জো লার্কিনের সহকর্মী কয়েকটি সৈন্য অবশ্য সেখানে ছিল, তারা ভয় পায়নি, ব্যাপারটা উপভোগ করছিল। জো-র মুখে তারা শুনেছে সে ক্যারাটে-যোদ্ধা, হঠাৎ খুনের দায়ে পড়ার সম্ভাবনা আছে বলে সে মারামারির মধ্যে যেতে চায় না। অথচ তাদের সামনে জো কার্যকলাপে কোনো প্রমাণ রাখেনি! তাই আজ তারা নিশ্চেষ্ট–শুধু মুখের কথা বিশ্বাসযোগ্য নয়, তারা দেখতে চায় হাতের কাজ।
পানাগারের ভিতর বৃত্তাকারে ঘুরতে লাগল মাতাল আর জো। কয়েকবার ভাঙা বোতল উঁচিয়ে আঘাত হানতে চেষ্টা করল মাতাল। প্রত্যেকবারই সরে গিয়ে লোকটার চেষ্টা ব্যর্থ করে দিল জো, ছুরির মতো ধারালো কাঁচগুলো একবারও জোর মুখ স্পর্শ করতে পারল না।
বার বার ব্যর্থ হয়ে লোকটা খেপে গেল। হঠাৎ সে বোতলটা ছুঁড়ে মারল জো-র মুখ লক্ষ করে। এবারও জো সরে গেল, কিন্তু আত্মরক্ষা করতে পারল না বোতলটা তার মাথার ওপর পড়ে ছিটকে গেল অন্যদিকে।
আঘাতের ফলে ভারসাম্য হারিয়ে ফেলল জো… কয়েক মুহূর্তের স্তম্ভিত অনুভূতি… মাথা বেয়ে নামছে তপ্ত তরল একটা ধারা… রক্ত!
জো সামলে ওঠার আগেই মাতাল তাকে আক্রমণ করেছে। এবার তার হাতে ঝকঝক করছে। ধারালো ছুরি।
আর ঠিক সেই মুহূর্তে জো-র মগজের মধ্যে কী যেন ঘটল..সেফটি ক্যাচ! ক্যারাটে শিক্ষার সেফটি ক্যাচ এখন সরে গেছে, এখন সে আক্রান্ত, তার জীবন এখন বিপন্ন, লড়াই করার অধিকার এখন তার আছে।
উদগ্র ক্রোধ এইবার মুক্তি পেল, জোর কণ্ঠ ভেদ করে বেরিয়ে এল ভয়ংকর চিৎকার!
জোর বাঁ-হাত কাটারির মতো পড়ল শত্রুর ছুরি ধরা পুরোবাহুর (forearm) উপর। অনভ্যাসের ফলে আঘাতের শক্তি কমে গেছে, তাই ছুরিটা মাতালের হাত থেকে খসে পড়ল, কিন্তু হাতটা অবশ হয়ে গেল কয়েক মুহূর্তের জন্য। সেই কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সামলে নিয়ে জো শত্রুর পরবর্তী আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে লাগল।
মাতাল জো-র পেট লক্ষ করে ছুরি চালাল। জো একপাশে সরে গেল, তারপর ডান হাত বাড়িয়ে মাতালের ছুরি ধরা হাতের কবজি চেপে ধরল। পরক্ষণেই তার বাঁ-হাত কাটারির মতো মাতালের বাহুর পেশিতে আঘাত করে ছুরি ধরা হাতটাকে অসাড় করে দিল। ..
এইবার ক্যারাটের খেলা–মাতাল ব্যাপারটা কী হচ্ছে বুঝে ওঠার আগেই তার শত্রু চট করে একপাশে ঘুরে গিয়ে নিজের বাঁ-কাঁধের উপর রাখল, সঙ্গেসঙ্গে পাঁজরের ওপর নিদারুণ কনুইয়ের গুঁতো সেই আঘাত সামলে ওঠার আগেই মাতালের ছুরি সমেত হাতটা সবেগে শূন্যে উঠে প্রবল আকর্ষণে শত্রুর কাঁধের উপর পড়ল, তৎক্ষণাৎ টুকরো টুকরো হয়ে ভেঙে গেল কনুইয়ের হাড়!
ক্যারাটের মার–পৃথিবীর কোনো ডাক্তারই সেই হাড়কে আর জোড়া লাগাতে পারবে না!
