জঙ্গলের পথ ধরে এগিয়ে চলেছে চার্লস কটার।
আচম্বিতে গাছের উপরে ঘন লতাপাতার আড়াল থেকে তার ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ল দু-দুটো ছোটো জাতের লেপার্ড।
যে জানোয়ারটা কটারের সঙ্গে মল্লযুদ্ধে নিহত হয়েছিল এই লেপার্ড দুটো তারই পরিবারভুক্ত কি না জানি না, কিন্তু ঘটনাটা শুনলে এটাকে প্রতিশোধের ব্যাপার বলেই মনে হয়।
এমন অভাবিত ও অতর্কিত আক্রমণের জন্য কটার প্রস্তুত ছিল না। সমস্ত ব্যাপারটা সে যখন বুঝতে পারল তখন লেপার্ডের দাঁত ও নখের আঘাতে তার শরীর রক্তাক্ত হয়ে উঠেছে।
কিন্তু চার্লস কটার হচ্ছে চার্লস কটার।
মুহূর্তের মধ্যে সে কর্তব্য স্থির করে ফেললে।
হাতের রাইফেল আর কাজে লাগবে না বুঝে সে অস্ত্রটাকে মাটিতে ফেলে দিয়ে আক্রমণের মোকাবেলা করতে রুখে দাঁড়াল।
কটারের দ্রুত প্রতি-আক্রমণের জন্য লেপার্ড দুটো প্রস্তুত ছিল না, তারা ছিটকে গিয়ে শত্রুর পায়ের কাছে পড়ে গড়াগড়ি খেতে লাগল। সেই সুযোগে কটার চট করে একটা জানোয়ারের গলা চেপে ধরলে। এত জোরে কটার লেপার্ডটার গলা টিপে ধরেছিল যে জন্তুটার চোখে রক্ত জমে গেল।
কটারের শরীরও অক্ষত থাকল না। ধারালো নখের আঘাতে বিদীর্ণ ক্ষতমুখ থেকে ছুটল রক্তের ফোয়ারা- সুদীর্ঘ শ্বাপদ-দন্তের হিংস্র শুভ্রতাকে লাল করে দিয়ে সেই তপ্ত রক্তধারা গড়িয়ে পড়ল আক্রান্ত জন্তুটার হাঁকরা মুখের মধ্যে।
অন্য লেপার্ডটা কটারের খপ্পরে ধরা পড়েনি।
সে এবার পিছন থেকে শত্রুর পৃষ্ঠদেশ লক্ষ্য করে ঝাঁপ দিলে। কটার তখন প্রথম জানোয়ারটার সঙ্গে মারামারি করতে করতে হঠাৎ ঝুঁকে পড়েছে দুনম্বর লেপার্ডের লাফটা ফসকে গেল। লক্ষ্যভ্রষ্ট হওয়ার জন্য সে কটারের পিঠের উপর না পড়ে ছিটকে এসে পড়ল সঙ্গীর পিছনের দুটো পায়ের উপর।
সঙ্গী তখন কটারের কবলের মধ্যে ছটফট করছে আর লাথি ছুড়ছে। সেই সনখ থাবার একটি লাথি এসে লাগল দুনম্বর লেপার্ডের পেটে– সঙ্গে সঙ্গে ধারালো নখের আঁচড়ে বিদীর্ণ হয়ে গেল তার উদরের মাংসপেশী।
কটার সেই মুহূর্তের সুযোগ নিতে ছাড়াল না।
টপ করে হাত বাড়িয়ে সে দ্বিতীয় লেপার্ডটার কণ্ঠনালী চেপে ধরলে।
এইবার সমস্ত শরীরের শক্তি দিয়ে সে জন্তুটাকে মাটিতে চেপে ধরে গলা টিপে মারবার চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু লেপার্ডের দেহের মাংসপেশীগুলি শক্তিশালী স্প্রিং-এর মতে- চার্লস কটারের মতো মানুষের পক্ষেও তাদের মাটিতে চেপে রাখা অসম্ভব। জন্তুদুটো জোর করে ঠেলে উঠল, অতএব কটারও সোজা হয়ে দাঁড়াতে বাধ্য হল। কিন্তু প্রতিপক্ষের কণ্ঠনালীর উপরে তার আঙুলের চাপ একটুও শিথিল হল না।
