ক্ষিপ্ত জনতার সম্মুখীন হওয়ার সাহস তাদের ছিল না, হাওয়া ঘুরে গেছে!
দু-দিন পরেই সকাল বেলা শহরের রাজপথে ঘোড়ার পিঠে আবির্ভূত হল ব্রুনার। এক বিরাট জনতা তাকে ঘিরে দাঁড়াল, খবর কী?
ব্রুনার বললে, কবচের মালিক হচ্ছে নেড ক্রিস্টি। যে বুড়ো রেড-ইন্ডিয়ান এই ধরনের কবচ তৈরি করে তাকে আমি ভালোভাবেই জানি। আমি ওই বুড়োর কাছে গিয়েছিলাম। কবচটা দেখেই সে জিনিসটা শনাক্ত করল–নেড ক্রিস্টি ওই কবচ নিয়েছিল বুড়োর কাছ থেকে। এই তল্লাটে ওই ধরনের কবচ বুড়ো ছাড়া আর কেউ তৈরি করতে পারে না, তাই ওর কথা নিশ্চয়ই বিশ্বাসযোগ্য। বুড়ো আমাকে বলেছিল যে যতগুলো কবচ সে তৈরি করেছিল সবগুলোতেই সে খোদাই করেছিল একটি একটি সাপের ছবি কিন্তু ক্রিস্টির কবচে সে এঁকে দিয়েছিল দু-দুটো সাপ। আমরা যে কবচটা কুড়িয়ে পেয়েছি তাতেও দুটি সাপের ছবি খোদাই করে আঁকা হয়েছে!
জনতার ভিতর থেকে একজন চিৎকার করে উঠল, আমরা এখানে দাঁড়িয়ে আছি কেন? চলো–ওই শয়তান নেড ক্রিস্টিকে ধরে তার গলায় একটা দড়ি লাগিয়ে গাছের ডালে ঝুলিয়ে দেওয়া যাক।
সমবেত জনমণ্ডলী বক্তার প্রস্তাবকে সমর্থন জানিয়ে গর্জে উঠল, ঠিক! ঠিক! নেড ক্রিস্টিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দেব! চলো, দেখি কোথায় লুকিয়ে আছে সেই শয়তান।
ব্রুনার কঠোর স্বরে বললে, না। আইন তোমরা নিজেদের হাতে নিতে পারো না। আমরা সরকারের প্রতিনিধি, যা করা কর্তব্য আমরা তাই করব। নেড ক্রিস্টির আস্তানা কোথায় তোমরা জানো?
একাধিক কণ্ঠে উত্তর এল, জানি। র্যাবিট ট্র্যাপ।
সেটা আবার কোথায়?
মাইক নামে যে ছোকরা চাকরটি সেলুনের ভিতর ম্যাপলের কীর্তি প্রত্যক্ষ করেছিল সে এগিয়ে এসে জানাল যে র্যাবিট ট্র্যাপ জায়গাটা সে চেনে এবং ব্রুনার যদি অনুমতি দেয় তবে সে তার সঙ্গে গিয়ে জায়গাটা দেখিয়ে দিতে পারে।
ছেলেটিকে নিজের ঘোড়ায় তুলে নিয়ে পুলিশ দলের সঙ্গে ব্রুনার ছুটল র্যাবিট ট্র্যাপ-এর দিকে।
ঘন জঙ্গল আর কাঁটা ঝোপের ভিতর দিয়ে যথাস্থানে এসে পৌঁছে গেল ব্রুনার এবং তার দল। একটা ছোটো পাহাড়ের ওপর চারদিকে ছড়িয়ে আছে ঘন ঝোপঝাড় এবং তারই মাঝখানে একটা ফাঁকা জায়গার ওপর দাঁড়িয়ে আছে একটি কাষ্ঠনির্মিত ঘর বা কেবিন–ওই হচ্ছে নেড ক্রিস্টির আস্তানা।
ব্রুনারের দল ঘরের দিকে এগিয়ে গেল। সঙ্গেসঙ্গে গর্জে উঠল একটা রাইফেল। পুলিশ বাহিনীর একজন লোক আহত হয়ে ছিটকে পড়ল মাটির ওপর। অন্যান্য পুলিশরা চটপট ভূমিশয্যায় লম্বমান হয়ে আত্মরক্ষা করলে, কেউ কেউ আশ্রয় নিলে পাহাড়ের ওপর অবস্থিত ছোটো-বড়ো পাথরের আড়ালে।