ছুরিটা অনেক আগেই পড়ে গেছে মেঝের উপর। বিস্ময়-বিস্ফারিত ভীত দৃষ্টিতে মাতাল দেখল, তার ডান হাতটা ভাঙা অবস্থায় নড়বড় করে ঝুলছে!
তবু সে হার মানল না। বুনো জানোয়ারের মতো গর্জন করে সে শত্রুর পেট লক্ষ করে লাথি ছুড়ল। লাথি লাগল না, কিন্তু তার পায়ের গোড়ালি ধরা পড়ল শত্রুর মুঠোর মধ্যে পরক্ষণেই এক হ্যাঁচকা টান এবং মাতাল হল মেঝের উপর লম্বমান!
এইবার জো-র ভারী জুতো সমেত লাথি এসে পড়ল মাতালের তলপেটে, সঙ্গেসঙ্গে লড়াই শেষ। লোকটা হাঁফাতে হাঁফাতে আর্তনাদ করতে লাগল। হঠাৎ এক ঝলক বমি বেরিয়ে এসে তার আর্তকণ্ঠকে স্তব্ধ করে দিল।
শায়িত শত্রুর দিকে মুহূর্তের জন্য দৃষ্টিপাত করল জো। তার বুকের ভিতর জেগে উঠেছে। রক্তলোভী দানবের হিংস্র উল্লাস–পলকে নীচু হয়ে মাতালের হাতটা চেপে ধরে সে মোচড় দিল, একেবারে চুরমার হয়ে ভেঙে গেল হাতটা। আবার একটা আর্ত চিৎকার। আবার এক ঝলক বমি। তারপরই অজ্ঞান হয়ে গেল লোকটা।
পানশালার মধ্যে অন্তত বারো রকমের বিভিন্ন জাতির লোক ছিল। সবাই নির্বাক, স্তব্ধ, শেষকালে ধরাশায়ী শত্রুর ওপর জো-র অমানুষিক অত্যাচার তাদের বিস্ময় ও আতঙ্কে স্তব্ধ করে দিয়েছে। জো-র সঙ্গীদের মুখেও কথা নেই, তাদের দৃষ্টি আতঙ্কে বিস্ফারিত–তারা যেন চোখের সামনে এক অপার্থিব বিভীষিকা দেখছে।
কেউ একটি কথা বলল না। জো এতক্ষণে নিজেকে বুঝতে পারছে। ক্যারাটে তার ভিতর এক রক্তলোভী হিংস্র দানবের জন্ম দিয়েছে, যে-দানব অপরকে কষ্ট দিয়ে আনন্দ পায়। ভাঙা হাতটাকে মুচড়ে দিয়ে লোকটাকে যন্ত্রণা দেওয়ার কোনো প্রয়োজন ছিল না। তলপেটে লাথি না-মেরেও সে লোকটাকে কাবু করতে পারত। অবরুদ্ধ হিংসা মুক্তি পেয়েই তার প্রবৃত্তি চরিতার্থ করেছে যথেচ্ছভাবে। হঠাৎ তীব্র বিবমিষা জো-কে অস্থির করে তুলল, কোনোরকমে প্রস্রাব আগারে ঢুকে সে বমি করে ফেলল।
বেরিয়ে এসে জো দেখল, পানাগারের ভিতরে অবস্থা যেন কিছুটা স্বাভাবিক। ভিড়ের মধ্যে কেউ অ্যামবুলেন্স ডেকে পাঠিয়েছে। ফরাসি সাইরেনের উৎকট ধ্বনি কানে এল। পুলিশ আসছ। জো বিশেষ ভয় পেল না। প্রথমে ভাঙা বোতল, পরে ছুরি নিয়ে লোকটা যে তাকে আক্রমণ করেছিল, সেই দৃশ্য বহু লোক দেখেছে। সে যে মারামারি করতে চায়নি বরং এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছে সেটাও প্রমাণ করা কঠিন হবে না–বহু মানুষের চোখের সামনে এসব ঘটনা ঘটেছে। না, পুলিশকে নিয়ে সে মাথা ঘামাচ্ছে না, মূৰ্ছিত লোকটির কথাই চিন্তা করছে সে। হঠাৎ পকেট থেকে অনেকগুলো ডলার বার করে সে অচেতন মানুষটার পকেটে গুঁজে দিল। আলজিরিয়ান নিগ্রোর ভাঙা হাড় আর জোড়া লাগানো যাবে না, কিন্তু ওই টাকায় অন্তত ভালোভাবে চিকিৎসা করার সুযোগ সে পাবে।
