দুটি শেয়াল হঠাৎ দাঁত খিঁচিয়ে পরস্পরের প্রতি ক্রোধ প্রকাশ করতে শুরু করল। সঙ্গেসঙ্গে সমস্ত দলটা চিৎকার করে উঠল তীব্র কণ্ঠে। বালুকাময় নির্জন প্রান্তরে সেই চিৎকার যেন চাবুক মেরে সাহেবের আচ্ছন্ন চেতনাকে জাগিয়ে দিল। মনের জোরে কোনমতে উঠে দাঁড়িয়ে তিনি বন্দুকটা তুলে ধরলেন। তৎক্ষণাৎ তীরবেগে অদৃশ্য হয়ে গেল শেয়ালের দল।
ইংলিস সাহেবের শুকনো জিভ তখন মুখের মধ্যে খর খর করছে, হাঁটু কাঁপছে, শরীর শিউরে উঠছে থেকে থেকে। বন্দুক আঁকড়ে ধরে তিনি এগিয়ে চললেন অন্ধের মতো। কিন্তু বেশি দূর যেতে হল না, কিছুক্ষণের মধ্যেই দ্বিতীয়বার তাকে সংজ্ঞা হারাতে হল। আবার যখন জ্ঞান হল তখন ভোর হয়ে গেছে, সর্যের আলো ঘন কুয়াশা ভেদ করে ছড়িয়ে পড়ছে চারদিকে।
শরীরে অসহ্য যন্ত্রণা, তবু আচ্ছন্ন দৃষ্টিকে প্রাণপণে চালিত করে ইংলিস দেখলেন একটু দূরে অগভীর গর্তের ভিতর থেকে মাথা তুলে দাঁড়িয়ে আছে মিমোসা ঝোপের সারি। বিদ্যুৎ ঝলকের মতো একটা চিন্তা তার মস্তিষ্কে সাড়া দিল- ওখানে জল নেই তো?
শিকারের নিত্যসঙ্গী হান্টিং নাইফ সঙ্গেই ছিল সেই ধারাল ছোরা দিয়ে নির্দিষ্ট জায়গায় মাটি খুঁড়ে ফেললেন জেমস ইংলিস। ধারণা নির্ভুল! জল রয়েছে বটে! ~-ময়লা ঘোলাটে জলে রুমাল ভিজিয়ে রুমাল বার বার নিংড়ে জলপান করে জেমস কিছুটা স্বস্তি বোধ করলেন।
সাহেব সেখানেই পড়ে রইলেন। মধ্যাহ্নের প্রখর সূর্য তার দেহের উপর অগ্নিবর্ষণ করল সারা দুপুর ধরে। বিকালের দিকে তার সঙ্গীরা যখন তাকে সেই ময়লা জল পরিপূর্ণ গর্তের পাশ থেকে উদ্ধার করল, তখন দারুণ জ্বরের ঝেকে প্রলাপ বকছেন জেমস ইংলিস।
আরোগ্যলাভের পর ইংলিস সাহেব বলেছেন, আমি যে কোথা দিয়ে কেমন করে আমার ফ্যাক্টরিতে ফিরে এসেছিলাম, সে কথা আজও বলতে পারি না।
ক্যারাটে মৃত্যুবাহী
কুস্তি এবং মুষ্টিযুদ্ধ বা বক্সিংকে যদিও খেলা বলেই ধরা হয়, আর কুস্তি ও মুষ্টিযুদ্ধের প্রতিযোগিতার আয়োজনও হয়ে থাকে, তবে এই দুটি খেলা হাতাহাতি লড়াইয়ের পর্যায়ভুক্ত। কিন্তু ক্যারাটে খেলা নয়–এটা সত্যিই লড়াই, নিরস্ত্র যুদ্ধ। জাপানে কেউ ক্যারাটে নামক রণবিদ্যা আয়ত্ত করতে পারলে, অর্থাৎ জাপানের কোনো ক্যারাটে বিদ্যালয় থেকে কোনো ছাত্রকে ক্যারাটে-বিশারদ বলে স্বীকৃতি দিলে জাপানি পুলিশের কাছে উক্ত ছাত্রের নাম রেজিস্ট্রি করতে হয় এবং এই কথা বলে মুচলেকা দিতে হয় যে, উক্ত ক্যারাটে-যোদ্ধা প্রাণ বিপন্ন না হলে কখনো মারামারি করবে না।
তবু মুচলেকা দিলেও সবসময় কি কথা রাখা যায়? আর মুচলেকা তো জাপানি পুলিশের কাছে, যদি কোনো ক্যারাটে-যোদ্ধা জাপানের বাইরে তার বিদ্যাকে হাতেনাতে প্রয়োগ করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে মামলা করবে কে?
