উঁচু-নীচু পাথরের মধ্য দিয়ে সরু একটা পথ উঠে গেছে উপর দিকে পাহাড়ে উঠতে হলে ওই একটি রাস্তা ছাড়া অন্য পথ নেই। শয়তানের দল সেই পথ বেয়ে তিরবেগে উঠে আসতে লাগল। নিজেদের মধ্যে ধাক্কাধাক্কি করে কয়েকটা কুকুর ছিটকে পড়ল নীচে।
আমি কাফাতোকে ইঙ্গিত করলুম। সে সামনের কুকুরটাকে বর্শা দিয়ে চেপে ধরল পাহাড়ের গায়ে। কুকুরটার রোমশ দেহের উপর এক বোতল কেরোসিন ঢেলে দিয়ে আমি একটা দেশলাই কাঠি জ্বালিয়ে ফেলে দিলুম। বিকট চিৎকার করে জন্তুটা পাহাড়ের উপর দিয়ে গড়াতে গড়াতে নীচে গিয়ে পড়ল।
এইভাবে পর পর ছয়টা কুকুর উঠে এল আমাদের সামনে এবং তারা প্রত্যেকেই অগ্নিদেবের জ্বলন্ত আশীর্বাদ শরীরে বহন করে গড়িয়ে পড়ল পাহাড়ের নীচে।
অবশিষ্ট কেরোসিন পাহাড়ের সরু পথের উপর ঢেলে একটি জ্বলন্ত দেশলাই-এর কাঠি ফেলে দিলুম। দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। সেই তরল অগ্নিস্রোতের উপর দিয়ে উঠে আসার ক্ষমতা কোনো প্রাণীর নেই।
আমরা একেবারে পাহাড়ের চূড়ায় উঠে বসে নীচের দিকে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলুম।
পাহাড়ের আগুন তখন নিভে এসেছে, কিন্তু দুরে অনেক নীচে কতকগুলি আগুনের গোলা ছুটছে, লাফাচ্ছে, গড়াচ্ছে। যে কুকুরগুলির শরীরে আগুন লেগেছে তারা অসহ্য যন্ত্রণায় দাপাদাপি করছে।
ধীরে ধীরে আগুন নিভে গেল, বাতাসে ভেসে এল দগ্ধ বোম ও মাংসের কটু গন্ধ!
অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় দেখা গেল কয়েকটা সাদা সাদা ভুতুড়ে ছায়া মৃত কুকুরগুলির দেহ নিয়ে টানাটানি করছে ওহিওর সাদা শয়তান জাতভাই-এর মাংস খেতেও আপত্তি করে না।
.
রাত্রি প্রভাত হল।
পাহাড়ের উপর থেকে এতক্ষণ নামতে সাহস হয়নি। দিনের আলোয় যখন ভালো করে দেখলুম আশেপাশে একটিও জ্যান্ত কুকুর নেই তখন সাবধানে নীচে নেমে এলুম। প্রতি মুহূর্তে ভয় হয়েছে এই বুঝি শয়তানের দল তাড়া করে আসে। কিন্তু ভয়ের কোনো কারণ ছিল না। দিনের আলোয় কুকুরগুলি বিশ্রাম নিতে গেছে, এক রাতের অভিজ্ঞতার ধাক্কা সামলাতে তাদেরও বেশ খানিকটা সময় যাবে।
নীচে নেমে দেখলুম এদিক-ওদিক ছড়িয়ে আছে অনেকগুলি কুকুরের মৃতদেহ। কতকগুলি কুকুরের ছিন্নভিন্ন দেহ দেখে বুঝলাম তাদের দেহের মাংসে তাদের স্বজাতিরাই উদর পূরণ করেছে। আবার কতকগুলির শরীর আগুনে পুড়ে কালো হয়ে গেছে।
তবে কয়েকটা চামড়া একেবারেই অটুট পেয়ে গেলুম। শুধু বুলেট এবং বর্শার ক্ষতচিহ্ন ছাড়া ওই চামড়াগুলিতে আর কোনো দাগ পড়েনি।
আমি আর কাফাতো কয়েকটা চামড়া ছাড়িয়ে নিয়ে একটা গ্রামে এসে পৌঁছলুম। আমার সমস্ত শরীর তখন ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে কিন্তু কাফাতোর বেতের মতো পাকানো দেহে অবসাদের কোনো চিহ্ন নেই- একদল লোক নিয়ে সে হই হই করে চলল সেই পাহাড়ের নীচে যেখানে পড়ে আছে কুকুরগুলির মৃতদেহ।
কুকুরের মাংসে সেদিন রাতে এক চমৎকার ভোজ হল ঝলসানো মাংস আমিও একটু চেখে দেখলুম। বললে বিশ্বাস করবে না, কুকুরের মাংসের রোস্ট ঠিক কুকুরের মাংসের মতোই, একটুও অন্যরকম নয়!
