ততক্ষণে পোশাকের আবরণ থেকে মুক্ত হয়েছে জো। তার পরনে জার্মান বন্দির মতোই একটা ছোটো হাফ প্যান্ট এমনকী পায়ের ভারী বুট দুটো খুলে ফেলা হয়েছে। জুতো পায়ে লাথি মারার সুযোগ নিতে চায় না জো, তার একমাত্র ভরসা মৃত্যুবাহী ক্যারাটে।
ঠিক আছে, মুর্খ আমেরিকান শুয়োর, নাজি গর্জন করে উঠল, আমি ভদ্রতা শেখার জন্য প্রস্তুত।
লোকটার চোখে-মুখে একটা হিংস্র দীপ্তি জ্বলে উঠল, কিন্তু সে এগিয়ে এল না, প্রতিদ্বন্দ্বীর আক্রমণের জন্য অপেক্ষা করতে লাগল। জো একটু অবাক হল, লোকটার মতলব সে বুঝতে পারল না।
আচম্বিতে বিস্ময়ের চমক! ক্যারাটে! এই লোকটাও ক্যারাটে-যোদ্ধা! যেভাবে ডান পায়ের আঙুলগুলো গুটিয়ে নিয়ে সে লাথি চালাল তাতে প্রমাণ হয়ে গেল ক্যারাটের মরণ খেলায় সেও এক খেলোয়াড়।
চিবুকের উপর প্রচণ্ড পদাঘাতে ছিটকে পড়ল জো লার্কিন!
আর একটু হলেই ঘাড় ভাঙত, কোনোরকমে আত্মরক্ষা করে জো উঠে দাঁড়াল। ভালোভাবে টাল সামলে দাঁড়ানোর আগেই সে দেখতে পেল জার্মান বন্দি তাকে আক্রমণ করতে আসছে। চকিতে পিছন ফিরে পায়ের গোড়ালি দিয়ে আঘাত হানল জো। ঠিক জায়গায় সেই আঘাত লাগলে লড়াইয়ের মোড় তখনই ঘুরে যেত, তবে জো-র লাথিটা একেবারে ব্যর্থ হল না–নাজির দম বেরিয়ে গেল, সে থমকে দাঁড়াল মুহূর্তের জন্য।
লোকটা সত্যিই কঠিন ধাতুতে গড়া, আর তেমনি চটপটে। জো ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই নাজি তাকে জড়িয়ে ধরে এমনভাবে ছুঁড়ে ফেলল যে, জো দস্তুরমতো যন্ত্রণা ভোগ করল। অবশ্য জো মুহূর্তের মধ্যেই উঠে দাঁড়িয়েছিল এবং তলপেট লক্ষ করে প্রাণঘাতী লাথিটা এড়িয়ে গিয়েছিল। ব্যর্থ হয়ে বন্দি আবার জোর চিবুক লক্ষ করে লাথি হাঁকাল আর একটুর জন্য ফসকে গেল। জো ততক্ষণে বুঝে গিয়েছে, লোকটা ক্যারাটে জানে এবং যথেষ্ট ক্ষিপ্র, তবে সে পাকা খেলোয়াড় নয়।
সেই মুহূর্তে নাজি যেভাবে অবস্থান করছিল, তাতে জো-র পক্ষে তার চিবুকে কনুই দিয়ে আঘাত করার সুবর্ণ সুযোগ উপস্থিত। বলাই বাহুল্য, জো সেই সুযোগ নিতে একটুও দেরি করেনি। নাজি বন্দি চোখে সর্ষে ফুল দেখতে দেখতে বসে পড়ল। সঙ্গেসঙ্গে জো ক্যারাটের বিশেষ পদ্ধতিতে পদাঘাত করল শত্রুর মুখে। জার্মান সৈন্যের নাক ভেঙে গেল তৎক্ষণাৎ।
আহত নাজি সেনা দারুণ আক্রোশে লাফিয়ে উঠল, তারপর ধেয়ে এল জো-কে আক্রমণ করতে। সে কিছু করার আগেই তার কণ্ঠনালীতে হাতের তালু দিয়ে কাটারির মতো আঘাত হানল জো। যন্ত্রণায় জার্মানটির মুখ নীল হয়ে গেল।
লড়াইয়ের পরবর্তী বিবরণ এমন নিষ্ঠুর যে, সেই বর্ণনা পাঠকের মনকে পীড়িত করবে। সংক্ষেপে বলছি, সৈন্যটিকে অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে অবশেষে তাকে হত্যা করেছিল জো। সকালের আলোতে জার্মান সৈন্যটির মৃতদেহের অবস্থা দেখে জো নিজেও শিউরে উঠেছিল।
