কটার এখন কী করবে? বাড়ি ফিরে যাবে? ক্ষতস্থানে ওষুধ লাগিয়ে শয্যাগ্রহণ করবে? মোটেই নয়। চার্লস কটার হচ্ছে চার্লস কটার।
ক্ষতস্থানগুলিতে নিগ্রোদের সাহায্যে ব্যান্ডেজ লাগিয়ে সে আবার সঙ্গীদের নিয়ে পথ চলতে শুরু করলে।
কথায় আছে, ডানপিটের মরণ গাছের আগায়।
চার্লস কটার অবশ্য গাছের আগায় মরেনি, তবে তার মৃত্যু হয়েছিল অত্যন্ত ভয়ানকভাবে। জন্মগ্রহণ করেছিল সে সুসভ্য আমেরিকার ওকলাহাম প্রদেশে, আর তার মৃত্যু হল ঘন বন আবৃত আফ্রিকার অন্তঃপুরে।
একেই বলে নিয়তি।
হ্যাঁ, নিয়তি ছাড়া আর কি বলব।
চার্লসের মৃত্যুকে একটা দুর্ঘটনা ছাড়া আর কিছু বলা চলে না, আর এই দুর্ঘটনার কারণ হল একটি যন্ত্রের যান্ত্রিক ত্রুটি।
না, না, রাইফেল নয়, পিস্তল নয়, একটা ক্যামেরার দোষেই এই দুর্ঘটনা ঘটল– অর্থাৎ এক কথায় বলতে গেলে বলতে হয়, চার্লস কটারের মৃত্যুর জন্য দায়ী একটি ক্যামেরা।
মনে হচ্ছে অবিশ্বাস্য- তাই না?
কিন্তু বাস্তব সত্য অনেক সময়ে কল্পনাকেও অতিক্রম করে যায়। আচ্ছা, ঘটনাটা খুলেই বলছি।
চার্লস কটার একদিন রাইফেলের সঙ্গে ক্যামেরা ঝুলিয়ে বনের পথে যাত্রা করলে।
এই ক্যামেরার view-finder-টা খারাপ ছিল। (ক্যামেরার মধ্যে বসানো স্বচ্ছ কাঁচের মতো যে জিনিসটার ভিতর দিয়ে ক্যামেরাধারী ফোটো তোলার বিষয়বস্তুকে দেখতে পায় সেই অংশটিকে বলে view-finder)
ক্যামেরার সামান্য দোষ-ত্রুটি নিয়ে কটার মাথা ঘামায়নি, আর এইটুকু অন্যমনস্কতার জন্যই তাকে প্রাণ হারাতে হল।
জঙ্গলের পথে অকস্মাৎ কটারের চোখের সামনে আত্মপ্রকাশ করলে একটা মস্ত গণ্ডার।
কটার রাইফেল রেখে নিবিষ্ট চিত্তে গণ্ডারের ফোটো তুলতে লাগল। হতভাগা গণ্ডার।
সে ফটো তুলে দেওয়ার জন্য একটুও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করলে না, খঙ্গ উঁচিয়ে ধেয়ে এল কটারের দিকে।
আগেই বলেছি ক্যামেরার view-finder খারাপ ছিল। ক্যামেরার যান্ত্রিক চক্ষুর মধ্যে দিয়ে কটার দেখছে জন্তুটা অনেক দূরে আছে, কিন্তু আসলে তখন গণ্ডার খুব কাছে এসে পড়েছে।
কটার যখন তার বিপদ বুঝতে পারলে তখন আর সময় নেই- গণ্ডারের খঙ্গ প্রায় তার দেহ স্পর্শ করেছে।
সশব্দে অগ্নি-উদগার করলে কটারের রাইফেল সঙ্গেসঙ্গে গণ্ডারের সুদীর্ঘ খঙ্গ সেই অতিকায় নরদানবের দেহটাকে বিদীর্ণ করে দিলে।
কটারের মুখ থেকে একটা অস্ফুট আর্তনাদও শোনা গেল না, সে তৎক্ষণাৎ মারা গেল।
চালর্স কটার জীবনে কখনও পরাজয় স্বীকার করেনি, মৃত্যুকালেও জয়লক্ষ্মী তার কণ্ঠে পরিয়ে দিল জয়মাল্য।
মরার আগে কটার একবারই গুলি চালাবার সুযোগ পেয়েছিল, এবং সেই একটিমাত্র গুলির আঘাতেই কটারের আততায়ী মৃত্যুবরণ করলে।
চার্লস কটারের মৃতদেহের পাশেই লুটিয়ে পড়ল গুলিবিদ্ধ গণ্ডারের প্রাণহীন দেহ।
জনতার প্রতিনিধি
একদল হিংস্র নেকড়ের গুহার ভিতর যদি একটা বিড়াল বাচ্চা পথ ভুলে ঢুকে পড়ে তাহলে তার চালচলনটা কেমন হবে?
ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা না-থাকলেও অনুমান করা যায় যে মার্জার শাবক যে মুহূর্তে নেকড়েগুলোর অস্তিত্ব আবিষ্কার করতে পারবে সেই মুহূর্তে তার দেহের লোম খাড়া হয়ে উঠবে কাটার মতো এবং দুই চোখের ভীত বিস্ফারিত দৃষ্টি সঞ্চালন করে সে যে চটপট চম্পট দেওয়ার সোজা রাস্তাটা খোঁজার চেষ্টা করবে, এ-বিষয়ে ভুল নেই।
স্নেক ডলস সেলুন নামক পানশালার মেঝের ওপর দিয়ে দৃঢ় পদক্ষেপে এগিয়ে এসে যে কিশোরটি দোকানির কাছে এক গেলাস ঠান্ডা পানীয় চাইল, তার নির্বিকার মুখ এবং স্বচ্ছন্দ গতিভঙ্গি দেখে মনে হয় না যে এই মুহূর্তে স্থানত্যাগ করার ইচ্ছা তার আছে–
যদিও তার সর্বাঙ্গে একবার চোখ বুলিয়ে নিয়ে পানাগারের মধ্যস্থলে দৃষ্টিপাত করলেই নেকড়েবেষ্টিত মার্জার শাবকের কথা মনে পড়বে…
হ্যাঁ, নেকড়ে বই কী
কিংবা নেকড়ের চাইতেও ভয়ংকর মানুষগুলো আড্ডা জমিয়েছে পানাগারের মধ্যে।
পানশালার টেবিলের চারধারে টেবিলে টেবিলে গোল হয়ে বসে যে লোকগুলো তাস খেলছে অথবা পানভোজন করছে তাদের চোখে-মুখে মনুষ্যত্বের চিহ্ন নেই কিছুমাত্র–কঠিন চোয়ালের রেখায় রেখায় জ্বলন্ত চোখের তির্যক চাহনিতে যে বন্য হিংসার ছায়া উঁকি দিচ্ছে সেদিকে তাকালে ক্ষুধার্ত নেকড়ের কথা মনে হওয়া কিছুমাত্র বিচিত্র নয়।
এতগুলো সাংঘাতিক মানুষের মাঝখানে একটি নিরীহ চেহারার কিশোরকে দেখলে নেকড়েবেষ্টিত মাজার শাবকের কথাই মনে আসে।
স্নেক ডলস সেলুনের মানুষগুলো সেদিন তাই ভেবেছিল, বিড়ালছানার মতো তুচ্ছ করেছিল তারা ওই ছেলেটিকে। একটু পরেই তাদের ভুল ভাঙল ভয়ংকরভাবে–তপ্ত রক্তধারায় হল তাদের ভুলের প্রায়শ্চিত্ত।
তাই হয়।
রজ্জুতে সর্পভ্রম হলে ক্ষতি নেই, কিন্তু সর্পতে রজ্জ্বভ্রম করলে তার ফল হয় মারাত্মক।
সেই মারাত্মক ভুলের সূচনা জানিয়ে ঘরের কোণ থেকে ভেসে এল এক বিদ্রূপ জড়িত কণ্ঠস্বর, এই ছোঁড়াটা নিশ্চয়ই এখনও মায়ের কোলে শুয়ে দুধ খায়। হা! হা! হা! এই দুধের বাচ্চা হল আমেরিকা যুক্তরাজ্যের ডেপুটি মার্শাল! হো! হো! হো!
খোঁচাখাওয়া সাপ যেমন দ্রুতবেগে আততায়ীর দিকে ঝাঁপিয়ে পড়ে, ঠিক তেমনি বিদ্যুৎচকিত সঞ্চালনে ঘুরে দাঁড়াল কিশোর ছেলেটি চেয়ারে উপবিষ্ট লোকগুলির দিকে। সকলে দেখল তার বাঁ-হাতটা সামনের টেবিলের ওপর চেপে বসেছে আর ডান হাতের সরু সরু আঙুলগুলো বাজপাখির ছোঁ মারার ভঙ্গিতে নেমে এসেছে কোমরের খাপে ঢাকা রিভলভারের খুব কাছাকাছি।
