দুই বৎসর কঠিন পরিশ্রমের পর জো লার্কিন ক্যারাটে রণবিদ্যা আয়ত্ত করতে সমর্থ হল। আর তখনই ক্যারাটের বিধিনিষেধ সম্পর্কে তাকে সাবধান করে দেওয়া হল–প্রাণ বিপন্ন না হলে লড়াই করা চলবে না। অপমানিত হলেও অপমান সহ্য করতে হবে। ক্যারাটে বিদ্যালয়ের শিক্ষক তাকে ক্যারাটে-যোদ্ধা বলে স্বীকৃতি দেওয়ার সঙ্গেসঙ্গে জাপানি পুলিশের খাতায় তাকে নাম লেখাতে হয়েছে রাস্তায় বা কোনো দোকানের মধ্যে মারামারি করলে ক্যারাটে-যোদ্ধা আইনত অপরাধী, তাকে শাস্তি দেওয়া হবে সরকার থেকে।
–অপমানিত হলেও সহ্য করতে হবে?
–হ্যাঁ, সেটাই নিয়ম। ক্যারাটে-যোদ্ধার মারামারি করার উপায় নেই। শুধুমাত্র জীবন বিপন্ন হলেই সে লড়াই করতে পারে।
জো লার্কিন তার আত্মজীবনীতে বলেছে, এত সব বিধিনিষেধ আছে জানলে সে ক্যারাটে শিখত কি না সন্দেহ।
তবে জোকে বেশিদিন জাপানে থাকতে হয়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার দুই সপ্তাহ আগেই নিজের দেশ আমেরিকায় ফিরে এসেছিল সে। তার বয়স তখন উনিশ। সেই তরুণ বয়সেই জাপানি পুলিশের খাতায় ক্যারাটে-যোদ্ধা বলে তার নাম উঠে গেছে।
দেশে এসে আমেরিকার সেনাবাহিনীতে নাম লেখাল জো। আর্মি ট্রেনিং বা সামরিক শিক্ষা বেশ কঠিন, কিন্তু ক্যারাটে শিক্ষার ভয়ংকর পাঠশালায় পাঠ নেওয়ার পর সামরিক শিক্ষা জোর কাছে বাগান থেকে ফুল ভোলার মতোই সহজ মনে হয়েছিল। অতি অল্পদিনের মধ্যেই সে সার্জেন্ট হল। তারপর তাকে পাঠানো হল সমুদ্র পার হয়ে অন্য দেশে।
এতদিন তার সাংঘাতিক বিদ্যাকে হাতেনাতে প্রয়োগ করার সুযোগ পায়নি জো, এইবার ক্যাসাব্লাংকা নামক ফরাসিদের আস্তানায় সে নিজের ক্ষমতা যাচাই করার সুযোগ পেল। অবশ্য এর আগে ঝগড়া বা মারামারির সম্ভাবনা কখনো হয়নি এমন নয়। প্ররোচনা এসেছে ভীষণভাবে। কিন্তু ইয়াকোহামার প্রফেসর সাতো বার বার সাবধান করে ভয় দেখিয়েছিলেন–খুনের দায়ে পড়ার অনেক ঝামেলা। সেই ঝামেলার ভয়েই অনেক সময় অপমান সহ্য করে সরে এসেছে। জো, অপমানকারীকে আঘাত করার চেষ্টা করেনি কখনো। একবার মারামারি বাধলে মেপে মেপে ওজন বুঝে আঘাত করা সম্ভব নয়। ক্যারাটে মৃত্যুবাহী দেহের দুর্বল স্থানে ক্যারাটের আঘাত মৃত্যুকে ডেকে আনতে পারে মুহূর্তের মধ্যে। এসব কথা খুব ভালোভাবেই জানত জো, তাই ঝগড়ার সূত্রপাত হলে সে সতর্ক হয়ে যেত। সে মিষ্টি কথায় ঝগড়া এড়িয়ে যেতে শিখেছিল; তবু যখন মাথায় রাগ চড়ে যাওয়ার উপক্রম হত, তখন দুই হাত প্যান্টের পকেটে ঢুকিয়ে রাখত প্রবল ইচ্ছাশক্তির সাহায্যে।
