প্রথম ব্যক্তির মতো দ্বিতীয় ব্যক্তিও সশব্দে ধরাশায়ী হয়ে আর্তনাদ করতে লাগল।
আহত লোক দুটির সঙ্গীরা বাচ্চা তিনটির ওপর কাটারির ধার পরখ করতে ইতস্তত করেনি, কিন্তু অস্ত্র হাতে মা-প্যান্থারের নখদন্তের সম্মুখীন হওয়ার সাহস তাদের ছিল না–দারুণ আতঙ্কে আর্তনাদ করতে করতে তারা চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে পালাতে লাগল তিরবেগে।
মা-প্যান্থার পলাতকদের অনুসরণ করল না, আহত অবস্থায় যে দুটি লোক মাটিতে পড়ে ছটফট করছিল, তাদের ওপর সে ঝাঁপিয়ে পড়ল এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই নখে দাঁতে তাদের ছিঁড়ে ফেলল টুকরো টুকরো করে।
তারপর বাচ্চা তিনটির মধ্যে যে-জন্তুটার দেহে কম ক্ষত ছিল সেটাকে মুখে তুলে নিয়ে গভীর বনের ভিতর অদৃশ্য হল।
বাঁশ কাটতে যারা গিয়েছিল, তারা গ্রামে গিয়ে বলল একটা প্রকাণ্ড প্যাস্থার সম্পূর্ণ বিনা কারণে তাদের আক্রমণ করে দুটি মানুষকে হত্যা করেছে। তারা যে বাচ্চাগুলোকে খুন করে মা-প্যান্থারকে উত্তেজিত করেছিল, এ-কথা তারা বেমালুম চেপে গেল। পরে অবশ্য আসল ব্যাপারটা জানাজানি হয়েছিল।
কিছুদিন খুব গোলমাল হল। যেখানে ঘটনাটা ঘটেছিল, সেই জায়গাটা এড়িয়ে চলল স্থানীয় মানুষ। নিতান্তই ওই জায়গা দিয়ে যাতায়াত করার দরকার হলে সেখানকার মানুষ দলে ভারী হয়ে অস্ত্র নিয়ে পথ চলত।
কয়েকটা সপ্তাহ কেটে গেল। মা-প্যান্থারকে কেউ আর দেখতে পায়নি। লোকে তার কথা ভুলে গেল।কিন্তু শ্বাপদ জননী তার শাবকদের অপমৃত্যুর কথা ভোলেনি, সে তখন বিদ্বেষ পোষণ করছে। সমগ্র মনুষ্যজাতির ওপর। কিছুদিন পরেই আবার প্রতিশোধ গ্রহণের সুযোগ পেল সে।
পূর্বে উল্লিখিত গ্রামটির নিকটবর্তী অরণ্যে এক কুখ্যাত চোর বনরক্ষীদের চোখে ধুলো দিয়ে বন থেকে চন্দন কাঠ চুরি করত। অনেক চেষ্টা করেও বন বিভাগের লোকজন এবং পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি।
এই চোরটি তার ছেলেকে নিয়ে এক চাঁদনি রাতে জঙ্গলে প্রবেশ করল। কিছু চন্দন কাঠ কেটে নিয়ে ডিঙিতে তুলে নদীর উত্তরদিকের তীরে উঠতে পারলে আর মাদ্রাজের কর্তৃপক্ষ তাদের গ্রেপ্তার করতে পারবে না–নদীর ওই দিকটা ছিল মহীশূরাজ্যের অন্তর্গত এবং সেই উদ্দেশ্যেই তারা প্রবেশ করেছিল বনের মধ্যে।
দিনের বেলা এসে একসময় তারা পছন্দমতো গাছগুলো দেখে গিয়েছিল, এখন নির্ধারিত স্থানে এসে তারা কুড়াল দিয়ে গাছ কাটতে শুরু করল। শাবকহারা মা-প্যান্থার ওই শব্দে আকৃষ্ট হয়েছিল সন্দেহ নেই। নিঃশব্দে সে হানা দিল। নরমাংসের লোভ তার ছিল না, নরহত্যাই ছিল একমাত্র উদ্দেশ্য।
