ক্যারাটে শিক্ষায় ওই ভঙ্গিকে বলে নাকিতে–অতি ভয়ংকর ওই খোলা আঙুলের নিষ্ঠুর আঘাত।
জো আঘাত হানল। বন্দির নাকের দু-পাশ দিয়ে সটান দুই চোখে খোঁচা মারল আঙুলগুলো। তৎক্ষণাৎ বন্দির দুই চক্ষু হল রক্তাক্ত, অন্ধ।
ওইভাবে আঘাত হানার কৌশল শিখলেও হাতেনাতে কখনো সেই শিক্ষাকে প্রয়োগ করার সুযোগ পায়নি জো। আঙুলগুলোকে লোহার মতো শক্ত করে নির্ধারিত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়েছে সে ক্যারাটে শিক্ষার বিদ্যালয়ে, কিন্তু আঘাত হানতে পারেনি কারণ, অংশীদার সহকর্মীর বিপদ ঘটতে পারে। এতদিন পরে ওই ভয়ংকর কৌশলকে বাস্তবে বাস্তবায়িত করবার সুযোগ পেল জো।
বন্দির অবস্থা তখন শোচনীয়। জো-র বন্ধুরাও তার নিষ্ঠুরতা দেখে চমকে গেছে। ক্রুদ্ধ বিস্ময়ে আতঙ্ক-বিস্ফারিত দৃষ্টি মেলে তারা তাকিয়ে আছে জোর দিকে। যাতনাকাতর অন্ধ বন্দি তখন অসহায়ভাবে আর্তনাদ করছে অস্ফুট কণ্ঠে–হিংস্র পশুর মতো জো তার ওপর লাফিয়ে পড়ল। প্রথমে বন্দির বাঁ-হাত, তারপর ডান হাত ভাঙল জো। সঙ্গেসঙ্গে ক্রুদ্ধ প্রতিবাদে মুখর হয়ে উঠল জো-র সহকর্মী সৈনিক ছয়জন। জো বুঝল, বন্দির উপর আর অত্যাচার করলে সৈন্যরাই খেপে যেতে পারে। ছয়টি রাইফেলধারী মানুষকে উত্তেজিত করা ক্যারাটে–যযাদ্ধার পক্ষেও বিপজ্জনক, অতএব জো হাতের কাজ শেষ করতে সচেষ্ট হল। মৃত্যুবাহী ক্যারাটের এক দারুণ আঘাতে বন্দির নাকের হাড় ভেঙে মগজে প্রবেশ করল, হতভাগ্যের মৃত্যু হল তৎক্ষণাৎ।
ক্যারাটের নিয়ম লঙ্ঘন করেছিল জো। আত্মরক্ষার জন্যই ওই অদ্ভুত প্রাচ্যদেশীয় রণকৌশল শিক্ষা দেওয়া হয়। কিন্তু জো তার বিদ্যাকে প্রয়োগ করেছিল অন্তরে নিহিত হিংস্র উল্লাস চরিতার্থ করার জন্য। এবং সেইজন্য সে অনুতপ্ত হয়নি কিছুমাত্র।
যথাসময়ে সদরে রিপোর্ট গেল বন্দি নাকি পলায়নের চেষ্টা করেছিল, তাই তাকে হত্যা করা হয়েছে। জো-র সঙ্গীরা চুপ করে রইল। জার্মানদের চাইতেও সার্জেন্ট জো লার্কিন সম্পর্কে তাদের ভীতি ছিল অনেক বেশি।
কিছুদিন পরে আবার ক্যারাটেকে কাজে লাগানোর সুযোগ পেল জো লার্কিন। একটি জার্মান ক্যাপ্টেনকে মার্কিন সেনানিবাসে বন্দি করে আনা হয়েছিল। লোকটা ঝটিকা-বাহিনীর ক্যাপ্টেন, হিটলারের অন্ধ ভক্ত, গোঁড়া নাজি–শত্রুপক্ষের প্রত্যেকটি মানুষ তার কাছে অতিশয় ঘৃণ্য।
ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের আদেশ অনুসারে মার্কিন বাহিনীর ক্যাপ্টেন জোন্স ওই নাজি বন্দিকে কয়েকটা প্রশ্ন করে। জোন্স আদর্শ ভদ্রলোক, প্রশ্ন করার আগে বন্দির হাতে সে এক গেলাস মদ তুলে দিয়েছিল। হতভাগা নাজি এমন ভালো ব্যবহারের মূল্য দিল না–গেলাসের মদ জোন্সের মুখে ছিটিয়ে দিয়ে সে সজোরে পদাঘাত করল তার পেটে!
