আমি রুদ্ধ নিশ্বাসে প্রতীক্ষা করতে লাগলুম। এখনই পিছনের দরজার কাছে দণ্ডায়মান আর্চির রিভলভার থেকে গুলি ছুটে এসে ম্যাপলকে শুইয়ে দেবে মেঝের ওপর। শুধু আমি নই, অভিজ্ঞ মানুষগুলো সবাই বুঝেছিল ব্যাপারটা, সকলেরই মুখে-চোখে ফুটে উঠেছিল হিংস্র প্রত্যাশা উদগ্র আগ্রহে সকলেই কান পেতে অপেক্ষা করতে লাগল একটা রিভলভারের গর্জন শোনার জন্য…
হ্যাঁ, গর্জে উঠেছিল রিভলভার। কিন্তু সেটা আর্চির অস্ত্র নয়। আমরা দেখলুম দরজার কাছে। দাঁড়িয়ে আর্তনাদ করছে আর্চি উলফ, তার হাতের মুঠো থেকে ছিটকে পড়েছে রিভলভার। কখন যে ম্যাপল ডান হাতের দ্রুত সঞ্চালনে কোমর থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে আর্চিকে গুলি করেছে আমরা বুঝতেই পারিনি।
আমরা শুধু শুনলাম রিভলভারের গর্জন এবং আহত আর্চির আর্তনাদ, আমরা শুধু দেখলাম ম্যাপলের ডান হাতের রিভলভারের নল থেকে বেরিয়ে আসছে ধোঁয়া আর তার বাঁ-হাতের রিভলভার উদ্যত হয়েছে নেভ ক্রিস্টির দিকে।
কোণঠাসা নেকড়ের মতো হিংস্র দন্তবিকাশ করে পিছিয়ে গেল নেড। সে কোমরে ঝুলানো রিভলভারে হাত দেওয়ার চেষ্টা করলে না–চোখে চোখ রেখে ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল।
এইবার রঙ্গমঞ্চে অবতীর্ণ হল ওয়াইল্ড হ্যারি। ওই অঞ্চলের আর একটি কুখ্যাত পিস্তলবাজ গুন্ডা সে। কোমর থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে হ্যারি গুলি করার উপক্রম করলে, সঙ্গেসঙ্গে ক্ষিপ্রহস্তে গুলি চালিয়ে ম্যাপল তাকে মেঝের ওপর পেড়ে ফেলল।
তারপর ঠিক কী হয়েছিল জানি না। ওই রক্তাক্ত নাটকের মধ্যবর্তী অংশে কে কেমন অভিনয় করেছিল বলতে পারব না। কারণ, হ্যারি লুটিয়ে পড়তেই অনেকগুলো রিভলভার একসঙ্গে গর্জে উঠল এবং আমি ঝাঁপ খেলাম একটা টেবিলের নীচে। সেখান থেকে শুয়ে শুয়ে আমি শুনতে পেলাম সগর্জনে ধমকে উঠেছে অনেকগুলো রিভলভার।
প্রায় মিনিট দুই ধরে শুনলাম রিভলভারের গর্জন। তারপর হঠাৎ থেমে গেল সেই শব্দের তরঙ্গ–সব চুপচাপ। খুব সাবধানে টেবিলের তলা থেকে মাথা তুলে দেখলাম স্নেক ডলস সেলুনের মালিক ড্যান ম্যাপলের হাতে তুলে দিচ্ছে একটি পূর্ণ পানপাত্র।
পানশালা শূন্য! গুন্ডার দল সরে পড়েছে!
দোকানের মালিক আর একটা গেলাসে মদ ঢালল, এটাও টেনে নাও। এই গেলাসের দাম দিতে হবে না।
মালিকের দিকে স্থিরদৃষ্টিতে তাকিয়ে ম্যাপল বললে, হঠাৎ এই অনুগ্রহের কারণ কী?
মালিক বললে, অনুগ্রহ নয়। আমি আইরিশ–আয়ারল্যান্ডের লোক মনে করে মৃত্যুপথযাত্রীকে পানীয় পরিবেশন করলে পুণ্য হয়।
তার মানে? আমি কি মরতে বসেছি নাকি?