বাপ বুঝতেই পারেনি ব্যাপারটা কী ঘটল, একবার আর্তনাদ করার সময়ও সে পায়নি। আচম্বিতে পিঠের ওপর একটা গুরুভার দেহের সংঘাতে সে হল ভূমিপৃষ্ঠে লম্ববান, পরক্ষণেই কণ্ঠনালীতে তীক্ষ্ণ দন্তের সাংঘাতিক নিষ্পেষণ। আঠারো বছরের ছেলে তার বাপকে বাঁচানোর চাইতে নিজের প্রাণ বাঁচাতেই বেশি ব্যস্ত হয়ে পড়ল, হাতের কুড়াল ফেলে সে পলায়ন করল দ্রুতবেগে।
কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই হতভাগ্য চোর প্রাণত্যাগ করল প্যান্থারের কবলে। ছেলেটি অবশ্য শ্বাপদকে ফাঁকি দিতে পারল, তিরবেগে ছুটে গিয়ে সে নদীর ধারে রক্ষিত ডিঙির ওপর লাফিয়ে উঠল এবং প্রাণপণে দাঁড় বেয়ে নদী পেরিয়ে ছুটতে ছুটতে প্রবেশ করল তার কুঁড়েঘরে। চোরের বউ স্বামীর ভয়াবহ মৃত্যুসংবাদ পেল ছেলের মুখ থেকে।
গ্রামবাসীরা অনেক আগেই শয্যাগ্রহণ করেছিল। মা আর ছেলের আর্তক্ৰন্দন শুনে তাদের ঘুম ভেঙে গেল। আলো জ্বালিয়ে তারা চোরের কুটিরে এল, তারপর তার ছেলের মুখ থেকে সমস্ত ঘটনার বিবরণ শুনল। কিন্তু সেই রাতে কেউ কিছু করতে রাজি হল না। সকলেই জানত বাপ-ছেলে দুজনেই চোর চোরের মৃতদেহ উদ্ধার করার জন্য রাতের অন্ধকারে হিংস্র শ্বাপদের সম্মুখীন হওয়ার ইচ্ছা তাদের ছিল না।
পরের দিন বেশ বেলা হলে গ্রামবাসীরা অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে ছেলেটির সঙ্গে রওনা হল এবং অকুস্থলে গিয়ে চোরের মৃতদেহ দেখতে পেল। লোকটির গলা থেকে পেট পর্যন্ত চিরে ফেলা হয়েছে, সমস্ত শরীর নখদন্তে ছিন্নভিন্ন, জায়গাটা রক্তে ভাসছে। কিন্তু প্যান্থার মৃতদেহের মাংস ভক্ষণ করেনি, হত্যাকাণ্ড সমাধা করে সে চলে গেছে।
আবার কয়েকদিন খুব শোরগোল চলল। লোকজন দল বেঁধে অস্ত্র নিয়ে পথ চলতে শুরু করল। কিন্তু বেশ কিছুদিনের মধ্যেও কোনো হত্যাকাণ্ড যখন অনুষ্ঠিত হল না, তখন স্থানীয় মানুষ আবার স্বাভাবিকভাবেই চলাফেরা শুরু করল। ধীরে ধীরে প্যান্থারের কথা লোকে ভুলে গেল।
কয়েকটা সপ্তাহ কাটল। আবার এল শুক্লপক্ষ। জ্যোৎস্না রাতেই জঙ্গলের মধ্যে দুবৃত্তরা যাবতীয় দুষ্কর্মে প্রবৃত্ত হয়। ওই সময়ে যেখানে হরিণরা নুন চাটতে অথবা জলপান করতে আসে, সেইসব জায়গায় ওত পেতে বসে চোরাই শিকারির দল (poachers) এবং কাঠ চোরের দল। কাঠ চোর চাঁদনি রাতে চন্দন, মাথি, বাঁশ প্রভৃতি কেটে নদীপথে ভাসিয়ে নিয়ে যায় অথবা গোরুর গাড়িতে বোঝাই করে চোরাই মাল নিয়ে চম্পট দেয়।
এ ছাড়া আছে আর এক ধরনের চোর। তারা চুরি করে মাছ। এরা বঁড়শি বা জাল দিয়ে মাছ ধরে না। ঘরে তৈরি হাতবোমা জলে ফাটিয়ে মাছ ধরে। বিস্ফোরণের ফলে ছোটোবড়ো অসংখ্য মাছ মরে অথবা অজ্ঞান হয়ে জলের উপর ভেসে ওঠে। বাঁশের ডগায় বসানো জলের সাহায্যে বড়ো বড়ো মাছগুলি ধরে চোরের জল নৌকা বোঝাই করে। ছোটো ছোটো মরা মাছগুলো ভেসে যায়, পরে বড়ো মাছ আর কুমিরের খাদ্যে পরিণত হয়।
