জে. হান্টার, জন মাইকেল প্রভৃতি শিকারি লেপার্ডকে আফ্রিকার সবচেয়ে বিপদজনক জানোয়ার বলেছেন। সিংহের মতো বিপুল দেহ ও প্রচণ্ড শক্তির অধিকারী না হলেও ধূর্ত লেপার্ডের বিদ্যুৎ-চকিত আক্রমণকে অধিকাংশ শিকারিই সমীহ করে থাকেন।
লেপার্ডের আক্রমণের কায়দা বড়ো বিশ্রী।
লতাপাতা ও ঘাসঝোপের আড়াল থেকে হঠাৎ বেরিয়ে এসে সে যখন বিদ্যুৎবেগে শিকারির ঘাড়ে লাফিয়ে পড়ে তখন আক্রান্ত ব্যক্তি অধিকাংশ সময়েই হাতের অস্ত্র ব্যবহারের সুযোগ পায় না। প্রথম আক্রমণেই লেপার্ড তার সামনের দুই থাবার তীক্ষ্ণ নখ দিয়ে শিকারির চোখ দুটোকে অন্ধ করে দেবার চেষ্টা করে, সঙ্গেসঙ্গে একজোড়া দাঁতালো চোয়ালের মারাত্মক দংশন চেপে বসে শিকারির কাঁধে, আর পিছনের দুই থাবার ধারালো নখগুলি ক্ষিপ্র সঞ্চালনে ছিন্ন-ভিন্ন হয়ে যায় হতভাগ্যের উদরদেশ।
এই হিংস্র অথচ সুন্দর জানোয়ারকে কটার অত্যন্ত ঘৃণা করত। সে প্রায়ই বলত, আঃ! ব্যাটাদের নখে কি ভীষণ ধার- আঁচড় দিলে মনে হয় যেন খুর চালাচ্ছে! শয়তানের বাচ্চা!
হ্যাঁ, একথা অবশ্য সে বলতে পারে।
তার হাত পায়ের যে অংশগুলি পরিচ্ছদের বাইরে দৃষ্টিগোচর হয় সেদিকে একনজর তাকালেই চোখে পড়ে অজস্র ক্ষতচিহ্ন অভিজ্ঞ মানুষ সহজেই বুঝতে পারে যে ক্রুদ্ধ লেপার্ডের নখের আঁচড়েই ওই গভীর ক্ষতচিহ্নগুলির সৃষ্টি হয়েছে।
একদিনের ঘটনা বলছি।
বনের মধ্যে একটা গাছের ডালে ঝুলছে মরা কুকুরের টোপ, আর খুব কাছেই ঝোপের আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে রাইফেল হাতে অপেক্ষা করছে কটার।
কুকুরের মাংস লেপার্ডের প্রিয় খাদ্য, কটার জানে মরা কুকুরের গন্ধে গন্ধে লেপার্ড আসবেই আসবে।
তা এল। একটু পরেই একটা লেপার্ড এসে উপস্থিত হল ঘটনাস্থলে।
জন্তুটার দিকে তাকিয়ে কটার হতাশ হল– লেপার্ডটা আকারে বেশি বড়ো নয়, তার গায়ের চামড়াটাও চার্লসের কাছে লোভনীয় মনে হল না।
গ্রামের আশেপাশে যে-সব লেপার্ড ঘোরাঘুরি করে তাদের দেহের আকার খুব বড়ো হয়না, গায়ের চামড়া হয় অনুজ্জ্বল, ফ্যাকাশে। কিন্তু ঘন জঙ্গলের মধ্যে যে লেপার্ডগুলি বাস করে সেগুলো সত্যিই বৃহৎ বপুর অধিকারী, তাদের চামড়াগুলি অতিশয় উজ্জ্বল ও সুন্দর। কটার আশা করেছিল একটি বেশ বড়োসড়ো অরণ্যচারী লেপার্ড তার ফাঁদে পা দেবে- এই জন্তুটাকে দেখে তার মেজাজ হয়ে গেল খাপ্পা।
লেপার্ড বড়ো ধূর্ত জানোয়ার।
সে কুকুরের মৃতদেহটাকে ভালো করে লক্ষ করলে, কিন্তু চট করে ভোজের জিনিসে মুখ দিলে না। কিছুক্ষণ পরে তার মনে হল এই ভোজটা বেশ নিরাপদ, এখানে কামড় বসালে বোধহয় বিপদের আশঙ্কা নেই- লেপার্ড নিচু হয়ে বসে পড়ল, এইবার একলাফে গাছে উঠে মরা কুকুরটাকে নামিয়ে আনবে।
