আমার সার্জেন্টকে ডেকে প্রশ্ন করলাম, ব্যাপারটা কী?
সার্জেন্ট বললে, বাওয়ানা, এ লোকটা সাক্ষাৎ শয়তান! নইলে ভেবে দেখুন, আস্কারিদের গায়ে হাত তুলতে কেউ সাহস পায়!
আরও প্রশ্ন-উত্তরের ফলে সমস্ত ব্যাপারটা জানা গেল। আস্কারিরা গাঁয়ে ঢুকে লোকের জিনিসপত্র কেড়ে নেয়। আস্কারি হল রাজার লোক, যে কোন ব্যক্তিগত সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার অধিকার তাদের আছে এই হল আফ্রিকার অলিখিত আইন। স্থানীয় অধিবাসীরা আস্কারিদের বাধা দিতে ভয় পায়।
কিন্তু এই লোকটি ভয় পায়নি। সে প্রথমে আস্কারিদের ভালো কথায় বোঝাবার চেষ্টা করে। কিন্তু আস্কারিরা চিরকাল একরকম বুঝে এসেছে, আজ তারা অন্যরকম বুঝতে রাজি হবে কেন?
তখন সবচেয়ে বড়ো এবং আদিম যুক্তির প্রয়োগ শুরু হল বলং বলং বাহু বলং!
বাহুবলের প্রতিযোগিতার পরিণাম আগেই বলেছি।
দারুণ মার খেয়ে আস্কারিরা শেষে আমার কাছে নালিশ করলে। অবশ্য নিজেদের দোষ তারা স্বীকার করলে না, কিন্তু আমার জেরায় সব কিছুই প্রকাশ হয়ে পড়ল।
আমি লোকটিকে খুব দোষ দিতে পারলাম না।
বরং মনে মনে তাকে বাহবা দিলাম– চার-চারটে জোয়ান আস্কারিকে পিটিয়ে যে লোক তাদের হাত থেকে সঙিন কেড়ে নিতে পারে সে আলবৎ মরদ-কি বাচ্চা।
লোকটিকে একবার দেখা দরকার।
আমি গাঁয়ের দিকে যাত্রা করলাম।
গ্রামের মোড়লের সঙ্গে দেখা করে আমি জানতে চাইলাম কোন লোকটি আস্কারিদের গায়ে হাত দিয়েছে।
মোরদি? মোড়ল একগাল হাসলেন, সে এখন ঝোপের মধ্যে শিকারের খোঁজ করছে। হ্যাঁ, লোকটা একটা মানুষের মত মানুষ বটে! তার গায়ে জোর আছে, মাথায় বুদ্ধি আছে আর কলজেতে সাহসের অভাব নেই- মোরদি কাউকে ভয় করে না।
আমি গম্ভীরভাবে বললাম, এখন থেকে তাহলে তাকে ভয় করতে শিখতে হবে। আবার যদি সে আস্কারিদের গায়ে হাত তোলে তাহলে আমি তাকে ছাড়ব না, ঘাড় ধরে সোজা হাজতে ঢুকিয়ে দেব। কথাটা তাকে ভালো করে বুঝিয়ে দিও। সে ফিরলেই তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবে- এইসব অসভ্যতা আমি মোটেই সহ্য করব না।
মোড়ল আমার আদেশ পালন করেছিল।
মোরদি খবর পেয়ে সোজা এল আমার কাছে। ভালো করে লোকটির আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করলাম।
অল্পবয়সী জোয়ান। উনিশ কুড়ি বছর বয়স হবে। বিরাট বলিষ্ঠ দেহ, সম্পূর্ণ অনাবৃত, শুধু কটিদেশের আচ্ছাদন হয়ে ঝুলছে একটা রঙিন কাপড়, দুই বাহুর জড়ানো একজোড়া লৌহ অলঙ্কার নীরবে ঘোষণা করছে অলংকারের মালিক একজন যোদ্ধা, এবং তার পেশল বক্ষদেশে আঁকা রয়েছে নানা ধরনের চিত্র-বিচিত্র নকশা।
হ্যাঁ– একটা দেখবার মতো চেহারা বটে!
মোরদির হাতে কোনো অস্ত্র ছিল না।
সে উদ্ধত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বললে, আস্কারি? কতকগুলো কুকুর? পশুরাজ সিংহের সামনে দাঁড়িয়ে কুকুর যদি ঘেউ ঘেউ করে তাহলে সিংহ তাকে ক্ষমা করে না।
আমি আশ্চর্য হলাম, তার মানে?