গ্ল্যাডিয়েটরের মৃত্যু নেই
গ্ল্যাডিয়েটরের যুগ শেষ হয়ে গেছে।
হ্যাঁ শেষ হয়ে গেছে, লুপ্ত হয়ে গেছে আজ দুনিয়ার রঙ্গমঞ্চ থেকে সেই বৃষস্কন্ধ শক্তিমান মানুষগুলো অস্ত্রের শাণিত ফলকে, রুধিরের রক্তিম অক্ষরে ইতিহাস যাদের নাম রেখেছে গ্ল্যাডিয়েটর।
একখানা বর্শা বা তরবারি মাত্র সম্বল করে যারা হিংস্র শ্বাপদের সঙ্গে মরণপণ যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে একটুও ইতস্তত করত না, যাদের গর্বিত পদক্ষেপে কেঁপে-কেঁপে উঠত রোম এবং গ্রিসের ক্রীড়ামঞ্চ, হাজার হাজার দর্শকের উদগ্রীব দৃষ্টির সম্মুখে যারা বারংবার আলিঙ্গন করত নিশ্চিত মৃত্যুকে গ্ল্যাডিয়েটর নামধারী সেই ভয়ঙ্কর মানুষগুলো আজ দুনিয়ার বুক থেকে মুছে গেছে, শেষ হয়ে গেছে গ্ল্যাডিয়েটরের যুগ…
কিন্তু সত্যিই কি তাই?
অতীতের কবর খুঁড়ে বিদেহী গ্ল্যাডিয়েটরের প্রেতাত্মা কি আজও হানা দেয় না বিংশ শতাব্দীর বুকে?
হ্যাঁ, হানা দেয়। ফিরে আসে গ্ল্যাডিয়েটর ভিন্ন দেহে, ভিন্ন নামে তারা আত্মপ্রকাশ করে পৃথিবীর বিভিন্ন স্থানে।
মোরদি হচ্ছে এমনই একটি লোক যাকে আমরা অনায়াসে আখ্যা দিতে পারি আধুনিক গ্ল্যাডিয়েটর।
ইতিহাসের পৃষ্ঠা থেকে আমরা জানতে পারি যে প্রাচীন রোমের ক্রীড়ামঞ্চে মাঝে মাঝে শ্বেতাঙ্গ গ্ল্যাডিয়েটরদের সঙ্গে কালো চামড়ার যযাদ্ধারাও মৃত্যু-উৎসবে মেতে উঠত।
আমাদের বর্তমান কাহিনির নায়কও শ্বেতাঙ্গ নয়, নেহাত কালা বাদামি– বিংশ শতাব্দীর কৃষ্ণকায় গ্ল্যাডিয়েটর।
কাহিনি শুরু করার আগে আফ্রিকা সম্বন্ধে কয়েকটা কথা বলা দরকার।
এই মহাদেশের বিস্তীর্ণ তৃণভূমির বুকে বাস করে অ্যান্টিলোপ, জেব্রা, জিরাফ, হস্তী, গণ্ডার, মহিষ প্রভৃতি তৃণভোজী পশু এবং এই তৃণভোজীদের মাংসের লোভে ঘন অরণ্যের ছায়ায় ছায়ায় হানা দিয়ে ফেরে সিংহ, লেপার্ড, হায়না প্রভৃতি হিংস্র জানোয়ার।
বনচারী পশুদের শিং, দাঁত, নখ ও চামড়ার উপর শ্বেতাঙ্গদের লোভ বড়ো বেশি। ইউরোপ আমেরিকার বিভিন্ন ভূখণ্ড থেকে আফ্রিকায় এসে শ্বেতাঙ্গরা শিকারের নামে নির্বিচারে হত্যাকাণ্ড চার্লিয়ে যায়। হত্যালীলার জন্য অবশ্য কেবলমাত্র সাদা চামড়ার মানুষদের দায়ী করা উচিত নয় আফ্রিকার কালো চামড়ার মানুষগুলোও এজন্য যথেষ্ট দায়ী। এখানকার কৃষ্ণকায় নিগ্রো অধিবাসীরা অতিশয় মাংস প্রিয়। তাদের তীর ধনুক ও বর্শার মুখে নিরীহ অ্যান্টিলোপ প্রভৃতি পশু প্রায়ই মারা পড়ে। শক্তিশালী তৃণভোজীরা কখনো কখনো মাংস-লোলুপ নিগ্রোদের দ্বারা আক্রান্ত হয় বটে কিন্তু মহাকায় হস্তী, খঙ্গধারী গণ্ডার ও ভয়ঙ্কর মহিষাসুরকে আদিম অস্ত্রের সাহায্যে মাঝে মাঝে ঘায়েল করা সম্ভব হলেও একেবারে নির্মূল করা অসম্ভব।