ঘরের ভিতর থেকে দু-দুটো রাইফেল সগর্জনে অগ্নিবৃষ্টি করতে লাগল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ব্রুনারের দলের আরও দুজন লোক আহত হল। ব্রুনার বুঝল, ওই ঘরটি হচ্ছে দুর্ভেদ্য দুর্গের মতো শক্ত কাঠের দেয়ালের আড়ালে দাঁড়িয়ে নেড এবং তার সঙ্গী (খুব সম্ভব আর্চি উলফ) পুলিশদলের নিক্ষিপ্ত বুলেট থেকে সহজেই আত্মরক্ষা করতে পারবে, কিন্তু ফাঁকা জায়গার ওপর দিয়ে গুন্ডাদের রাইফেলের সামনে এগিয়ে যাওয়া পুলিশদের পক্ষে অসম্ভব।
সে দলের মধ্যে দুজনকে ডেকে বললে, এখনই শহর থেকে জনদশেক বন্দুকবাজ মানুষ নিয়ে এসো। তারাই হবে আজ সরকারের অস্থায়ী প্রতিনিধি। এই কয়জন পুলিশ নিয়ে গুন্ডা দুটোকে শায়েস্তা করা যাবে না।
ব্রুনারের দুই সহকারী তাহলাকুই শহরের দিকে তিরবেগে ঘোড়া ছুটিয়ে দিলে। বিকাল বেলার দিকে তাদের সঙ্গে এল দশজন রাইফেলধারী নাগরিক–তাহলাকুই শহরের দশটি লড়িয়ে মানুষ।
পুলিশ ও নাগরিকদের মিলিত বাহিনী এইবার একযোগে গুন্ডাদের আক্রমণ করলে। তিন দিক দিয়ে ঘিরে ফেলে কাঠের ঘরটার ওপর তারা গুলি চালাতে শুরু করলে এবং গুলিবর্ষণের ফাঁকে ফাঁকে হামাগুড়ি দিয়ে ঘরের দিকে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করতে লাগল।
অসম্ভব। গুন্ডাদের নিশানা অব্যর্থ।
কিছুক্ষণের মধ্যেই পুলিশ এবং স্বেচ্ছাসেবকদের কয়েকজন গুলি খেয়ে ধরাশয্যায় লম্বমান হল। কাঠের ঘরটা যেন সাক্ষাৎ মৃত্যুপুরী–জানালার ফাঁক দিয়ে উড়ন্ত মৃত্যুদূতের মতো ছুটে আসছে ঝাঁকে ঝাঁকে গুলি কার সাধ্য সেদিকে যায়?
নাঃ, এভাবে হবে না। ব্রুনার হতাশ হয়ে পড়ল।
টলবার্ট নামক একজন নাগরিক এইবার সামনে এগিয়ে এল, ব্রুনার! ওই কাঠের ঘরটাকে ডিনামাইট দিয়ে উড়িয়ে দিতে হবে। তা ছাড়া অন্য কোনো উপায় নেই।
ব্রুনার বললে, কিন্তু এত দূর থেকে ঘরের ওপর ডিনামাইট ছুঁড়ে মারা সম্ভব নয়। ডিনামাইট ছুঁড়তে হলে ঘরের কাছাকাছি যেতে হবে আর ঘরের কাছে এগিয়ে গেলেই আমরা গুন্ডা দুটোর রাইফেলের সামনে পড়ব। গুলি যদি ডিনামাইটের ওপর লাগে তাহলে আর দেখতে হবে না–আমাদের পুরো দলটাই দড়াম করে উড়ে যাবে স্বর্গের দিকে! আত্মহত্যা করার অনেক ভালো ভালো উপায় আছে টলবার্ট, ডিনামাইটের মুখে প্রাণ দিতে আমি রাজি নই।
টলবার্ট বললে, আমি আর কোপল্যন্ড একটা পরিকল্পনা করেছি। আমার মনে হয় গুন্ডাদের আমরা কাবু করতে পারব।
সারারাত ধরে সবাই মিলে ঘরটাকে পাহারা দিলে কিন্তু ঘরের সামনে এগিয়ে যাওয়ার চেষ্টা কেউ করলে না। অনর্থক প্রাণ বিপন্ন করার পক্ষপাতী নয় ব্রুনার; টলবার্ট এবং কোপল্যন্ডের উপর ভরসা করে সে রাতটা নিষ্ক্রিয়ভাবে হাত গুটিয়ে বসে রইল–দেখা যাক ওদের পরিকল্পনা কতদূর ফলপ্রসূ হয়।
