কিন্তু আইনই তো সব নয়! এমন সিংহদমন বীরপুরুষকে জেল খাটাবার ইচ্ছে আমার নেই।
এবার আমি যার কথা বলব সে আফ্রিকার বাসিন্দা বটে, কিন্তু আফ্রিকা তার স্বদেশ নয়।
নাম তার চার্লস কটার- আফ্রিকায় এসেছিল সে জীবিকার প্রয়োজনে।
আমেরিকার ওকলাহামা প্রদেশ ছিল কটারের জন্মভূমি।
আফ্রিকাতে আসার আগে সে ছিল ওখানকার শেরিফ।
ওকলাহামা বড়ো বেয়াড়া জায়গা।
কোনো আদর্শ ভদ্রলোক ওকলাহামাকে পছন্দ করবে না।
সেখানকার পথে ঘাটে ও দোকানে বাজারে যে মানুষগুলি ঘুরে বেড়ায় তারা খুব নিরীহ স্বভাবের নয়।
কথায় কথায় সেখানে ঝগড়া বাধে।
ঝগড়া বাধলে মীমাংসার প্রয়োজন।
ওকলাহামার মানুষ বেশি কথাবার্তা পছন্দ করে না, চটপট ঘুসি চার্লিয়ে তারা ঝগড়া বিবাদের মীমাংসা করে নেয়।
অনেকে আবার মুষ্টিবদ্ধ হস্তের পক্ষপাতী নয়- রিভলভারের ঘন-ঘন অগ্নিবৃষ্টির মুখে তারা বিবাদের নিস্পত্তি করতে চায়।
এমন চমৎকার জায়গায় শেরিফ হয়ে আইন-শৃঙ্খলা বজায় রাখতে হলে যেমন মানুষের দরকার ঠিক তেমন মানুষ ছিল চার্লস কটার।
যে-সব মানুষ বৃহৎ দেহের অধিকারী হয় সাধারণত তাদের চালচলন হয় মন্থর এবং শ্লথ, কিন্তু ছ-ফুট চার ইঞ্চি লম্বা এই নরদৈত্য ছিল নিয়মের ব্যতিক্রম।
প্রয়োজন হলে মুহূর্তের মধ্যে কোমর থেকে রিভলভার টেনে নিয়ে সে অব্যর্থ সন্ধানে লক্ষ্য ভেদ করতে পারত।
শেরিফের কাজ করে কটারের মনের গতি হয়েছিল খুব সহজ আর স্পষ্ট।
কোন মানুষকে সে হয় পছন্দ করবে আর নয় তো পছন্দ করবে না। এই পছন্দ অপছন্দের মাঝামাঝি কিছু নেই।
কাউকে অপছন্দ হলে সে তার উপরে প্রয়োগ করত মুষ্টিবদ্ধ হস্তের মুষ্টিযোগ চার্লস কটারের জীবন-দর্শনে একটুও জটিলতা ছিল না।
কটারের পেশীবহুল হাত দুখানা ছিল বেজায় লম্বা।
সেই অস্বাভাবিক দীর্ঘ দুই হাতে ছিল অমানুষিক শক্তি।
তার উপর তার দক্ষিণ হস্তে সর্বদাই থাকত একটা বেঁটে মোটা বাঁশের লাঠি এবং কোমরে ঝুলত গুলিভরা রিভলভার।
ওকলাহামার দুর্দান্ত গুণ্ডারা বুঝল, চার্লস কটার যতদিন শেরিফ আছে অন্তত সে কয়টা দিন তাদের আইন মেনে চলতে হবে।
কটার যখন স্বদেশের মায়া কাটিয়ে আফ্রিকাতে পাড়ি জমাল তখন নিশ্চয়ই ওকলাহামার গুণ্ডারা হাঁফ ছেড়ে বেঁচেছিল।
অবশ্য এটা আমার অনুমান কটারের জীবন-ইতিহাসের কোনো পাতায় ওকলাহামার অধিবাসীদের মনস্তত্ত্ব আলোচনা করা হয়নি।
আফ্রিকাতে এসে চার্লস কটার শিকারির পেশা অবলম্বন করলে। যে-সব লোকের শিকারের শখ আছে তারা দক্ষ পেশাদার শিকারির সাহায্য নিয়ে আফ্রিকার অরণ্যে প্রবেশ করে। নিয়োগকারীর সব রকম সুবিধা-অসুবিধা এবং নিরাপত্তার দায়িত্ব নেয় শিকারি এবং এই কাজের জন্য সে প্রচুর অর্থ পারিশ্রমিক পায়।
