পরদিন সকালে পরিকল্পনার চেহারা দেখে দলসুদ্ধ মানুষের চক্ষুস্থির! একটা ঘোড়ায়-টানা গাড়ি থেকে ঘোড়া খুলে নিয়ে গাদা গাদা কাঠের টুকরো সাজাল টলবার্ট আর কোপল্যন্ড, তারপর দুই স্যাঙাতে মিলে সেই কাঠবোঝাই গাড়িটাকে ঠেলতে ঠেলতে নিয়ে চলল গুন্ডাদের আস্তানার দিকে।
এককুড়ি ডিনামাইটের স্টিক! ঘরের ভিতর থেকে বৃষ্টির মতো ছুটে এল গুলির পর গুলি একটা গুলি যদি কোনোরকমে ডিনামাইটের ওপর পড়ে তাহলে গাড়িসুদ্ধ মানুষ দুটো টুকরো টুকরো হয়ে যাবে! দলসুদ্ধ লোকের বুক কাঁপতে লাগল, কিন্তু দুই বন্ধু সম্পূর্ণ নির্বিকার তারা গাড়ি ঠেলছে তো ঠেলছেই।
ফটফট করে উড়ে যেতে লাগল কাঠের টুকরোগুলো গুলির আঘাতে, গাড়ির একটা চাকা থেকে দুটো কাঠের ডান্ডা উড়িয়ে নিলে রাইফেলের বুলেট, কোপল্যন্ডের মাথায় আঁচড় বসিয়ে একটা গুলি তার সমস্ত মুখ রক্তে ভাসিয়ে দিলে, আর একটা গুলি ছোঁ মেরে নিয়ে গেল টলবার্টের টুপি–তবু তারা নির্বিকারভাবে গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে এগিয়ে চলল!
দুই বন্ধু যেন আত্মহত্যার সংকল্প নিয়েছে।
আচম্বিতে পাহাড়ের বুক কাঁপিয়ে জেগে উঠল এক ভয়াবহ শব্দের তরঙ্গ, প্রচণ্ড বিস্ফোরণের ফলে কেঁপে উঠল মাটি ধোঁয়া আর ধুলোর ঝড়ে চারদিক আচ্ছন্ন করে পুলিশদের মাথার উপর দিয়ে উড়ে যেতে লাগল বড়ো বড়ো কাঠের টুকরো!
ধোঁয়া কেটে গেলে সবাই দেখল, কাঠের ঘরটা টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে পড়েছে। একটু দূরেই গাড়ির আড়ালে লম্বা হয়ে শুয়ে আছে টলবার্ট আর কোপল্যন্ড এবং ভাঙা ঘরের ভগ্নস্তূপের ভিতর রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে আছে নেড ক্রিস্টি!
একটা রাইফেল সগর্জনে অগ্নি-উদগার করলে।
নেড ক্রিস্টির প্রাণহীন দেহ লুটিয়ে পড়ল মাটির ওপর।
ব্রুনার এসে দাঁড়াল কোপল্যন্ড আর টলবার্টের সামনে। গুলির আঘাতে সংজ্ঞা হারিয়ে ফেলেছে কোপল্যন্ড। টলবার্টও আহত হয়েছে, কিন্তু সে জ্ঞান হারায়নি। মুখ তুলে দুর্বলভাবে সে একবার হাসল, তারপর ব্রুনারকে উদ্দেশ করে বললে–
আমার মাথায় একটা গুলি আঁচড় কেটে চলে গেছে। খুব রক্তপাত হচ্ছে বটে, কিন্তু আমি বিশেষ ভয় পাইনি। তবে ডিনামাইট যখন ফাটছিল তখন সত্যি ভয় পেয়েছিলাম। মনে হচ্ছিল এই বুঝি উড়ে গেলাম।
সমস্ত ঘটনাটা পরে জানা গেল। সব কিছু এত দ্রুত ঘটেছিল যে প্রত্যক্ষদর্শীরাও প্রথমে ব্যাপারটা বুঝতে পারেনি। টলবার্ট আর কোপল্যন্ড গাড়ি ঠেলতে ঠেলতে গুন্ডাদের আস্তানার পনেরো গজের মধ্যে এসে পড়েছিল এবং সেইখান থেকেই ঘরের ওপর ছুঁড়ে দিয়েছিল ডিনামাইট স্টিকগুলো। বিস্ফোরণের আগে বুকে হেঁটে খানিকটা পিছিয়ে আসতে পেরেছিল বলেই তারা বেঁচে গেছে–কী অসীম সাহস!
