তবে, শ্বেতাঙ্গদের রাইফেল এইসব শক্তিশালী জানোয়ারদের অস্তিত্বকে বিপন্ন করে তুলেছে। সিংহ, লেপার্ড প্রভৃতি হিংস্র শ্বাপদের নিরাপত্তাও আজ বিপন্ন। আধুনিক রাইফেলের অগ্নিবৃষ্টির মুখে দন্ত ও নখরের প্রচণ্ড বিক্রম অধিকাংশ সময়েই ব্যর্থ হয়ে যায়।
সভ্য মানুষ এক সময়ে বুঝতে পারল যে এইভাবে শিকারের নামে হত্যাকাণ্ড চললে আফ্রিকার জানোয়ার নির্মূল হয়ে যাবে। তাই বন্য প্রাণীদের রক্ষা করার জন্য এই দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্থাপিত হল Sanctuary বা নিরাপত্তা অঞ্চল।
এই অঞ্চলগুলি পরিদর্শন করার জন্য স্থানীয় গভর্মেন্ট থেকে পেশাদার শিকারিদের মোটা মাইনে দিয়ে বনরক্ষকের পদে নিয়োগ করা হয়।
নিম্নলিখিত কাহিনিটি একজন ফরাসি বনরক্ষকের লিখিত বিবরণী থেকে তুলে দেওয়া হল।
লোকটির প্রকৃত নাম আমি উল্লেখ করতে চাই না, কারণ তাতে হয়ত তার শাস্তি হতে পারে। হ্যাঁ, একথা সত্যি যে লোকটি গুরুতরভাবে আইন ভঙ্গ করেছিল। কিন্তু আমি তাকে অপরাধী ভাবতে পারছি না।
আমাদের কাহিনির নায়কের সত্যিকারের নামটা বলা সম্ভব নয়। কিন্তু যা-হোক একটা নাম তো দরকার– আচ্ছা আমরা বরং তাকে মোরদি নামেই ডাকব।
কঙ্গোর উত্তর দিকে যে ভয়ঙ্কর যোদ্ধা-জাতি বাস করে, যারা কেবলমাত্র বর্শা হাতে নিয়ে উন্মত্ত হস্তীকে আক্রমণ করতে ভয় পায় না মোরদি ছিল সেই জাতিরই লোক। কোনো অজানা কারণে স্বজাতির সাহচর্য ছেড়ে এই লেক এডওয়ার্ড অঞ্চলে সে আশ্রয় গ্রহণ করেছিল…
আমি একটু অসুবিধায় পড়েছিলাম।
স্থানীয় অধিবাসীরা লেক এডওয়ার্ড অঞ্চলের তৃণভূমি এবং অরণ্যের মধ্যে চিরকাল শিকার করে এসেছে। এখন এই জায়গাটা হঠাৎ নিরাপত্তা অঞ্চলে পরিণত হওয়ায় এখানে পশুবধ নিষিদ্ধ। কিন্তু চিরকাল যা হয়েছে এখন আর তা চলবে না। এই সহজ কথাটা অধিবাসীরা সহজে বুঝতে চায় না। আমি এখানকার সহকারী বনরক্ষক, কাজেই আমার এলাকায় কোনও পশু নিহত হলে আইনত আমিই দায়ী; অথচ এখানকার নিগ্রো বাসিন্দাদের বাধা দেওয়াও খুব কঠিন।
সত্যি সত্যিই বনের মধ্যে লুকিয়ে লুকিয়ে হত্যাকাণ্ড চলছিল। এই অঞ্চলের কয়েকজন অসৎ ব্যবসায়ী এই হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত বলেই আমার বিশ্বাস। হাতির দাঁতের দাম বাজারে খুব বেশি, তাই অসাধু ব্যবসায়ীরা অবৈধভাবে হস্তী শিকার করে গজদন্তের ব্যবসা চালায়। আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে এই ধরনের ব্যবসা চালু আছে। একদল অসাধু ব্যবসায়ী এই অঞ্চলের নিগ্রোদের মোটা টাকা দিয়ে এমনভাবে বশ করেছিল যে তারা এখানে সেখানে বর্শার সাহায্যে হাতি মারতে শুরু করলে। এই পাজি ব্যবসায়ীরা নিজেরাও অনেক সময় রাইফেল ব্যবহার করত। শুধু হাতি নয়- খঙ্গধারী গণ্ডারের উপরেও এই শয়তানদের দৃষ্টি পড়েছে।
