পাশের রাইফেলটা তুলে ধরে সেফটি ক্যাচটা সরিয়ে দিলুম। সঙ্গেসঙ্গে একটা জানোয়ার অগ্নিকুণ্ডের খুব কাছে এসে চিৎকার করে উঠল অস্পষ্ট চাঁদের আলোয় ঝকঝক করে উঠল তীক্ষ্ণ দাঁতের সারি।
অগ্নিকুণ্ডের কাছে ও দুরে যে চতুষ্পদ জীবগুলি এতক্ষণ নিশ্চল হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল তারা হঠাৎ চঞ্চল হয়ে উঠল।
কাফাতো বললে, মি. ম্যাক, প্রস্তুত হও এবার ওরা আক্রমণ করবে।
রাইফেলের ট্রিগারে আঙুলে রেখে চার পাশে দৃষ্টি নিক্ষেপ করলুম। সামনে অগ্নিকুণ্ড, তার পিছনেই দাঁড়িয়ে আছে মূর্তিমান যমদূতের দল, আগুনের এধারে আমি আর কাফাতো, পিছন থেকে আমাদের বাঁদিক ও ডানদিক দিয়ে উঠে গেছে খাড়া পাহাড়ের প্রাচীর।
শয়তানের দল সেই পথ বেয়ে তিরবেগে উঠে আসতে লাগল।
আমার কাছে রাইফেলের কার্তুজ খুব বেশি নেই, ভরসা খালি আগুন। কিন্তু আগুনের তেজ কমে এসেছে; জ্বালানি কাঠ, বসার টুল, এমনকি তাঁবুটাকেও আমরা জ্বালিয়ে দিয়েছি আর এমন কিছু নেই যা দিয়ে আগুনটাকে বাঁচিয়ে রাখা যায় এবার?
কাফাতোর দিকে তাকিয়ে দেখলুম তার কালো পাথরের মতো মুখ সম্পূর্ণ নির্বিকার, শুধু শরীরের মাংসপেশীগুলি যেন এক ভয়ংকর প্রতীক্ষায় ফুলে ফুলে উঠছে…
সামনের জানোয়ারটা আরও কাছে এসে দাঁড়াল, তারপর হঠাৎ এক প্রকাণ্ড লাফ মেরে আগুন ডিঙিয়ে একেবারে আমাদের সামনে এসে পড়ল। তার সঙ্গে সঙ্গে দেখলুম তাকে অনুসরণ করে আরও দুটো জানোয়ার আগুনের বেড়ার উপর দিয়ে শূন্যে লাফ মারল।
আমার হাতের রাইফেল সশব্দে অগ্নি-উদ্গার করলে, সামনের জন্তুটার মৃতদেহ লুটিয়ে পড়ল।
কাফাতো হাতের বর্শা চার্লিয়ে আর-একটা জন্তুকেও মাটিতে পেড়ে ফেলল; কিন্তু তিন নম্বর শয়তানটা তার দেহের উপর এসে পড়ল এবং বিকট হাঁ করে শত্রুর গলায় কামড় বসাবার উপক্রম করলে। ভীষণ আতঙ্কে আমার হাতের আঙুল অবশ হয়ে এল। গুলি চালাবার উপায় নেই, কাফাতোর গায়ে গুলি লাগতে পারে।
আড়ষ্ট দেহে চোখের সামনে এক বিয়োগান্ত নাটকের রক্তাক্ত দৃশ্যের অপেক্ষা করতে লাগলুম।
কিন্তু এত তাড়াতাড়ি নিজের দেহের রক্তমাংস দিয়ে কোনো উপবাসী শ্বাপদের উপবাস ভঙ্গ করাতে কাফাতো রাজি হল না- চটপট মাথা সরিয়ে সে গলটা বাঁচিয়ে নিল, কিন্তু তীক্ষ্ণধার দাঁতগুলি তার বাঁদিকের কাঁধের উপর এঁকে দিল এক গভীর ক্ষতচিহ্ন।
কাফাতোর হাতের বর্শায় আবার বিদ্যুৎ খেলে গেল তীব্র আর্তনাদ করে জন্তুটার রক্তাক্ত দেহ মাটিতে আছড়ে পড়ল– সব শেষ!