হত ও আহত মানুষগুলোকে নিয়ে ব্রুনার শহরে ফিরে এল।
নেড ক্রিস্টি মারা পড়েছিল, কিন্তু আর্চি উলফকে ওখানে পাওয়া যায়নি। খুব সম্ভব কোনো গোপন পথে সকলের চোখে ধুলো দিয়ে সে সরে পড়েছিল।
তাহলাকুই শহরে আর কখনো গুন্ডার উপদ্রব হয়নি। পুলিশ ও জনতার সম্মিলিত আক্রমণের মুখে নিশ্চিহ্ন হয়ে গেল সমাজবিরোধী গুন্ডার দল।
ভদ্রলোকের বাসযোগ্য হয়ে উঠল তাহলাকুই শহর।
জনতার প্রতিনিধিকে যারা হত্যা করেছিল, ক্ষিপ্ত জনতা তাদের ক্ষমা করেনি।
[পৌষ ১৩৭৬]
জেহাদ
বহুদিন আগেকার কথা। ব্রিটিশশাসিত দক্ষিণ ভারতে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অন্তর্গত তালাইনভু নামে গ্রামটির নিকটবর্তী অরণ্যে কয়েকটি গ্রামবাসীর অকারণ নিষ্ঠুর আচরণের ফলে সমগ্র বনাঞ্চলে ভয়াবহ সন্ত্রাসের রাজত্ব শুরু হয়েছিল এবং স্বজাতির পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে প্রাণ হারিয়েছিল কয়েকটি নিরাপরাধ মানুষ
সেই অদ্ভুত এবং ভয়ংকর ঘটনার বিবরণ এখানে পরিবেশিত হল :
উক্ত তালাইনভু গ্রামের ছয়-সাতজন লোক কাবেরী নদীর তীরে বাঁশবন থেকে বাঁশ কাটতে গিয়েছিল। হঠাৎ একটা বাঁশঝাড়ের নীচে তারা তিনটি প্যান্থারের বাচ্চা দেখতে পায়। বাচ্চাগুলো তাদের কোনো ক্ষতি করেনি, সেখান থেকে সরে এলেই আর কোনো ঝামেলা হত না। কিন্তু লোকগুলোর নিতান্ত দুর্মতি, তাদের মধ্যে একজন হাতের ধারালো কাটারি দিয়ে একটা বাচ্চার গায়ে কোপ বসিয়ে দিল। বাচ্চাটা প্রায় দু খানা হয়ে রক্তাক্ত শরীরে কয়েক হাত দূরে ছিটকে পড়ল। হত্যাকারীর দৃষ্টান্ত দেখে তার সঙ্গীরা মহা উৎসাহে অন্য বাচ্চা দুটিকে আক্রমণ করল। কাটারির আঘাতে আঘাতে দুটি শ্বাপদ শিশুই ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে।
আচম্বিতে বনের মধ্যে জাগল ক্রুদ্ধ হুংকার ধ্বনি–পরক্ষণেই হলুদের উপর কালো কালো ছোপ বসানো একটা অতিকায় বিড়ালের মত জানোয়ার ঝাঁপিয়ে পড়ল লোকগুলোর মধ্যে
মা-প্যান্থার!
মানুষ সম্পর্কে বন্য পশুর একটা স্বাভাবিক ভীতি আছে। তাই সকলের অলক্ষ্যে একটু দূরে দাঁড়িয়ে মা-প্যান্থার লোকগুলোকে লক্ষ করছিল, কাছে আসতে সাহস পায়নি। কিন্তু চোখের ওপর তার বাচ্চাদের হত্যাকাণ্ড দেখে দারুণ ক্রোধে তার মন থেকে ভয়ের অনুভূতি লুপ্ত হয়ে গেল, সে ঝাঁপিয়ে পড়ল হন্তারকদের ওপর।
প্রথম ব্যক্তি ব্যাপারটা কী হল বুঝতেই পারল না, কারণ মা-প্যান্থারের থাবার আঘাতে তার দুটো চোখই অন্ধ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের মধ্যে! লোকটি ছিটকে পড়ল মাটিতে। সঙ্গেসঙ্গে তার ধরাশায়ী দেহ টপকে একলাফে আরেকটি লোকের বুকের উপর কামড় বসাল ক্ষিপ্তা জননী।
