলায় বাঁশের সঙ্গে যে-দড়ি বাঁধা থাকে, সেইটা নিয়ে লোকটা একলাফে পাড়ে উঠল। একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে দড়িটাকে বেঁধে ডিঙিটাকে সে দাঁড় করাতে চেয়েছিল। কিন্তু তার সেই উদ্দেশ্য সফল হল না। দুই নম্বর ডিঙি থেকে তার বন্ধুরা দেখল একটা দীর্ঘ ধূসর বস্তু নদীর তীরবর্তী ঝোপ থেকে লাফিয়ে পড়ল। তাদের কানে এল একটা চাপা গর্জন, পরক্ষণেই তারা দেখল তাদের সঙ্গীটি মাটিতে পড়ে যাচ্ছে এবং তার দেহের উপর রয়েছে সেই ধূসর বস্তু!
একটা কান-ফাটানো আর্ত চিৎকার–সঙ্গেসঙ্গে চোরের দল দেখল মাছভরতি ডিঙিটা খরস্রোতা নদীর জলে ছুটে চলেছে এবং তাদের সঙ্গীর হাত থেকে খসে পড়ে মোটা দড়িটাও ছুটছে ডিঙির সঙ্গে!
বোমা ছোঁড়ার ভূমিকায় যে-ডিঙিটা ছিল, সেই ডিঙির মাঝি প্রাণপণে দাঁড় চালিয়ে মাছভরতি ভেসে-যাওয়া ডিঙিটাকে ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু তার ডিঙিতে অনেক লোক ছিল বলে সেটা ছিল বেজায় ভারী, তাই মাঝির চেষ্টা সফল হল না। ভেসে-যাওয়া ডিঙিটা মাঝনদীতে ছিটকে এসে কয়েকটা পাথরে ধাক্কা খেয়ে উলটে গেল। সঙ্গেসঙ্গে এত কষ্টে ধরা মাছগুলো অদৃশ্য হল নদীগর্ভে। নিতান্ত দুঃখের সঙ্গে সেই মর্মান্তিক দৃশ্য দেখল চোরের দল, তারপর তারা তীরের দিকে তাদের ডিঙিটাকে ফেরাল। যে হাঁদা লোকটা হাতের দড়ি ধরে রাখতে পারে না, তাকে এবার আচ্ছা করে ঠেঙানি দিতে হবে এই হল তাদের মনোগত বাসনা। মাছ তো গেলই, ডিঙিটাও গেল ওই ধরনের একটা ডিঙি জোগাড় করতে তাদের অন্তত এক-শো টাকা খরচ হবে, তা ছাড়া মাছের দাম তো আছেই। নির্বোধ সঙ্গীকে বেশ ভালোরকম প্রহার করার সংকল্প নিয়েই তীরে এসে তরী ভেড়াল চোরের দল।
কিন্তু নদীতীরে লোকটার কোনো চিহ্ন নেই তো! তখন হঠাৎ সেই দীর্ঘ ধূসর বর্ণ বস্তুটির কথা তাদের মনে পড়ল। হ্যাঁ, একটা গর্জনও শোনা গিয়েছিল বটে! লোকটাও যেন হঠাৎ মাটিতে পড়ে গিয়েছিল বলে মনে হচ্ছে!
যে-ব্যক্তি ডিঙি চালাচ্ছিল, সে নদীর পাড়ে উঠে নিরুদ্দেশ সঙ্গীর খোঁজ করতে যাচ্ছিল, কিন্তু সবাই তাকে নিষেধ করল। প্রথমে তারা ভেবেছিল তাদের সঙ্গী কোনো প্রেতাত্মার কবলে পড়েছে। একটু পরেই হঠাৎ তাদের মনে পড়ল প্যান্থারটির কথা। কিছুক্ষণ আলোচনা করে তারা স্থির করল ওই জন্তুটাই তাদের সঙ্গীকে আক্রমণ করেছিল। এতক্ষণে জন্তুটা নিশ্চয়ই লোকটাকে মেরে ফেলেছে এবং অন্ধকার নিরালা জায়গায় বসে শিকারের মাংস ভক্ষণ করছে। এই সিদ্ধান্তে আসতেই তারা যেখান থেকে যাত্রা শুরু করেছিল সেইদিকে অর্থাৎ স্রোতের বিপরীত দিকে ডিঙি বাইতে শুরু করল। কিন্তু প্রায় আধমাইল যাওয়ার পর আর ওইভাবে ডিঙি চালানো সম্ভব হল না। তখন চোরের দল ডিঙিটাকে পাড়ের ওপর তুলে রেখে যথাসম্ভব দ্রুত পদচালনা করল গ্রামের উদ্দেশ্যে। পথ চলার সময় তারা চিৎকার করে কথা বলছিল, যাতে প্যান্থারটা ভয় পেয়ে তাদের সামনে না-আসে।
পরের দিন সূর্য যখন মাথার উপর আগুন ছড়াচ্ছে, সেই সময় সমগ্র গ্রামের লোক দল বেঁধে অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে নিরুদ্দেশ ব্যক্তির সন্ধানে যাত্রা করল। বেশি খোঁজাখুঁজি করতে হল না, তাকে পাওয়া গেল নদীর ধারে একটা ঝোপের কাছে। জীবিত নয় মৃত–ছিন্নভিন্ন, রক্তাক্ত। অন্যান্য বারের মতো এবারও দেখা গেল প্যান্থার মানুষটিকে নৃশংসভাবে হত্যা করেছে বটে, কিন্তু তার মাংস খায়নি।
এরপর শুরু হল হত্যার তাণ্ডবলীলা। আরও কয়েকটি মানুষ প্রাণ দিল প্যান্থারের কবলে। প্যান্থার শুধু হত্যা করে, মাংস খায় না। প্রত্যেকটি মৃতদেহকে জন্তুটা এমনভাবে ক্ষতবিক্ষত ও বিকৃত করে ফেলে যে, লোকগুলোকে চিনতে পারাই কষ্টকর হয়ে ওঠে। মনে হয় দারুণ আক্রোশে জন্তুটা ক্রমাগত আঘাত করে গেছে, হত্যার পরেও মানুষগুলোর ওপর তার রাগ যায়নি।
