পরের দিন সকাল এগারোটার মধ্যে চারটি হাতি এসে হাজির। সঙ্গে এল একদল বলিষ্ঠ গ্রামবাসী তাদের হাতে বর্শা, মুগুর, তলোয়ার প্রভৃতি অস্ত্র। পাঁচটি হাতি সঙ্গে সশস্ত্র সেনাবাহিনী নিয়ে বাঘ শিকারে যাত্রা করলেন জেমস ইংলিস।
ইংলিস সাহেব ছিলেন মতির পিঠে। তাঁর একখানা বন্দুক নিয়ে আর একটি হাতির পিঠে বসেছিল জগরু, অন্যপাশে তিন নম্বর হাতির পিঠে ছিল বন্দুক হাতে জমিদার পুত্র। চতুর্থ ও পঞ্চম হাতির সঙ্গে সমবেত দল নিয়ে এবার জঙ্গল ভেঙে বাঘের অনুসন্ধান শুরু হল।
খোঁজাখুঁজিতে বেশি সময় নষ্ট করার দরকার হয়নি কারণ বাঘ নিজেই এগিয়ে এসে শিকারিদের অভ্যর্থনা জানাল।
অভিযান শুরু হতে না হতেই প্রকাণ্ড বাঘিনী সগর্জনে লাফিয়ে পড়ল একটি হাতির মাথার উপর!
হাতির মাহুত ছিটকে কাঁটাগাছের উপর পড়ে আর্তনাদ করতে লাগল তারস্বরে– আর হাতি তীব্র বৃহন-ধ্বনি চারদিক কাঁপয়ে সোজা ঝাঁপ দিল নদীর জলে। সেখানে চোরাবালির মধ্যে পড়ে তলিয়ে যেতে যেতে কোনরকমে নিজেকে সামলে নিয়ে চলৎশক্তিরহিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল কুঁটো জগন্নাথের মতো! ওদিকে জঙ্গল-বাহিনীর দল অস্ত্রশস্ত্র ফেলে ছত্রভঙ্গ!
মতি আগের দিন ভয় পেয়েছিল ঠিকই, কিন্তু আজ সে যথেষ্ট সাহসের পরিচয় দিল। শুড় আর কান গুটিয়ে আক্রমণকারী বাঘিনীর দিকে অগ্রসর হল। বাহনের আকস্মিক গতিবেগে ভারসাম্য হারিয়ে ইংলিস পড়ে গেলেন, কোনমতে নিজেকে সামলে বন্দুকের নিশানা ঠিক করার আগেই ধূর্ত বাঘিনী আক্রান্ত হাতির মাথার কাছে নখের আঁচড় বসিয়ে আবার জঙ্গলের ভিতর ঢুকে লুকিয়ে পড়ল।
ওই ঘটনার ফলে লোকজন এমন ঘাবড়ে গেল যে, আর জঙ্গলে গিয়ে বাঘিনীকে তাড়া দিতে রাজি হল না। পুরস্কারের প্রতিশ্রুতি, তিরস্কার এবং সাহেবের প্রচণ্ড ক্রোধ অগ্রাহ্য করে তারা গ্যাট হয়ে দাঁড়িয়ে রইল নদীর পাড়ে জমির উপর। অগত্যা সাহেব একাই বাঘিনীর মোকাবিলা করতে প্রস্তুত হলেন। তাঁর আদেশে মাহুত হাতিকে চালিয়ে দিল জঙ্গলের মধ্যে।
বেশি দূর যেতে হল না– ভীষণ গর্জনে চারদিক কাঁপিয়ে বাঘিনী ধেয়ে এল হাতির দিকে। সাহেব গুলি করলেন। গুলি সম্ভবত বাঘিনীর পিছনের দিকে লেগেছিল, একবার আর্তনাদ করে উঠল, পরক্ষণেই যুদ্ধের উদ্যম ভঙ্গি করে ঘন উদ্ভিদ আর আগাছার মধ্যে তিরবেগে সরে পড়ে আত্মগোপন করল।
