হ্যাঁ, আমি যুক্তরাজ্যের ডেপুটি মার্শাল, কিশোরকণ্ঠে শোনা গেল দর্পিত ঘোষণা, আমার নাম ড্যান ম্যাপল। কারো কিছু জিজ্ঞাস্য আছে? কোনো প্রশ্ন?
না, কারো কিছু জানার নেই।
কেউ কোনো প্রশ্ন করলে না।
যে লোকটি বিদ্রূপ করেছিল সে হাতের গেলাসটিকে পর্যবেক্ষণ করতে লাগল খুব মন দিয়ে… আশেপাশে অন্য লোকগুলিও হঠাৎ মৌনব্রত অবলম্বন করলে। একটু আগেও যেখানে হইহই হট্টগোলে কান পাতা যাচ্ছিল না, এখন সেখানে ছুঁচ পড়লে শব্দ শোনা যায়…
কয়েকটা নীরব মুহূর্ত
পাথরের মতো নিশ্চল হয়ে চেয়ারের উপর যে লোকগুলো বসেছিল তারা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল, অভ্যস্ত হাতগুলো ধীরে ধীরে নেমে এল কোমরের খাপে ঢাকা রিভলভারের দিকে।
ড্যান ম্যাপল ব্যাপারটা লক্ষ করেছিল।
সে হেসে উঠল, আমার সঙ্গে রিভলভারের খেলা খেলতে পারে এমন কোনো খেলোয়াড় এখানে নেই। আমি তোমাদের সাবধান করে দিচ্ছি তোমরা যদি আরও কিছুদিন দুনিয়ার আলো দেখতে চাও, তবে তোমাদের হাতগুলো রিভলভারের বাঁট থেকে একটু দূরে দূরে রাখো।
ড্যান ম্যাপলের কণ্ঠস্বরে উত্তেজনার স্পর্শ ছিল না, খুব সহজ আর স্বাভাবিক ছিল তার গলার আওয়াজ। কিন্তু তার চোখ দুটি থেকে হারিয়ে গেল কৈশোরের প্রাণচঞ্চল আলোর দীপ্তি–সর্পিল আক্রোশে চোখের তারায় নেমে এল বিষাক্ত হিংসার ছায়া।
স্নেক ডলস সেলুনের খুনি মানুষগুলো ওই চোখের ভাষা বুঝল খুব সহজেই, তাদের হাতগুলো রিভলভারের বিপজ্জনক সান্নিধ্য থেকে দূরে সরে গেল।
কোলাহলমুখর পানশালার মধ্যে নেমে এল মৃত্যুপুরীর নীরবতা।
ড্যান ম্যাপলের আবির্ভাব অতিশয় নাটকীয় বটে কিন্তু অপ্রত্যাশিত নয়। আমেরিকা যুক্তরাজ্যের তাহলাকুই নামে যে ছোটো শহরটা পার্বত্য অঞ্চলে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল, সেখানকার প্রতিটি বাসিন্দাই খবরটা পেয়েছিল–
খুব শীঘ্রই নাকি ওই অঞ্চলে আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য একজন ডেপুটি মার্শাল আসবে।
শহরের বাসিন্দারা খবরটাকে বিশেষ গুরুত্ব দেয়নি। না-দেওয়াই স্বাভাবিক। আজকের আমেরিকার কথা নয়–১৮৯২ সালে ওইসব অঞ্চলে আইন-টাইন কেউ বড়ো একটা মানত না। বিচ্ছিন্নভাবে অবস্থিত ছোটো ছোটো জায়গায় থানা পুলিশের বিরাট ব্যবস্থা করা সম্ভব ছিল গভর্নমেন্টের পক্ষে, তাই শহরের শৃঙ্খলা রক্ষার ভার থাকত টাউন মার্শালদের ওপর। দুর্ধর্ষ গুন্ডারা যে মার্শালদের খুব ভয় করত তা নয়, তবে পারতপক্ষে মার্শালদের সঙ্গে তারা সংঘর্ষে লিপ্ত হতে চাইত না।
তাহলাকুই শহর কিন্তু নিয়মের ব্যতিক্রম। পাঁচ সপ্তাহের মধ্যেই পাঁচজন মার্শালকে ওই শহরের গুন্ডারা গুলি করে মেরে ফেলল। শহরের কয়েকজন বিশিষ্ট ভদ্রলোক গভর্নমেন্টের কাছে আবেদন জানালেন, একজন ডেপুটি মার্শালকে যেন অবিলম্বে তাহলাকুই শহরে পাঠানো হয়। ভদ্রলোক এখানে বাস করতে পারছেন না।