তার মানে, সে তেমনি দৃপ্ত ভঙ্গিতে উত্তর দিলে, আমি কাউকে ভয় করি না। মানুষ কিংবা সিংহ কাউকেই আমি ভয় করি না।
তাই নাকি? আমি নীরস স্বরে বললাম, আর একবার যদি শুনি যে তুমি গভর্মেন্টের পোশাকধারী আস্কারিদের গায়ে হাত দিয়েছ, তাহলে আমিও তোমাকে একটি নতুন ধরনের জিনিস শিখিয়ে দেব।
-বটে! বটে! কী জিনিস শেখাবে?
আমি তোমায় শেখাব কেমন করে জেলখানাকে ভয় করতে হয়। বুঝেছ?
লোকটি স্থির দৃষ্টিতে আমার মুখের দিকে চাইল, তারপর ডান হাত তুলে অভিবাদন জানিয়ে বললে, ক্য হরি, বাওয়ানা। অর্থাৎ ঠিক আছে বাওয়ানা।
তারপর গর্বিত পদক্ষেপে সে স্থান ত্যাগ করে অদৃশ্য হয়ে গেল।
আমার হঠাৎ মনে হল যে দু-দুটো সিংহের হত্যালীলার সঙ্গে মোরদির একটা যোগসূত্র আছে। অবশ্য তাকে প্রশ্ন করে লাভ নেই একথা বোঝার মতো বুদ্ধি আমার ছিল চুপি চুপি একটি লোককে আমি মোরদিকে অনুসরণ করতে আদেশ দিলাম।
দিন তিনেক পরে আমার গুপ্তচর ফিরে এল।
তার মুখে যে সংবাদ শুনলাম তা যেমন আশ্চর্য তেমনই ভয়ঙ্কর। গুপ্তচর বললে, গ্রামের লোক মোরদিকে সিম্বা (সিংহ) বলে ডাকে। মোরদি নাকি সিংহের মাংস ভক্ষণ করে।
আমার গুপ্তচর দুদিন ধরে তার সম্বন্ধে নানারকম সংবাদ সংগ্রহ করেছে। কেবলমাত্র গত রাত্রিতে সে দূর থেকে মোরদিকে অনুসরণ করে।
চাঁদের আলোতে সব কিছু স্পষ্ট দেখা যাচ্ছিল। বিস্তীর্ণ তৃণভূমির অপরদিকে যেখানে অনেকগুলি মিমোসা গাছ জড়াজড়ি করে দাঁড়িয়ে আছে, হালকা ঘাসজমির উপর দিয়ে মোরদি সেইদিকে এগিয়ে গেল। একটা মিমোসা গাছে উঠে সে আত্মগোপন করলে।
আমার গুপ্তচর তখন দুর থেকে মোরদির কার্যকলাপ লক্ষ করছে। গাছের ডালপালার ভিতর লতাপাতার আড়ালে গা-ঢাকা দিয়ে হঠাৎ মোরদি জেব্রার কণ্ঠ অনুকরণ করে চেঁচিয়ে উঠল।
কয়েকটি মুহূর্ত। এবার তার কণ্ঠ ভেদ করে নির্গত হল ন্যুর কণ্ঠস্বর।
(ন্য এক ধরনের তৃণভোজী পশু। ন্যুর মাংস সিংহের প্রিয় খাদ্য)
গুপ্তচর সবিস্ময়ে শুনতে লাগল, মোরদি একবার জেব্রার মতো চিৎকার করে উঠছে আবার তারপরেই নুর কণ্ঠ অনুসরণ করে হাঁক দিয়ে উঠছে।
কিছুক্ষণ পরেই দুর জঙ্গল ভেঙে রঙ্গমঞ্চে আত্মপ্রকাশ করলেন পশুরাজ সিংহ। বনের রাজা একা আসেননি, তাঁর সঙ্গে রানিও এসেছেন। পশুরাজ বিন্দুমাত্র ইতস্তত করলে না। যে গাছ থেকে মোরদি চিৎকার করেছিল সিংহ সোজা সেই গাছটার দিকে ছুটে এল। সঙ্গে সঙ্গে একটা বর্শা বিদ্যুৎবেগে ছুটে এসে তার দেহটাকে এফোঁড়-ওফোঁড় করে দিলে।