মাথার উপর উচ্চভূমিতে দণ্ডায়মান জনতা মহা সমারোহে চিৎকার করে সাহেবকে জানাল বাঘিনী নদী পার করে পালিয়ে যাচ্ছে। অগ্রপশ্চাৎ বিবেচনা না করে নির্বোধের মতো বাঘিনীকে অনুসরণ করলেন! পরবর্তী ঘটনা থেকে বোঝা যায় অজানা জায়গায় ওই হঠকারিতার ফল সাহেবের পক্ষে মোটেই ভালো হয়নি। হাতির মাহুত ছিল এক অনভিজ্ঞ ছোকরা, সে হাতি অঙ্কুশের আঘাত করে আর কানের পিছনে পা দিয়ে মোচড় মেরে জোরে ছুটিয়ে দিল। জল তোলপাড় করে নদী পার হয়ে ছুটল হাতি। বাঘিনীকে দূরে এক জায়গায় দেখতে পেল, তারপরই একটা উঁচু বালির ঢিপি পেরিয়ে সে অগ্রসর হল। সাহেবের মনে হল জন্তুটা দস্তুরমতো ক্লান্ত।
আবার ছুটল হাতি। বালির ঢিপিটা পার হয়ে একবারের জন্য মহারানির দর্শন পেলেন ইংলিস, পরক্ষণেই নদীর পাশে অন্তর্ধান কলেন। বাঘিনীর ক্ষিপ্র গতিবেগ দেখে এবার কিন্তু সাহেবের মনে হল দূর থেকে গুলি করে তাকে বিশেষ কাবু করতে পারে নি।
মাহুত হাতিকে প্রাণপণে ছুটিয়ে দিল। বৃথা চেষ্টা বাঘিনী যেন জীবন্ত বিদ্যুৎশিখা, সাহেবের হাতি কিছুতেই বাঘিনীর কাছে পৌঁছাতে পারল না।
প্রায় দু-তিন মাইল পথ পেরিয়ে এসে ইংলিস বুঝলেন শিকার খুব সহজলভ্য হবে না। হয়তো তিনি সেখানে থেকেই ফিরে যেতেন, কিন্তু হতভাগা মাহুত সোৎসাহে জানাল এখন ফিরে যাওয়া অনুচিত। বিভ্রান্ত সাহেব মাহুতের কথায় সায় দিলেন।
অনেকক্ষণ ছুটোছুটি পর দেখা গেল হাতি অত্যন্ত শ্রান্ত হয়ে পড়েছে। বাঘিনীর পাত্তা নেই! সে যেন হাওয়ায় মিশে গেছে। দারুণ পিপাসায় ইংলিস সাহেবের প্রাণ তখন ওষ্ঠাগত। জলের জন্য খোঁজাখুঁজি শুরু হল। কোথায় জল? জায়গাটাকে মরুভূমি বললেও অত্যুক্তি হয় না। কোনো জীবিত প্রাণীর চিহ্ন সেখানে নেই।
দেখতে দেখতে সূর্য অস্ত গেল। এল রাত্রি। আকাশে দেখা গেল পূর্ণচন্দ্র। জ্যোৎস্নার ম্লান আলোতে বালির ঢিপিগুলো দেখে সাহেবের মনে হল প্রেতলোকের কয়েকটা অপচ্ছায়া যেন চাঁদের আলোর সঙ্গে পৃথিবীতে নেমে এসেছে। ভুতুড়ে দৃশ্যটার সঙ্গে সঙ্গতি রেখেই যেন তীব্রকণ্ঠে চিৎকার করে উঠল একদল শেয়াল। একতান সঙ্গীতের সেই বীভৎস ধ্বনি যেন অপার্থিব আতঙ্কের শিহরণ ছড়িয়ে দিল সাহেব ও তার সঙ্গীর বুকের মধ্যে।
স্বভাবসুলভ বুদ্ধি ও তীক্ষ্ণ ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের সাহায্যে হাতি নিশ্চয় জলের সন্ধান পেতে পারত, কিন্তু মুখ মাহুত হাতিটাকে এদিক-ওদিক চালিয়ে ক্লান্ত করে ফেলল।
অবশেষে হাতিও বিরক্ত হয়ে উঠল। সজোরে ঝাঁকনি মেরে আরোহীদের সে পিঠ থেকে ঝেড়ে ফেলার চেষ্টা করতে লাগল বার বার।
একে তৃষ্ণা, তার উপর দারুণ রোদে সারাদিন ছুটোছুটি করার ফলে সাহেবের শরীর অত্যন্ত অসুস্থ হয়ে উঠেছিল। শ্রান্তদেহে তিনি হাতির পিঠ থেকে পড়ে গেলেন মাটিতে, আর পড়ামাত্র অজ্ঞান।
কিছুক্ষণ পরে জ্ঞান ফিরে পেয়ে ইংলিস দেখলেন তিনি সম্পূর্ণ একা, আর তাকে ঘিরে বসে আছে পনেরোকুড়িটা শেয়াল তাদের লুব্ধ চক্ষু ক্ষুধিত আগ্রহে জ্বলছে জ্বলন্ত অঙ্গারখণ্ডের মতো!
