কয়েকটা দিন কাটল। সেনানিবাসের সকলেই অকুস্থলে উপস্থিত সৈনিকদের মুখ থেকে ব্যাপারটা শুনেছে। হঠাৎ একদিন জো আবিষ্কার করল সে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ছে। কেউ তার সঙ্গে কথা কইতে চায় না। জো নানাভাবে বন্ধুদের সঙ্গে আড্ডা জমাতে চেষ্টা করল। বৃথা চেষ্টা। নিতান্ত প্রয়োজন ছাড়া তারা তার সঙ্গে কথা বলে না। জমাট তাসের আড্ডায় সে উপস্থিত হলে তাসের আড্ডা ভেঙে যায়। নানা ছুতোয় সকলে স্থান ত্যাগ করে। সিনেমা যাওয়ার আমন্ত্রণ এখন। কেউ তাকে করে না। বন্ধুদের মধ্যে যারা তাকে ক্যারাটের কৌশল শেখাতে অনুরোধ ছেড়ে তোষামোদ পর্যন্ত করত, তারাও এখন তাকে এড়িয়ে চলতে চায়।
ফল হল সাংঘাতিক। জো আবার স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিল। হয়তো সে তার মারাত্মক বিদ্যাকে দ্বিতীয় বার প্রয়োগ করত না। কিন্তু সবাই তাকে এড়িয়ে চলছে দেখে সে মনে মনে ভীষণ হিংস্র হয়ে উঠল। তার প্রাণঘাতী আক্রোশকে মুক্তি দেওয়ার জন্য সে সুযোগের অপেক্ষায় রইল।
সুযোগ এল কিছুদিনের মধ্যেই। ছয়টি সৈন্যের সঙ্গে একদিন জো বেরিয়েছিল টহল দিতে। জো স্বয়ং ছিল দলের নেতা। নিতান্ত অভাবিতভাবেই হঠাৎ একটি জার্মান সৈন্য তাদের সামনে এসে পড়ল। সৈন্যটি তৎক্ষণাৎ আত্মসমর্পণ করল, সে নাকি পথ হারিয়েছে। আমেরিকান সৈন্যরা অস্বস্তি বোধ করতে লাগল–নির্দিষ্ট এলাকা পরিদর্শন করার জন্য তারা টহল দিতে বেরিয়েছে, এখন বন্দিকে নিয়ে আস্তানায় ফিরে যাওয়া সম্ভব নয়।
জার্মান সৈন্যটি যখন বুঝল তাকে গুলি করা হবে না, সে আশ্বস্ত হল। দেখা গেল সে ভাঙা ইংরেজিতে কথা বলতে পারে। জো তাকে কিছু খাদ্য আর সিগারেট দিয়ে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তার দেহটা পর্যবেক্ষণ করতে লাগল–হ্যাঁ, লম্বায়-চওড়ায় জার্মানটি প্রায় তারই মতো, আঁটোসাঁটো শরীরটা দেখলে মনে হয় সে ব্যায়ামে অভ্যস্ত। জো বন্দির সঙ্গে কথা বলছিল। তার সঙ্গীরা অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে ছিল। বন্দিকে নিয়ে যে-সমস্যার উদ্ভব হয়েছে, জো যে তার সমাধান করতে চাইছে সেটা তারাও বুঝতে পারছিল। এই ভয়ংকর ক্যারাটে-যোদ্ধাটি যে কেমন করে এই সমস্যার সমাধান করবে সেটাও তারা আন্দাজ করতে পারছিল–তাই বন্দির সঙ্গে কথা বলতে তারা বিশেষ উৎসাহ প্রকাশ করেনি।
জো বন্দিকে প্রশ্ন করল, তুমি কখনো বক্সিং লড়েছ? জার্মান বন্দির বলিষ্ঠ দেহ আর ভাঙা নাকের গড়ন দেখেই জো-র ওই প্রশ্ন। অনুমান নির্ভুল। বন্দি জানাল ১৪ বছর বয়স থেকেই সে বক্সিং লড়ছে। তা ছাড়া ফুটবল খেলার অভ্যাসও তার আছে।
বাঃ! চমৎকার! জো বলল, শোনো, তোমার সঙ্গে একটা চুক্তি করছি। আমরা হাতাহাতি লড়াই করব। যদি আমাকে হারাতে পারো তাহলে তোমায় মুক্তি দেওয়া হবে। ঠিক আছে?