লড়াইয়ের উন্মাদনা তখন কেটে গেছে, হত্যার নির্দয় লালসা তৃপ্ত হওয়ায় জো লার্কিনের বুকের মধ্যে আবার ঘুমিয়ে পড়েছে হন্তারক দানব অনুতপ্ত জো ক্যাপ্টেন জোন্সের কাছে গিয়ে সব কথা খুলে বলল। কী অসহ্য যন্ত্রণা দিয়ে লোকটাকে সে হত্যা করেছে, তার বিশদ বিবরণ দিয়েছিল জো। সেই বিবরণ (পাঠকদের কাছে আমি যা বর্ণনা করিনি) শুনে স্তম্ভিত হয়ে গিয়েছিল ক্যাপ্টেন জোন্স।
পরবর্তীকালে সেনাবিভাগের কাজে ইস্তফা দিয়ে নাগরিকদের জীবন গ্রহণ করল জো লার্কিন। এমন একটা অফিসে সে কাজ নিয়েছিল যেখানে কারো সঙ্গে মারামারি হওয়ার সম্ভাবনা সুদূরপরাহত।
জো লার্কিনের সংক্ষিপ্ত কাহিনি এখানেই শেষ। কৌতূহলী পাঠকের মনে এই প্রশ্ন আসতে পারে, ক্যারাটের অভিশাপ থেকে জো কি আজ মুক্ত? জো নিজেও এই প্রশ্নের উত্তর দিতে সমর্থ নয়। তবে পরিশিষ্ট হিসাবে তার নিজস্ব বক্তব্য তার জবানিতেই পরিবেশন করছি :
পাঠক! একটা কথা বলে আপনাকে সতর্ক করে দিচ্ছি। আমার প্রকৃত নাম জো লার্কিন নয়। আপনি যদি শক্তিশালী হন আর গায়ের জোর দেখাতে গুন্ডামি করতে ভালোবাসেন, আর সেইজন্যই যদি কোনো রাত্রে কোনো রেস্তরাঁ বা পানাগারের মধ্যে খুব শান্তশিষ্ট একটি লোককে আপনার যাবতীয় অসভ্যতা সহ্য করে প্যান্টের পকেটে হাত ঢুকিয়ে অত্যন্ত গোবেচারার মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন, তবে
তবে বেশি বাড়াবাড়ি করবেন না। কারণ আমার দৈহিক ক্ষমতা এখনও অটুট, আর একবার মারামারি বাধলে আমি শেষ না-দেখে থাকতে পারি না।
[১৩৮৭]
গল্পের চেয়েও ভয়ংকর
ঘুম ভেঙে গেল..
ঘুম ভেঙে যাওয়া কিছু আশ্চর্য নয়।
সেই বীভৎস চিৎকার কানে গেলে জ্যান্ত মানুষ তো দূরের কথা, বোধ হয় কবরের মড়াও বাপ রে বলে কবরের মধ্যে ধড়মড়িয়ে উঠে বসত…
ঘুমের ঘোর তখনও চোখ থেকে কাটে নি, আমার স্তম্ভিত দৃষ্টির সম্মুখে ফুটে উঠল এক ভয়ংকর দৃশ্য!
ভালো করে চোখ মুছে চাইলুম– না, দুঃস্বপ্ন নয়, নিশ্চিত মৃত্যুর পরোয়ানা নিয়ে আমাদের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে অনেকগুলি চতুষ্পদ জীব- তাদের রোমশ দেহের সাদা সাদা চামড়ার উপর নাচছে অগ্নিকুণ্ডর রক্তিম আলোকধারা, জ্বলন্ত কয়লার মতো চোখে চোখে জ্বলছে ক্ষুধিত হিংসার নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি!
কাফাতো হাতের বর্শা বাগিয়ে ধরে একটু ঝুঁকে দাঁড়াল, ঠান্ডা গলায় বললে, মি. ম্যাক, বাঁচার আশা রেখো না, সাদা শয়তানের দল যাকে ঘিরে ধরে তার নিস্তার নেই। তবে মরার আগে মেরে মরব।