গণ্ডারের খড়্গ ভারতীয় ব্যবসায়ী মহলে খুব চড়া দামে বিক্রি হয়, তাই গজদন্ত ও খঙ্গের লোভে এই লোকগুলো নির্মমভাবে হত্যাকাণ্ড শুরু করেছে।
আমি প্রায়ই খবর পাই, ছুটে যাই এবং ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি অপরাধীরা চম্পট দিয়েছে, কেবল অকুস্থলে দন্তবিহীন গজরাজের মৃতদেহ অথবা খঙ্গহীন খঙ্গীর প্রাণহীন শরীর রক্তাক্ত মাটির উপর লুটিয়ে পড়ে মানুষের লোভের সাক্ষ্য দিচ্ছে।
এই শয়তানগুলোকে ধরার জন্য আমি দারুণ ছুটোছুটি করছি, স্নানাহার প্রায় বন্ধ এমন সময়ে আরম্ভ হল এক নতুন উৎপাত।
হঠাৎ একদিন শুনলাম নিরাপত্তা-অঞ্চলের এক জায়গায় দেখা গেছে নিহত সিংহের দেহ। অর্থাৎ আর একদল শিকারি এবার লুকিয়ে সিংহ-শিকার শুরু করেছে।
একে মনসা তায় ধুনোর গন্ধ। জিপ গাড়ি নিয়ে ছুটলাম ঠিক করলাম যদি ধরতে পারি লোকগুলোকে এমন ঠ্যাঙানি দেব যে–
কিন্তু ধরব কাকে?
ঘটনাস্থলে গিয়ে কোনও সূত্ৰই খুঁজে পেলাম না। কেবল দেখলাম একটা কেশরধারী সিংহের মৃতদেহ মাটিতে পড়ে আছে। আরও একটা আশ্চর্য ব্যাপার সিংহের চমৎকার চামড়াটা সম্পূর্ণ অক্ষত, শুধু তার দেহটাকে লম্বালম্বিভাবে চিরে দু-ফাঁক করে ফেলা হয়েছে এবং গোঁফগুলিও হত্যাকারী কেটে নিয়েছে। ব্যবসায়ী মহল থেকে কেউ যদি সিংহ শিকার করে তাহলে চামড়াটাকে সে নিশ্চয় ছাড়িয়ে নেবে- আমার ধারণা হল কোনও স্থানীয় জাদুকর ওঝা (witch doctor) এই সিংহটাকে মেরেছে।
সিংহের গোঁফ, হৃৎপিণ্ড, যকৃৎ প্রভৃতি দিয়ে এই সব ওঝারা নানারকম ক্রিয়াকাণ্ড করে। আমি খানিকটা নিশ্চিন্ত হলাম, ভাবলাম এটা একটা বিচ্ছিন্ন হত্যাকাণ্ড- এই নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
কিন্তু এক সপ্তাহ পরে যে খবর এল তা শুনেই আমার চোখ কপালে উঠল– জঙ্গলের মধ্যে নাকি আর একটা সিংহের মৃতদেহ দেখা গেছে। ঘটনাস্থলে গিয়ে দেখি, সেই একই ব্যাপার।
রক্তাক্ত মাটির উপর পড়ে আছে আর একটা সিংহের প্রাণহীন দেহ দেহটাকে ঠিক আগের মতোই লম্বা করে চিরে ফেলা হয়েছে।…
সেদিন রাতে ঘটল আর এক কাণ্ড।
আমার কয়েকজন আস্কারি (সশস্ত্র রক্ষী) গ্রাম থেকে ফিরে এসে জানাল যে একটা পাগল তাদের সবাইকে বেধড়ক ঠ্যাঙানি দিয়ে তাদের সঙিনগুলো কেড়ে নিয়ে একেবারে গ্রামের বাইরে তাড়িয়ে দিয়েছে।
কৌতূহল হল। চার-চারজন সশস্ত্র রক্ষীকে যে পাগল ধরে মার দিতে পারে সে কেমন পাগল একবার দেখা দরকার!