–নিশ্চয়। তুমি পাকা খেলোয়াড় তোমার মতো দক্ষ পিস্তলবাজ মানুষ আমি দেখিনি। কিন্তু তোমার আয়ু ফুরিয়েছে। দু-মিনিট কিংবা খুব বেশি হলে মিনিট কুড়ি তুমি বেঁচে থাকতে পারো।
বটে? এক চুমুকে গেলাসের তরল পদার্থ গলায় ঢেলে শূন্য পানপাত্র টেবিলের ওপর রাখল ম্যাপল, আচ্ছা, আজ চলি।
দরজাটা লাথি মেরে খুলে ফেলল ম্যাপল, খাপে ঢাকা রিভলভার দুটির বাঁটের ওপর নেমে এল তার দুই হাত তারপর লম্বা লম্বা পা ফেলে খোলা দরজা দিয়ে সে বেরিয়ে গেল… শহরের অন্ধকার পথের ওপর মিলিয়ে গেল তার দীর্ঘ দেহ।
মাইকের লিখিত বিবরণীতে আরও অনেক কিছু আছে। সব ঘটনা বিশদভাবে লিপিবদ্ধ করার জায়গা এখানে নেই। খুব অল্প কথায় পরবর্তী ঘটনার বিবৃতি দিচ্ছি।
স্নেক ডলস সেলুনের মালিক যে ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল, তা সফল হয়েছিল বর্ণে বর্ণে। ড্যান ম্যাপল পানশালা থেকে বেরিয়ে যাওয়ার চল্লিশ মিনিটের মধ্যে অজ্ঞাত আততায়ী তাকে আড়াল থেকে রাইফেল ছুঁড়ে হত্যা করেছিল।
ম্যাপলের হত্যাকাহিনি শুনে খেপে গেল তাহলাকুই শহরের সমস্ত মানুষ। এতদিন যারা গুন্ডাদের ভয়ে থরথর করে কাঁপত, তারাই আজ রুখে দাঁড়াল গুন্ডারাজ উচ্ছেদ করার জন্য। দলে দলে শান্তিপ্রিয় মানুষ ছুটে এল শহরের পথে।
হাতে তাদের বিভিন্ন অস্ত্র রাইফেল! পিস্তল! শটগান!
হত্যাকাণ্ডের পরদিনই আমেরিকা যুক্তরাজ্যের একজন ডেপুটি মার্শাল অকুস্থলে এসে পড়ল, নাম তার হেক ব্রুনার। তার সঙ্গে এল দুজন যোগ্য সহকারী। হত্যাকাণ্ড যেখানে ঘটেছিল সেখানে খোঁজাখুঁজি করে তারা আবিষ্কার করলে একটা ব্যবহৃত বুলেটের খোল এবং সেই খোলটার একটু দুরেই পাওয়া গেল একটা লাকি চার্ম বা কবচ জাতীয় বস্তু। স্পষ্টই বোঝা গেল যে রাইফেল। থেকে গুলি চালিয়ে ম্যাপলকে হত্যা করা হয়েছে, ওই বুলেটের খোলটা হচ্ছে উক্ত রাইফেলে ব্যবহৃত অকেজো টোটা।
ওই ধরনের বুলেট অনেকেই ব্যবহার করে, কাজেই সেটা তাকে খুনিকে শনাক্ত করা সম্ভব নয়।
কিন্তু কবৃচটা গোয়েন্দার কাছে মূল্যবান সূত্র।
ব্রুনার তার দুই সহকারীকে বললে, আমি খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসছি। এই কবচের মালিকটিকে যদি আবিষ্কার করতে পারি তাহলেই হত্যাকাণ্ডের সমাধান হয়ে যাবে। আমার মনে হয় খুনি আমার চোখে ধুলো দিতে পারবে না।
ঘোড়া ছুটিয়ে অদৃশ্য হয়ে গেল হেক ব্রুনার। দু-দিন তার পাত্তা পাওয়া গেল না। আর এই দুটো দিন শহরের কোনো জায়গায় কোনো অপরাধ সংঘটিত হল না। তাহলাকুই শহরের ইতিহাসে পরপর দু-দিন কোনো দুর্ঘটনা ঘটল না, এটা একটা আশ্চর্য ঘটনা।
শহরের আশেপাশে পার্বত্য অঞ্চল থেকে বেরিয়ে এসে যেসব গুন্ডা নগরবাসীর ওপর হামলা করত তারা পরপর দু-দিন তাদের আস্তানায় গা-ঢাকা দিয়ে লুকিয়ে রইল।
