মরণাহত সিংহ ভীষণ কণ্ঠে গর্জন করে উঠল। সিংহী পিছন ফিরে ঊর্ধ্বশ্বাসে দৌড় মারলে এবং কয়েক মুহূর্ত পরেই তার মস্ত শরীরটা ঘন জঙ্গলের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
সিংহ পলায়ন করলে না। যে গাছটায় মোরদি লুকিয়ে ছিল আহত সিংহ বারবার সেই গাছ বেয়ে ওঠার চেষ্টা করতে লাগল। প্রায় একঘণ্টা ধরে চলল বৃক্ষারোহণের ব্যর্থ প্রয়াস, তারপর রক্তপাতে অবসন্ন পশুরাজ মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, আর উঠল না।
তখন মোরদি গাছ থেকে নেমে এসে মৃত সিংহের বুকে ছোরা বসিয়ে দেহটাকে চিরে ফেললে। ফিনকি দিয়ে রক্ত ছুটল- ওই ভয়ঙ্কর মানুষ সেই তপ্ত রক্তধারা আকণ্ঠ পান করলে এবং বিদীর্ণ বক্ষপঞ্জর থেকে হৃৎপিণ্ডটা ছিঁড়ে এনে কচমচ করে চিবিয়ে খেতে লাগল।
সেই পৈশাচিক ভোজ শেষ হলে মোরদি উঠে দাঁড়াল চন্দ্রালোকিত তৃণভূমির উপর শুন্যে বশী আস্ফালন করে উন্মাদের তাণ্ডব-নৃত্যে মত্ত হয়ে উঠল, তীব্র তীক্ষ্ণ স্বরে সে বারংবার ঘোষণা করলে নিজের বীরত্ব কাহিনি। তারপর ঘটনাস্থল ত্যাগ করে গ্রামের দিকে চলে গেল।
সমস্ত ঘটনা শুনে আমি চুপ করে রইলুম।
গুপ্তচর বললে : বাওয়ানা, এই লোকটা নিজের মখে চেঁচিয়ে বলেছে সে আজ পর্যন্ত ছ-টা সিংহের হৃৎপিণ্ড খেয়েছে!
গুপ্তচর তার সংবাদ পরিবেশন করে বিদায় নিয়ে চলে গেল। আমি চুপচাপ বসে ভাবতে লাগলাম এই ভয়ঙ্কর নাটকের শেষ দৃশ্যটা কি হতে পারে…
কয়েকদিন পরেই অভাবিতভাবে মোরদির সঙ্গে আবার আমার দেখা হল।
একদিন সকালে অকস্মাৎ আমার গৃহে হল মোড়লের আবির্ভাব। ভাঙা ভাঙা ফরাসিতে মোড়ল আমায় যা বললে তার সারমর্ম হচ্ছে, আগের দিন সন্ধ্যায় এক প্রতিবেশীর ছাগল হঠাৎ মোরদির বাগানের মধ্যে অনধিকার প্রবেশ করেছিল। ছাগল যদি অনধিকার প্রবেশ করেই খুশি থাকত তাহলে হয়ত কিছু ঘটত না, কিন্তু ছাগলটা নিতান্তই ছাগল- সে মোরদির বাগানের কয়েকটা গাছ মুড়িয়ে খেয়ে ফেললে।
মোরদি ছাগলটাকে বেঁধে রাখল তার উঠানে।
প্রতিবেশী ছাগল ফেরত চাইতে এল।
মোরদি তাকে ছাগল দিলে না দিলে প্রহার।
প্রতিবেশীটি স্থানীয় লোক নয়, সে একজন ভারতীয় ব্যবসায়ী নাম রণজিৎ সিং। এই লোকটিও খুব নিরীহ প্রকৃতির মানুষ নয়, বিনা প্রতিবাদে মার খেতে সে রাজি হয়নি– ফলে প্রচণ্ড মারামারি।
মোড়ল এই ব্যাপারে হাত দিতে চাইলে না, সে আমার কাছে বিচার প্রার্থনা করলে।
আমি দুজনকেই ডেকে পাঠালুম।
রণজিৎ সিং খুব মার খেয়েছে, তার মুখে এখনও প্রহারের ক্ষতচিহ্ন বর্তমান। মোরদির মুখে কোনো দাগ নেই, শুধু ডান চোখটা একটু ফুলে উঠেছে।