চার্লসের মেজাজ আগেই খারাপ হয়েছিল। তবু সে আশা করেছিল জন্তুটা হয়ত চলে যেতে পারে। কিন্তু লেপার্ড যখন লাফ দিতে উদ্যত হল তখন আর তার ধৈর্য বজায় রইল না। ইচ্ছা করলে কটার অনায়াসেই গুলি করে লেপার্ডটাকে হত্যা করতে পারত, কিন্তু হাতের রাইফেল ফেলে দিয়ে সে হঠাৎ দৌড়ে এসে জন্তুটার পিছনে ঠ্যাং দুটো চেপে ধরলে।
পরক্ষণেই দুই সবল বাহুর আকর্ষণে লেপার্ডের শরীরটা শূন্যে নিক্ষিপ্ত হয়ে সশব্দে ভূমিশয্যায় আছড়ে পড়ল।
লেপার্ডের ঊর্ধ্বতন চোদ্দ পুরুষে কেউ কখনও এমন ব্যবহার সহ্য করেনি। আকারে ছোটো হলেও লেপার্ড হচ্ছে লেপার্ড, তুচ্ছ মানুষের হাতে আছাড় খেয়ে মুখের গ্রাস ফেলে পালিয়ে যেতে সে রাজি হল না–
ভীষণ আক্রোশে গর্জন করে সে শত্রুর উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। কটারের অস্বাভাবিক লম্বা হাত দুটো এড়িয়ে লেপার্ড শত্রুর দেহে দাঁত বসাতে পারলে না- লোহার মতো শক্ত দু-খানা হাত লেপার্ডের টুটি টিপে ধরলে।
সামনের থাবার ধারালো নখগুলি কটারের হাত দুখানা রক্তাক্ত করে দিলে, তবু লৌহ কঠিন অঙ্গুলির বন্ধন একটুও শিথিল হল না।
ঝটাপটি করতে করতে মানুষ এবং পশু মাটিতে গড়িয়ে পড়ল। লেপার্ডের পিছনের থাবাদুটিও নিশ্চেষ্ট রইল না, তীক্ষ্ণ নখের আঘাতে আঘাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল কটারের নিম্ন অঙ্গ।
কিন্তু তার অঙ্গুলিগুলি লেপার্ডের গলা থেকে সরে এল না।
অবশেষে কঠিন নিষ্পেষণে রুদ্ধ হয়ে এল জন্তুটার কণ্ঠনালী। উন্মুক্ত মুখ-গহ্বরের ভিতর থেকে উঁকি দিল দীর্ঘ দাঁতের সারি, আর সেই অবস্থায় নিঃশ্বাস নেবার ব্যর্থ চেষ্টা করতে করতে লেপার্ড প্রাণত্যাগ করলে।
চার্লস কটারের সর্বাঙ্গ থেকে তখন ঝরঝর ঝরছে গরম রক্তের স্রোত, টপ টপ করে গড়িয়ে পড়ছে সেই উষ্ণ তরল ধারা মৃত লেপার্ডের দেহের উপর।
চার্লস কটার এবার কী করবে?
ক্ষতগুলিতে ওষুধ দেবার জন্য এবার ফিরে যাবে বাড়িতে?
পাগল! কটার সে জাতের মানুষই নয়।
রক্তাক্ত ক্ষতগুলিতে মোটামুটি খানিকটা ব্যান্ডেজ লাগিয়ে সে পরবর্তী শিকারের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল।
একটু পরেই সেখানে এসে উপস্থিত হল আর একটি লেপার্ড। এবারের লেপার্ড আকারে খুব বড়ো, তার গায়ের চামড়াটিও খুব সুন্দর। কটার বুঝল এই জানোয়ারটা গভীর অরণ্যের বাসিন্দা নিশানা স্থির করে সে রাইফেলের ঘোড়া টিপল।
অব্যর্থ সন্ধান- একটিমাত্র গুলিতেই লেপার্ডের প্রাণহীন দেহ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
.
এই ঘটনার পরে কয়েকটা দিন কেটে গেছে।