এই কাজে অর্থ-উপার্জনের যথেষ্ট সুযোগ থাকলেও কাজটা অতিশয় বিপদজনক। তবে চার্লস কটারের মতো মানুষের পক্ষে এই ধরনের পেশা পছন্দ হওয়াই স্বাভাবিক।
কটার ছিল বিবাহিত মানুষ। তার পরিবারটিও নেহাত ছোটো ছিল না। ছয়টি কন্যা এবং দুটি পুত্রসন্তান নিয়ে কটার প্রবল পরাক্রমে শিকারির ব্যবসা চার্লিয়ে যাচ্ছিল। সে সময় এইসব ব্যবসা-সংক্রান্ত কথাবার্তা চলত টেলিগ্রাফের সাহায্যে। অফিসের কেরানিদের মধ্যে একধরনের লোক দেখা যায় যারা আইনের প্যাঁচ লাগিয়ে সাধারণ মানুষকে ব্যতিব্যস্ত করে তোল। এই ধরনের কোনো-কোনো কেরানি যখন চিঠি লিখে চার্লস কটারকে আইন এবং শাসনতন্ত্র সম্বন্ধে উপদেশ দেবার চেষ্টা করত তখনই তার মেজাজ যেত বিগড়ে বন্দুকের বদলে কলম নিয়ে সে করত যুদ্ধ ঘোষণা।
আগেই বলেছি, চার্লসের জীবন-দর্শন ছিল খুব সহজ ও স্পষ্ট। গভর্মেন্টের বেতনভোগী কর্মচারীর সঙ্গে মারামারি করা যায় না তাই মূল্যবান উপদেশপূর্ণ চিঠিকে বাজে কাগজের ঝুড়িতে নিক্ষেপ করে চার্লস কাগজ কলম নিয়ে চিঠি লিখতে বসত।
তার চিঠির ভাষাও ছিল খুব সহজ—
মহাশয়,
আপনার চিঠিটা এইমাত্র আমার সামনে ছিল। এখন সেটা আমার পিছনে বাজে কাগজের ঝুড়ির মধ্যে অবস্থান করছে।
–চার্লস কটার।
এমন চমৎকার চিঠি পেলে কেউ খুশি হয় না।
পোস্ট অফিসের কেরানিরা এবং ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ কটারের উপর খঙ্গহস্ত ছিলেন। বেয়াড়া চিঠিপত্র লেখার জন্য প্রায়ই কটারের উপর আদালতের সমন জারি হত। আদালতে দাঁড়াতে হলেই তার মেজাজ হত খাপ্পা তখনকার মত বিচারকের নির্দেশ পালন করে সে ঘরে ফিরে আসত বটে, কিন্তু মহামান্য আদালত তার চরিত্র একটুও সংশোধন করতে পারেননি। বেয়াড়া চিঠিপত্র লেখার জন্য কটারকে বহুবার আদালতে দাঁড়াতে হয়েছে।
এই উদ্ধত মানুষটি তার জীবনে একাধিকবার লেপার্ডের সঙ্গে হাতাহাতি লড়াইতে নেমেছিল। হিংস্র শ্বাপদের শাণিত নখর তার দেহের বিভিন্ন স্থানে সুগভীর ক্ষতচিহ্ন এঁকে দিয়েছিল বটে, কিন্তু সেই জীবন-মরণ যুদ্ধে প্রত্যেকবারই বিজয়লক্ষ্মীর বরমাল্য দুলেছে চার্লসের কণ্ঠে।
এই প্রসঙ্গে লেপার্ড নামক জন্তুটির একটু পরিচয় দেওয়া দরকার।
ভারতবর্ষেও লেপার্ড আছে, বাংলায় তাকে চিতাবাঘ বলে ডাকা হয়। কিন্তু আফ্রিকার জঙ্গলে চিতা নামে বিড়াল-জাতীয় যে জানোয়ার বাস করে তার দেহচর্মের সঙ্গে লেপার্ডের কিছুটা সাদৃশ্য থাকলেও দেহের গঠনে ও স্বভাব-চরিত্রে চিতার সঙ্গে লেপার্ডের কোনোই মিল নেই– চিতা এবং লেপার্ড সম্পূর্ণ ভিন্ন জানোয়ার। চিতা লাজুক ও ভীরু প্রকৃতির পশু। লেপার্ড হিংস্র, দুর্দান্ত।