আমি ঠিক বুঝতে পারছি না, জার্মান বন্দি বলল। তার কণ্ঠস্বরে আতঙ্কের আভাস। সে বোধ হয় বুঝেছিল তার বিপদ আসন্ন।
তুমি ঠিকই বুঝেছ, জো বলল, নাও, তৈরি হও। আমাদের হাতে বেশি সময় নেই।
জো জামা খুলে ফেলল। বন্দিও তার উদাহরণ অনুসরণ করল। জো দেখল, বন্দির বুক বেশ চওড়া, হাত-পায়ের কঠিন মাংসপেশি বন্দির দৈহিক শক্তির পরিচয় দিচ্ছে। জো খুশি হল। শক্তিশালী মানুষ না হলে লড়াই করে সুখ নেই।
জো-র সঙ্গীরা নীরব। তারা জানত জো ক্যারাটে-যোদ্ধা, তার ভয়াবহ খ্যাতি তাদের কানেও এসেছে। এখন তারা স্তব্ধ হয়ে জো-র কার্যকলাপ দেখার জন্য অপেক্ষা করছে।
লড়াইয়ের শুরুতে জার্মান সৈন্যটি বিশেষ উৎসাহ দেখাল না। জো প্রতিরোধের ভঙ্গিতে প্রস্তুত হয়ে দাঁড়ায়নি, মুখ আর শরীর প্রতিদ্বন্দ্বীর সামনে উন্মুক্ত বন্দি তবুও নিশ্চেষ্ট, তার আঘাত হানা উদ্যম নেই কিছুমাত্র।
জো এবার বন্দিকে উত্তেজিত করতে সচেষ্ট হল, সে সজোরে চড় মারল বন্দির গালে, আমি জানি নাজিরা ভীরু, কাপুরুষ। তোমাদের লড়াই করার সাহস নেই। সঙ্গেসঙ্গে গালাগালি।
এবার কাজ হল। বন্দির চোখে-মুখে ফুটল ক্রোধের আভাস। সে এগিয়ে এসে সজোরে ঘুসি ছুঁড়তে লাগল। একটা ঘুসিও অবশ্য জো-কে স্পর্শ করতে পারল না। সুকৌশলে আঘাতগুলো এড়িয়ে গেল জো।
জো এবার কাজ শুরু করল, ডান হাতের বুড়ো আঙুল করতল চেপে রইল, আঙুলগুলো ছুরির মতো আড়ষ্ট, শক্ত–পরক্ষণেই সেই কঠিন আড়ষ্ট আঙুলগুলো দারুণ জোরে ছোবল মারল প্রতিদ্বন্দ্বীর পেটের মাঝখানে। দারুণ যাতনায় জার্মান বন্দির শরীর সামনের দিকে ঝুঁকে পড়ল, তার নিশ্বাস বন্ধ হয়ে আসছে।
আবার শ্বাস টেনে নিজেকে প্রস্তুত করার আগেই জো-র বাঁ-হাতের বজ্রমুষ্টি হাতুড়ির মতো আছড়ে পড়ল বন্দির ওষ্ঠের ওপর। কয়েকটা দাঁত ভেঙে গেল সঙ্গেসঙ্গে। ক্যারাটে-ঘুসি সঠিকভাবে প্রয়োগ করলে ওই আঘাতেই দাঁতের পরিবর্তে মুখের হাড় ভাঙত, তারপর আর এক ঘুসিতে ভাঙা হাড়গুলো পৌঁছে যেত মগজের মধ্যে। ইচ্ছে করেই ভুল করেছিল জো, ক্যারাটের মরণমার মারতে চায়নি সে। লড়াইটাকে দীর্ঘস্থায়ী করে বন্দিকে যন্ত্রণা দিয়ে ধীরে ধীরে হত্যা করতে চাইছিল সে।
নাজি বন্দিটি ভীষণভাবে আহত হলেও তখন পর্যন্ত মারামারি করার ক্ষমতা হারায়নি। সে বুঝেছিল শত্রুকে পরাস্ত করতে না-পারলে তার মৃত্যু নিশ্চিত, অতএব হিংস্র আক্রোশে সে এবার জো-র ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। জো শান্তভাবে অপেক্ষা করছিল তার ডান হাত তলার দিকে ঝুঁকে পড়েছে আর আঙুলগুলো খুলে ছড়িয়ে রয়েছে উপযুক্ত জায়গায় ছোবল মারার জন্য।