দক্ষ ক্যারাটে-বিশারদ গুলি ভরতি রাইফেলের মতোই ভয়াবহ। রাইফেলের সেফটি ক্যাচ তুলে ট্রিগার টিপলেই অস্ত্রটি সগর্জনে মৃত্যু পরিবেশন করে। ক্যারাটের নীতিশিক্ষা ওই সেফটি ক্যাচ–ক্যারাটে-যোদ্ধা যদি কখনো নিজের উপর সংযম হারিয়ে তার নীতি ভুলে যায়, তবে রাইফেলের গুলির মতোই নিদারুণ আঘাত এসে পড়ে বিপক্ষের উপর। সেই আঘাতের ফলে আহত ব্যক্তির সাংঘাতিক দৈহিক ক্ষতি হতে পারে। এমনকী মৃত্যু হওয়াও অসম্ভব নয়। অস্ত্রধারী মানুষের চাইতেও ক্যারাটে-বিশারদ অধিকতর বিপজ্জনক ব্যক্তি, কারণ অস্ত্র দেখে লোকে সাবধান হতে পারে কিন্তু ক্যারাটেকে চোখে দেখা যায় না–ক্যারাটে-যোদ্ধা এই প্রাণঘাতী অদৃশ্য অস্ত্রকে বহন করে সর্বাঙ্গে, মুহূর্তের মধ্যে প্রয়োগকারীর মুষ্ট্যাঘাত, পদাঘাত বা আঙুলের খোঁচায় : নির্দয় মৃত্যুর পরোয়ানা নেমে আসতে পারে কলহে নিযুক্ত বিপক্ষের উপর। ক্যারাটে নামক রণবিদ্যা যে আয়ত্ত করেছে, সে কখনো নিজের ওপর সংযম হারিয়ে ফেললে ঘটনার পরিণতি যে কতটা ভয়ানক হতে পারে নিম্নে পরিবেশিত কাহিনিটি তার প্রমাণ :
আমেরিকার এক ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোক জাপানের ইয়োকোহামা নামক স্থানে দু-বছরের জন্য কার্যে নিযুক্ত হন। একটি আমেরিকান ব্যবসায়ী সংস্থা জাপান সরকারের সঙ্গে ব্যাবসায়িক চুক্তি করেছিল, ওই সংস্থার পক্ষ থেকে নিয়োগ করা হয়েছিল উল্লিখিত ইঞ্জিনিয়ার ভদ্রলোককে। ওই আমেরিকান ভদ্রলোক অবশ্য আমাদের কাহিনির নায়ক নন, নায়কের স্থান অধিকার করেছে তার ছেলে জো লার্কিন। ছোটোবেলা থেকেই জো বেশ শক্তিশালী। কিছুদিন সে মুষ্টিযুদ্ধ অভ্যাস করেছিল। এমনকী মুষ্টিযুদ্ধকে পেশা হিসাবে গ্রহণ করার কথাও তার মনে হয়েছিল। পেশাদার মুষ্টিযোদ্ধার উপযুক্ত শরীর ছিল তার দৃঢ় পেশি, দ্রুত গতি আর দুরন্ত সাহস। দরকার ছিল শুধু উপযুক্ত শিক্ষা আর নিয়মিত অভ্যাস।
জাপানে এসে জো মুষ্টিযুদ্ধের পরিবর্তে ক্যারাটের প্রতি আকৃষ্ট হল। কঠিন পরিশ্রমের ব্যাপার। হাতের মুঠি পাকিয়ে ঘুসি মারতে এবং তালুর পাশ দিয়ে কাটারির মার অভ্যাস করতে করতে দারুণ ব্যথায় হাত অসাড় হয়ে আসে, ঘণ্টার পর ঘন্টা কঠিন পরিশ্রমে আড়ষ্ট হয়ে যায় বাহুর পেশি, নগ্নপদে কঠিন বস্তুর ওপর লাথি মারতে মারতে ভেঙে যায় পায়ের আঙুল, আর
আর এই কষ্ট সহ্য করে টিকে থাকতে পারলেই অভ্যাসকারীর সাধনায় সিদ্ধিলাভ!