আবেদন গৃহীত হল। তাহলাকুই শহরে আবির্ভূত হল ডেপুটি মার্শাল ড্যান ম্যাপল।
শহরের পানাগার স্নেক ডলস সেলুন-এর ভয়াবহ খ্যাতি ম্যাপলের কানেও পৌঁছেছিল। সে জানত রাত্রিবেলা ওই পানাগারের মধ্যে ঢুকলে সে স্থানীয় গুন্ডাশ্রেণির মানুষগুলোকে দেখতে পাবে, অতএব অকুস্থলে হল ড্যান ম্যাপলের আবির্ভাব।
পরবর্তী ঘটনার কথা তো কাহিনির শুরুতেই বলছি। শুধু দেখতে নয়, কিছু দেখাতেও এসেছিল ম্যাপল। সমবেত গুন্ডাদের উদ্দেশ করে সে যখন সাবধানবাণী উচ্চারণ করলে তখন কেউ সামনে এসে তাকে চ্যালেঞ্জ জানাল না।
না, চ্যালেঞ্জ নয় কিশোর ড্যান ম্যাপলের চোখের দিকে তাকিয়ে তার সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার সাহস ছিল না কারো কিন্তু গুন্ডাদের চোখে চোখে ক্রুর ইঙ্গিতে নির্ধারিত হয়ে গেল নূতন ডেপুটি মার্শালের নিয়তি।
একটি দীর্ঘাকার কুৎসিত মানুষ চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল নাম তার নেড ক্রিস্টি।
সঙ্গে উঠে দাঁড়াল তার সহকারী–আর্চি উলফ।
নেড আর আর্চি ওই অঞ্চলের দুর্ধর্ষ গুন্ডা। নরহত্যায় তাদের দ্বিধা ছিল না কিছুমাত্র। কত লোক যে তাদের হাতে প্রাণ দিয়েছে তারা নিজেরাও বোধ হয় তার সঠিক হিসাব দিতে পারত না। এই দুই মানিকজোড় এবার চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াল।
পরবর্তী ঘটনা প্রত্যক্ষদর্শীর মুখ থেকেই শোনা যাক। ১৮৯২ সালে নভেম্বর মাসের তৃতীয় দিবসে ড্যান ম্যাপল নামে যে কিশোরটি স্নেক ডলস সেলুনে পদার্পণ করেছিল তার কীর্তিকলাপ স্বচক্ষে দেখেছিল এক বালক ভৃত্য নাম তার মাইক ম্যাকফিবেন।
কাহিনির পরবর্তী অংশ মাইকের লিখিত বিবরণী থেকে তুলে দিচ্ছি।
পানাগারের পিছন দিকে দরজা দিয়ে অন্তর্ধান করলে আর্চি আর নির্বিকারভাবে ড্যান ম্যাপলের সামনে এগিয়ে এল নেড। আমি তখনই বুঝলাম ব্যাপারটা কী ঘটতে যাচ্ছে। সেলুন-রেস্তরাঁয় পিস্তলবাজ গুন্ডারা যখন কোনো প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বীকে হত্যা করতে চায় তখন তারা ফঁদ পাতে। ফাঁদের নিয়মটা হচ্ছে, দুজনের মধ্যে একজন সামনে এগিয়ে এসে শিকারকে অন্যমনস্ক করে রাখে এবং সেই সুযোগে পিছন থেকে আর একজন তাকে গুলি করে।
আমি বুঝলাম আর্চি দরজার আড়ালেই দাঁড়িয়ে আছে। সুযোগ পেলেই সে গুলি চালাবে। আমার বুক কাঁপতে লাগল। খুব সহজভাবে ম্যাপলকে পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল নেড, তারপর হঠাৎ একটা টেবিলের ওপর হাত রেখে ঘুরে দাঁড়াল ম্যাপলের দিকে, ওঃ! তুমিই তাহলে নতুন ডেপুটি মার্শাল? রাজ্য সরকার তোমাকেই পাঠিয়েছে?