…ধারালো নখের আঘাতে কটারের কাঁধ এবং হাত দিয়ে তখন ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটছে। এত রক্তপাতেও কটার অবসন্ন হল না বরং রক্ত দেখে তার মাথায় খুন চেপে গেল।
ক্রুদ্ধ চার্লস কটার এবার যা করলে তা প্রায় অবিশ্বাস্য।
একটা জন্তুর মাথার সঙ্গে সে আর একটা জন্তুর মাথা সজোরে ঠুকতে লাগল।
লেপার্ড দুটো কিন্তু এমন মার খেয়েও কাবু হলনা।
তারা ক্রমাগত ছটফট করতে করতে কটারের বজ্রমুষ্টি থেকে নিজেদের মুক্ত করার চেষ্টা করছে, আর তাদের থাবার ধারালো নখগুলি সমানে শত্রুর দেহে আঁচড় কেটে যাচ্ছে।
রক্তে লাল হয়ে উঠেছে কটারের সর্বাঙ্গ, লেপার্ড দুটোর শ্বাস রুদ্ধ হয়ে আসছে লৌহকঠিন আঙুলের নিষ্ঠুর পেষণে।
তবু কোনো পক্ষই পরাজয় স্বীকার করছে না।
কটারের সঙ্গে যে নিগ্রো সঙ্গীরা ছিল তারা প্রথমে পালিয়ে গিয়েছিল, কিন্তু পরে আবার ফিরে এসেছে। বিস্ফারিত চক্ষুর ভীত বিস্মিত দৃষ্টি মেলে তাকিয়ে আছে এই আশ্চর্য দৃশ্যের দিকে কিন্তু এখন আর কটারকে সাহায্য করার উপায় নেই, মানুষ ও পশু এমনভাবে পরস্পরকে
জড়িয়ে ধরে মারামারি করছে যে গুলি চালালে কটারও আহত হতে পারে।
অতএব তখন পরিস্থিতি হচ্ছে এই যে, যে পক্ষের সহ্যশক্তি বেশি সে পক্ষই জয়লাভ করবে।
চার্লস কটারের রক্তস্নাত দীর্ঘ দেহ যেন অফুরন্ত শক্তির আধার। সে হঠাৎ বুঝতে পারলে তার দুই শত্রুর দেহ অবশ হয়ে আসছে; তাদের থাবার আঁচড়ে, শরীরের আস্ফালনে আর আগের মতো জোর নেই।
মহা উল্লাসে কটার চিৎকার করে উঠল।
যে লেপার্ডটার উদর সঙ্গীর নখের আঘাতে বিদীর্ণ হয়ে গিয়েছিল তার ক্ষতস্থান থেকে তখন অবিরল ধারায় রক্ত ঝরে পড়ছে। কটারের অবস্থা তো আগেই বলেছি।
মানুষ ও পশুর রক্তে পিছল হয়ে উঠল রণভূমির ঘাস-জমি।
কটার যখন বুঝল তার শত্রুরা দুর্বল হয়ে পড়েছে, সে তখন লড়াইয়ের কায়দা বদলে ফেলল। হাতদুটো সোজা করে সে জন্তু দুটোকে এমনভাবে তুলে ধরলে যে তাদের থাবাগুলো আর তার দেহ স্পর্শ করতে পারলে না।
এইবার সে একটা গাছের গুঁড়ির সঙ্গে জন্তু দুটোর মাথা ঠুকতে লাগল।
… মাথার উপর পড়ছে প্রচণ্ড আঘাত, কণ্ঠনালীর উপর শ্বাস রোধ করে চেপে বসেছে লৌহকঠিন অঙ্গুলির নিষ্ঠুর বন্ধন
নিস্তেজ হয়ে এল দুই শাপদের হিংস্র আস্ফালন…
মুমূর্য জন্তু দুটোকে মাটির উপর আছড়ে ফেলে চার্লস কটার সোজা হয়ে দাঁড়াল।
সে এক আশ্চর্য দৃশ্য!
মাটির উপর মৃত্যুযাতনায় ছটফট করছে দু-দুটো লেপার্ড, আর তাদের পাশেই ক্ষতবিক্ষত রক্তাক্ত অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে এক মহাকায় মানুষ।
গল্পের টারজান কি কটারের চেয়েও শক্তিশালী?