মোরদি এসেই দম্ভের সঙ্গে জানিয়ে দিলে যে সে হচ্ছে সাক্ষাৎ সিম্বা। তার বিরুদ্ধে লাগলে সে কাউকে রেহাই দেবে না, পশুরাজ সিংহের রক্তপান করে সে সিংহের চেয়েও বলশালী।
রণজিৎ সিং হঠাৎ বলে উঠল, হা হা গাছের উপর থেকে অস্ত্র ছুঁড়ে যে সিংহ বধ করে সে তো মস্ত বীরপুরুষ! তারপর সেই সিংহের রক্তপান করার মতো কঠিন কাজ বীরের পক্ষেই সম্ভব! কিন্তু বাওয়ানা, বীরপুরুষকে আদেশ করুন আমার ছাগলটা যেন সে ফেরত দেয়।
মোরদির মুখ চোখ ভয়ঙ্কর হয়ে উঠল। আমি ভাবলুম, এই বুঝি সে রণজিতের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে।
মোরদি সে রকম কিছু করলে না।
ভ্রূকুটি-কুটিল দৃষ্টিতে সে প্রতিপক্ষকে একবার নিরীক্ষণ করল। তারপর শুষ্ক কঠিন স্বরে বললে, ছাগল আমি এখনই দিয়ে দিচ্ছি। তবে জেনে রাখো, মোরদি মাটিতে দাঁড়িয়েও সিংহের মোকাবেলা করতে পারে… আচ্ছা, এখন আমি কিছু বলতে চাই না, তবে…
ভীষণ আক্রোশে মোরদির কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে এল।
রণজিতের দিকে একটা জ্বলন্ত কটাক্ষ নিক্ষেপ করে সে দ্রুত পদক্ষেপে অন্তর্ধান করলে।
মোরদির উদ্দেশ্য বুঝতে আমার একটুও অসুবিধা হয়নি। রণজিতের বিদ্রূপ একেবারে প্রতিপক্ষের মর্মস্থলে আঘাত করেছে। আমি বুঝলাম আজ রাতে মোরদি পশুরাজ সিংহের সঙ্গে দ্বন্দ্বযুদ্ধে অবতীর্ণ হবে।
সিংহের সঙ্গে বোঝাপড়া শেষ করে ফিরে এসেই মোরদি রণজিৎকে ধরে বেধড়ক ধোলাই দেবে এ-কথা বুঝতেও আমার বিশেষ অসুবিধা হয়নি।
কিন্তু সে তো পরের কথা এখন এই উন্মাদ মোরদিকে নিয়ে কী করি? সত্যি-সত্যি যদি সে বর্শা হাতে মাটির উপরে দাঁড়িয়ে সিংহের সম্মুখীন হয় তাহলে তার পরিণাম কি হবে সে বিষয়ে আমার একটুও সন্দেহ ছিল না। বর্শার খোঁচা খেয়ে পশুরাজ মোরদিকে ছেড়ে দেবে না– ক্ষিপ্ত শ্বাপদের আক্রমণে টুকরো টুকরো হয়ে যাবে তার সর্বাঙ্গ।
আমি একজন গুপ্তচরকে ডেকে গোপনে মোরদির উপর নজর রাখতে আদেশ দিলাম।
রাত তখনও গম্ভীর হয়নি, আমার গুপ্তচর এসে জানালে, মোরদি বর্শা হাতে সিংহের উদ্দেশ্যে বনের দিকে যাত্রা করেছে।
আঃ! জ্বালালে!
এই নির্বোধটাকে বাঁচাবার জন্য বিছানা ছেড়ে এখনই আমায় ছুটতে হবে বনবাদাড়ে।
মোরদির উপর যতই রাগ হোক, জেনে শুনে একটা লোকের অপমৃত্যু ঘটতে দেওয়া যায় না।
দূরবীন এবং রাইফেল নিয়ে কয়েকজন আস্কারির সঙ্গে আমি বেরিয়ে পড়লাম।
বিস্তীর্ণ তৃণভূমির বুকের উপর গলিত রজতধারার মতো জ্বলছে জ্যোৎস্নার আলো, আর সেই রুপালি আলোর চাদরের উপর ফুটে উঠেছে অনেকগুলি কালো কালো সচল বিন্দু।
সচল বিন্দুগুলি আর কিছু নয়– অনেকগুলি ধাবমান মানব দেহ। গাঁয়ের লোক আজ দল বেঁধে মোরদির সঙ্গে সিংহের লড়াই দেখতে এসেছে।