তবু মানুষ তো যন্ত্র নয়, সংযমের বাঁধন একদিন ছিঁড়ল। যাকে কেন্দ্র করে ব্যাপারটা ঘটল, সেই লোকটা জাহাজি শ্রমিক, আলজিরিয়ার মানুষ। মানুষটা প্রায় সাড়ে ছয় ফুট উঁচু, বিশাল বুক, চওড়া কাঁধ, মুখের ডান দিকে চোখের তলা থেকে চিবুক পর্যন্ত ছুরিকাঘাতের শুষ্ক ক্ষতচিহ্ন–এক নজর দেখলেই বোঝা যায় সে দাঙ্গাহাঙ্গামায় অভ্যস্ত। আলজিরিয়ানটি পানাগারে মদ্যপান করতে এসেছিল। জো দেখল, সে বেশ মাতাল হয়ে পড়েছে। ভিড়ের মধ্যে দাঁড়িয়ে লোকটা গেলাসের পর গেলাস মদ গিলছিল, তখনও পর্যন্ত কোনো গোলমাল করেনি, কিন্তু তার হাত অল্প কাঁপছিল নেশার ঝেকে।
দুর্ভাগ্যক্রমে জো দাঁড়িয়ে ছিল লোকটার খুব কাছেই। হঠাৎ আলজিরিয়ান শ্রমিকটি হাত বাড়িয়ে জো-র হাতের গেলাস ধাক্কা মেরে ফেলে দিল।
তুই একটা শুয়োর, গর্জন করে মাতাল আলজিরিয়ান, তুই একটা দুর্গন্ধ শুয়োর। তোর গাঁ থেকে বিশ্রী গন্ধ বেরোচ্ছে।
ঠিক, ঠিক, একটু হেসে ঝগড়া এড়িয়ে যেতে চাইল জো, তুমি বরং আর এক গেলাস মদ নাও।
মুখে হাসলেও জো-র মাথায় তখন আগুন জ্বলছে। ক্যারাটে না-শিখলে সে নিশ্চয়ই লোকটার চোয়ালে ঘুসি বসিয়ে দিত। কিন্তু ক্যারাটের শিক্ষা তাকে প্রতিরোধ করল না, এখনও তার প্রাণ বিপন্ন হয়নি, এখনও আঘাত হানবার সময় আসেনি। কিন্তু বহুদেশের বহু লোক সেখানে জমায়েত হয়েছে, তাদের সামনে নিজেকে কাপুরুষ ভীরু প্রতিপন্ন করতে জো লার্কিনের খুবই খারাপ লাগছিল–তবু আশ্চর্য সংযমের পরিচয় দিল সে, দুই হাত তাড়াতাড়ি ঢুকিয়ে দিল প্যান্টের পকেটে।
হঠাৎ মাতালটা জো লার্কিনের মুখের ওপর থুথু ছিটিয়ে দিল, তারপর বুনো জানোয়ারের মতো গর্জে উঠে একটা মদের বোতল টেবিলে ঠুকে ভেঙে ফেলল। পলকের মধ্যে বোতলের তলার দিকে আত্মপ্রকাশ করল ধারালো ছুরির মতো অনেকগুলো ভাঙা কাঁচের টুকরো।
সেই ভাঙা বোতলের গলার দিকটা শক্ত মুঠিতে চেপে ধারালো কাঁচগুলো সজোরে জো-র মুখের ওপর বসিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করল মাতাল, কিন্তু জো চটপট সরে যাওয়ায় মাতালের চেষ্টা সফল হল না।
লোকজন তখন চিৎকার করে মাতালের সামনে থেকে সরে যাচ্ছে, মেয়েরা আর্তনাদ করছে ভীতস্বরে।
দ্বিতীয় বার আঘাত হানল মাতাল। আবার সরে গেল জো। বোতলের ধারালো কাঁচগুলো জো-র মুখের কয়েক ইঞ্চি দূরে শূন্যে ছোবল মারল।
এবার আর জো-র হাত দুটো পকেটের ভিতর নেই, বেরিয়ে এসেছে। এখনও জো আশা করছে কেউ মাতালটাকে ধরে ফেলবে, পকেটের ভিতর থেকে বেরিয়ে আসা ভয়ংকর হাত দুটো বোধ হয় ব্যবহার করার দরকার হবে না। কিন্তু ভীষণদর্শন মাতাল নিগ্রোটার সামনে কেউ এগোল না, সকলেই নিরাপদ দূরত্বে দাঁড়িয়ে একটা রক্তাক্ত দৃশ্যের প্রতীক্ষা করতে লাগল।