আর কিছু করার আগেই প্রহরীরা তাকে ধরে ফেলল। ততক্ষণে ক্ষতি যা হওয়ার হয়ে গেছে জোনস আর্তনাদ করছে রুদ্ধস্বরে, তার পেটের নাড়ি ছিঁড়ে গেছে বুটসমেত লাথির আঘাতে।
হাসপাতালে যাওয়ার আগে জো লার্কিনকে ডেকে পাঠাল ক্যাপ্টেন জোন্স। যদিও জোন্স কখনো জো লার্কিনের সঙ্গে ক্যারাটে সম্পর্কে কোনো প্রসঙ্গ তোলেনি, তবু জো সম্পর্কে কিছু গুজব তার কানে এসেছিল নিশ্চয়ই।
জো আসতেই ক্যাপ্টেন জোন্স বলল, বন্দিকে এইবারতুমি প্রয়োজনীয় প্রশ্ন করবে। তারপর জো-কে কাছে আসতে ইশারা করে জোন্স মৃদুস্বরে বলল, ওই শয়তানটাকে নিয়ে তুমি যা খুশি করতে পারো। পরিণামের কথা ভেবে ভয় পেয়ো না। আমি তোমাদের ক্যাপ্টেন, আমি তোমাকে সবসময়ই সমর্থন করব।
বাঃ! চমৎকার! জো তো এইরকমই চাইছিল। তার অন্তরের অন্তস্থলে এক ঘুমন্ত দানব জেগে উঠল হিংস্র উল্লাসে।
গেস্টাপো নামে কুখ্যাত জার্মান গুপ্ত পুলিশ কাউকে গোপনে খুন করতে হলে মধ্যরাত্রে ঘুম ভাঙিয়ে তাকে নিয়ে আসে–ঠিক সেইভাবেই মাঝরাতে ঘুম থেকে তুলে মার্কিন প্রহরীরা নাজি ক্যাপ্টেনকে একটা ফাঁকা ঘরে ঢুকিয়ে বাইরে থেকে দরজাটা বন্ধ করে দিল। বন্দি জার্মানকে তার প্যান্ট পরার সময়ও দেওয়া হয়নি, তার পরনে ছিল শুধু ছোটো হাফ প্যান্ট। ওই অবস্থায়ই তাকে নগ্নপদে হাঁটিয়ে আনা হয়েছে।
ঘরের মধ্যে অপেক্ষা করছিল জো লার্কিন। তার পোশাকে স্ট্রাইপ চিহ্নগুলোর দিকে তাকাল বন্দি, তারপর শুদ্ধ ইংরেজিতে প্রশ্ন করল, এমন অদ্ভুত ব্যবহারের কারণ কী?
হের ক্যাপিটান, জো তার শার্ট আর প্যান্ট খুলতে খুলতে বলল, তোমার ভারি বদঅভ্যাস, লোকজনকে তুমি লাথি মারো। এটা খুবই অন্যায় আর অভদ্র ব্যবহার। তোমাকে আমি আজ ভদ্রতা শিখিয়ে দেব।
হের ক্যাপিটান সঙ্গেসঙ্গে জো-র কথার আসল মানেটা বুঝতে পারল, ব্যাপারটা তার ভারি মজার মনে হল।
হো হো শব্দে হেসে সে বলল, তুমি?
স্পষ্টই বোঝা যাচ্ছে, লোকটা হাতাহাতি মারামারিতে বেশ দক্ষ, নিজের দৈহিক শক্তি সম্পর্কে তার ধারণাও যে খুবই উঁচু সে-বিষয়ে সন্দেহ নেই। জো প্রতিদ্বন্দ্বীর দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিপাত করল–প্রায় ছয় ফুট দু-ইঞ্চির মতো লম্বা, চওড়া বলিষ্ঠ কঁধ, কোমরের দিকটা চাপা, হাতে-পায়ে কঠিন মাংসপেশির স্ফীত বিস্তারের কোথাও এতটুক মেদের চিহ্ন নেই–হ্যাঁ, লোকটা গর্ব করার মতো দেহের অধিকারী বটে। বন্দির গায়ের রং রোদে পোড়া, নিশ্চয়ই ফাঁকা মাঠে ব্যায়াম করার অভ্যাস আছে। জো ভাবল হয়তো কিছু কিছু জুডোর কায়দা লোকটা রপ্ত করেছে।