স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে বললাম, যাক বাঁচা গেল।
কাফাতোর মুখে শুকনো হাসি খেলে গেল, মি. ম্যাক বাঁচবার আশা রেখো না- ওরা আবার আক্রমণ করবে।
সত্যিই তাই।
পর পর তিনটি সঙ্গীর মৃত্যু দেখে জন্তুগুলো একটু সরে গিয়েছিল কিন্তু একটু পরেই কয়েকটা জানোয়ার আবার আগুনের বেড়া ডিঙিয়ে আক্রমণ করল।
আবার গর্জে উঠল আমার হাতের রাইফেল, রক্তে লাল হয়ে গেল কাফালোর হাতের বর্শা আমাদের সামনে আর অগ্নিকুণ্ডর ওপাশে পড়ে রইল কতকগুলি শ্বেতকায় প্রাণহীন পশুদেহ।
কিন্তু শয়তানের দল পালিয়ে গেল না। কিছুক্ষণ পর পর তারা আক্রমণ করে, মাটিতে পড়ে থাকে কয়েকটা হতাহত জানোয়ার, ওরা পিছিয়ে আবার আক্রমণ করে…।
হঠাৎ সভয়ে দেখলুম রাইফেলের বুলেট ফুরিয়ে গেছে।
অকেজো জিনিসটা ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে কোমরের রিভলভারটা টেনে নিলুম মাত্র ছয়টি বুলেট তাতে ভরা আছে, সঙ্গে আর কার্তুজ নেই!
কাফাতোর নীরস কণ্ঠ শুনতে পেলুম, মি. ম্যাক, ওরা আবার আসছে..।
আহোয়ার সাদা কুকুর সম্পর্কে কোনো কথা আগে শুনিনি। পরে যখন জানতে পারলুম তখন মনে মনে ঠিক করে ফেললুম কয়েকটা সাদা কুকুরের চামড়া জোগাড় করতেই হবে।
আমি জাত শিকারি, শিকার আমার শুধু নেশা নয়- পেশাও বটে। যেসব জানোয়ার সচরাচর দেখা যায় না তেমন বহু জন্তু আমি শিকার করেছি এবং পৃথিবীর বিখ্যাত জাদুঘরগুলি আমার কাছ থেকে প্রচুর অর্থের বিনিময়ে সেই সব বিরল পশুচর্ম সংগ্রহ করতে কুণ্ঠিত হয়নি। আমার হাতে নিহত সাদা কুকুরগুলি এখন ম্যানিলা, পাপিতি এবং হনলুলুর বিখ্যাত জাদুঘরের শোভাবর্ধন করছে।
তাদের সাদা চামড়ার শোভায় মুগ্ধ হয়ে দর্শকরা প্রায়ই চেঁচিয়ে ওঠে, বাঃ! বাঃ! কী সুন্দর! কী চমৎকার!
চমৎকারই বটে! এই চমৎকার চামড়া জোগাড় করতে গিয়ে আমার গায়ের চামড়াই শরীর-ছাড়া হওয়ার উপক্রম করেছিল। সেই কথাই বলছি…
আহোয়া উপত্যকায় যাওয়ার আগে অবশ্য এই সাদা কুকুরদের সম্বন্ধে আমার বিশেষ কিছুই জানা ছিলনা। পরে জানতে পারলুম হাঙ্গারির কোভাজ জাতের কুকুর থেকেই এদের উৎপত্তি।
এই জাতীয় কুকুরগুলি অত্যন্ত হিংস্র এবং শক্তিশালী হয় এবং এদের দেহের আয়তনও নেকড়ের চাইতে একটুও ছোটো নয়। বিংশ শতাব্দীর প্রথম দিকে হিভাওয়া দ্বীপে কোনো এক হতভাগা ইউরোপীয় নাবিক কয়েক জোড়া কোভাজ কুকুর আমদানি করে। হাঙ্গারির কোভাজ বছরের পর বছর এই দ্বীপে বংশবৃদ্ধি করতে থাকে।
কিন্তু দ্বীপের মাঝখানে মানুষের হাতের তৈরি খাবার কোথা থেকে জুটবে? অতএব ক্ষুধার্ত কুকুরদের চোখ পড়ল পাহাড়ি ছাগল, বুনো মোষ ও গোরুর দিকে হিভাওয়া দ্বীপের উপর শুরু হল এক বিভীষিকার রাজত্ব।
এইভাবে সভ্য জগতের বাইরে হিভাওয়া দ্বীপের ওহিও উপত্যকায় জন্মগ্রহণ করল একদল হিংস্র রক্তলোলুপ শ্বাপদ বিপুল বপু কোভাজ বিপুলতর হয়ে উঠল বন্য প্রকৃতির সংস্পর্শে, ধূসর রঙের ছোঁয়া লাগল তার দুধসাদা চামড়ায়, স্বভাবে তারা হয়ে উঠল আরও হিংস্র, আরও ভয়ংকর।
